আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুড়িয়ে মানুষ হত্যাকারীদের দানব হিসেবে আখ্যায়িত করে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাদের বর্জন করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আজ যারা ধানের শীষ নিয়ে আসছে, তাদের গায়ে পোড়া মানুষের গন্ধ। যারা শত শত মানুষকে গায়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করে, ওরা মানুষ না, দানব। এদের থেকে সজাগ ও সাবধান থাকবেন। তাদের ভোট দেবেন না। আপনারা নৌকা মার্কায় ভোট দিন, আমরা উন্নয়ন দেব, সুন্দর ও উন্নত জীবন দেব। নৌকার পালে হাওয়া লেগেছে, নৌকার বিজয় হবেই ইনশাল্লাহ।
গতকাল রবিবার দুপুরে রংপুরের পীরগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে স্থানীয় আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক বিশাল নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সকালে ঢাকা থেকে রংপুরে গিয়ে প্রথমে নিজের শ্বশুরবাড়ি এলাকা পীরগঞ্জে যান শেখ হাসিনা। প্রথমেই স্বামী প্রয়াত এম ওয়াজেদ মিয়ার কবর জিয়ারত করেন। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর প্রধানমন্ত্রীর শ্বশুরবাড়ির এলাকায় আসায় মানুষের মধ্যে রীতিমত উত্সবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সর্বশেষ এখানে এসেছিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী সেখান থেকে রংপুরের তারাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ মাঠে নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য রাখেন। পরে পীরগঞ্জে জনসভায় বক্তব্য শেষে শেখ হাসিনা দিনাজপুরে যান। ঢাকায় ফেরার পথে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ, ফুলবাড়ী, বিরামপুর, পার্বতীপুর, দিনাজপুর শহর বাসস্ট্যান্ড এবং দশমাইলে ছয়টি নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য রাখেন। প্রতিটি জনসভায় আওয়ামী লীগসহ মহাজোটের প্রার্থীদের বিজয়ী করার জন্য এলাকার জনগণের প্রতি আহ্বান জানান শেখ হাসিনা। পরে সৈয়দপুর এয়ারপোর্ট থেকে বিমানযোগে প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় ফিরেন। প্রতিটি নির্বাচনী জনসভা যেন জনসমুদ্রে রূপ নেয়। সর্বস্তরের হাজার হাজার মানুষ ও নেতাকর্মী বিপুল উচ্ছ্বাস, করতালি ও স্লোগানে বরণ করে নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। একইসঙ্গে নৌকাকে বিজয়ী করতেও তাদের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে তরুণসহ দেশবাসীর কাছে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে পুনর্বার দেশ সেবার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারুণ্যের কাছে ভোট চাই, মা-বোনদের কাছে ভোট চাই, বয়ঃবৃদ্ধ মুরব্বিসহ সবার কাছে ভোট চাই। বিএনপি-জামায়াত জোট সম্পর্কে দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। পুরো উত্তরবঙ্গ থেকে মঙ্গা দূর করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আগে উত্তরবঙ্গ মানেই মঙ্গা, দুর্ভিক্ষ, অনাহারি মানুষের আহাজারি ছিল। আমরা ক্ষমতায় এসে উত্তরবঙ্গের দুর্দিনকে সুদিনে পরিণত করেছি, মঙ্গাকে দূর করেছি। এখন কোথাও মঙ্গা নেই, মানুষের পেটে খাদ্যের কোন অভাব নেই। প্রধানমন্ত্রী বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সমালোচনা করে আরো বলেন, আজকে যারা ধানের শীষ করে সেই বিএনপির সঙ্গে জোটে থাকা জামায়াত একাত্তর সালে মানবতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধ করেছে, দেশে গণহত্যা চালিয়েছে। আর বিএনপি-জামায়াত জোট আন্দোলনের নামে আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে। দেশবাসীকে বলবো একটিবার তাদের ভয়াল ঘটনার কথা একটু চিন্তা করুন। এরা তো মানুষ নয়, এরা দানব। খালেদা জিয়া ও তাঁর ছেলে তারেক রহমানের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া এতিমের টাকা চুরি করে এখন জেলে আছেন। আর তাঁর ছেলে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করেছে, ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় সাজাপ্রাপ্ত, যারা (খালেদা-তারেক) এমনি একাধিক মামলায় সাজাপ্রাপ্ত- এরা দেশের উন্নয়ন কী করবে? কাজেই এদের থেকে দেশবাসীকে সাবধান থাকতে হবে।
নৌকা মার্কায় ভোট চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে মানুষের উন্নতি হয়, তার যথেষ্ট উদাহরণ দেশবাসী দেখেছে। আমরা যুব সমাজের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছি। কারো কাছে চাকরি চাইতে হবে না, নিজেরা চাকরি দিতে পারবে, সে ব্যবস্থা আমরা করেছি। আমরা তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাব। তিনি বলেন, আজকে প্রত্যেক ঘরে ঘরে আলো, সারা পীরগঞ্জে শতভাগ বিদ্যুত্ দিয়ে দিয়েছি। ইনশাল্লাহ ২০২১ সালের মধ্যে দেশের কোনো ঘর অন্ধকার থাকবে না। সব ঘর আলোকিত হবে।
রংপুর -৬ আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থী স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর হাত উঁচু করে ধরে তিনি বলেন, এই যে আমার মেয়েকে আপনাদের সামনে তুলে দিচ্ছি। শিরীন শারমিন চৌধুরী নির্বাচিত হলে তাঁকে আমরা আবারও স্পিকার করতে পারব। পীরগঞ্জের আরও উন্নয়নের জন্য আমি একটা মাস্টারপ্ল্যান করতে বলেছি। এই নির্বাচনে আপনারা নৌকা মার্কায় ভোট দেবেন।
পীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আজিজুর রহমান রাঙার সভাপতিত্বে জনসভায় আরো বক্তব্য রাখেন এ আসনের প্রার্থী জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, সদ্য আওয়ামী লীগের যোগদানকারী বিএনপির উপজেলা সভাপতি নুর মোহাম্মদ মন্ডল, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, বিএম মোজাম্মেল হক, আফম বাহাউদ্দিন নাছিম, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, ছাত্রলীগের সভাপতি রেজোয়ানুল হক চৌধুরী শোভন, অ্যাডভোকেট হোসনে আরা ডালিয়া এমপি প্রমুখ।
উল্লেখ্য, পীরগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত রংপুর-৬ আসনে আগে নির্বাচন করতেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই। ২০১৪ সালের বিজয়ের পর শেখ হাসিনা এই আসন ছেড়ে দিলে উপ-নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে জাতীয় সংসদের স্পিকার হন ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। পীরগঞ্জের জনসভায় সবাইকে চমকে দিয়ে জনসমুদ্রের সামনে হাজির হন জনপ্রিয় চলচ্চিত্র অভিনেতা ফেরদৌস, চলচ্চিত্র ও নাট্যাভিনেত্রী তারিন জাহান এবং চলচ্চিত্র অভিনেত্রী পূর্ণিমা। তাঁরাও জনসভায় নৌকায় মার্কায় ভোট দেওয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। জনসভা থেকে রংপুর-৪ আসনের প্রার্থী টিপু মুন্সি এবং রংপুর-৫ আসনের প্রার্থী এইচ এন আশিকুর রহমানকেও পরিচয় করিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী।
এর আগে তারাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ মাঠে নির্বাচনী জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, রংপুরের মানুষ বার বার নৌকায় ভোট দেওয়ায় উত্তর জনপদ মঙ্গার দুর্দশা থেকে মুক্তি হতে পেরেছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেই দেশের উন্নয়ন ও জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়। তাই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে দেশবাসীর কাছে নৌকায় ভোট চাই। একটি মানুষও অনাহারে থাকবে না। তিনি এসময় এই আসনের নৌকার প্রার্থী আবুল কালাম মো. আহসানুল হক চৌধুরী ডিউককে বিজয়ী করার আহবান জানান। তারাগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আতিয়ার রহমানের সভাপতিত্বে জনসভায় দলের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।
দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ, ফুলবাড়ী, বিরামপুর, পার্বতীপুর, দিনাজপুর শহর বাসস্ট্যান্ড এবং দশমাইলে ছয়টি জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, নৌকা মার্কায় ভোট পেয়ে সরকার গঠন করলে বিরামপুরকে জেলা করা যায় কি না, তা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবো।
