সময় ফাগুন মাস!
ঋতুরাজ বসন্তের ছোঁয়ায় বনে বনে ফুলে ফুলে ভরে উঠছে গাছের কোমল ডগা। মৌমাছি ফুলে ফুলে ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করছে মধু। ছোট ছোট কচি কচি ছেলেমেয়েরা নতুন নতুন বই নিয়ে ঝিনাই খালের বাঁধ পেরিয়ে বিদ্যালয়ের দিকে যাচ্ছে, সকলের মনেই কেমন জানি খুশি খুশি ভাব!
গাছে ফুটছে নয়া ফুল, হাতে আছে নতুন বই, আবার যাচ্ছে নতুন শ্রেণিকক্ষে, খুশি তো থাকবেই, তা-ই না?
ঝিনাই খালের বাঁধ পাড়ি দিয়ে যেতে হয় দিপুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। দিপুর বয়স এগারো বছর, সে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। পড়ালেখায় খুব একটা ভালো না হলেও দিপুর ব্রেন একদম টাটকা। খুব একটা কথা বলে না দিপু, একটু চুপচাপ স্বভাবের। আবার দিপুর মুখ চুপ থাকে বলেই যে তার হাত স্তব্ধ থাকে তা কিন্তু নয়, দিপুর হাত যথেষ্ট চঞ্চল।
দিপু বেশ ছোটবেলা থেকেই নানারকম ফেলনা জিনিস থেকে বিভিন্ন ধরনের খেলনা তৈরি করত, ছবি আঁকত, আবার মাঝে মাঝে তো নিজে নিজেই ছড়া কাটত মনের সুখে।
দিপু তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় তার ভাঙা খেলনা বিমানের এক অংশ দিয়ে একটি ব্যাটারিচালিত ফ্যান তৈরি করে, যা দিয়ে গ্রীষ্মের ঋতুতে ঠান্ডা হাওয়ার ব্যবস্থা করেছে। আবার বাল্বের সাহায্যে আঁধার ঘর আলোকিত করেছে। এভাবেই সে একেক সময় একেক জিনিস তৈরি করে থাকে।
আজ নতুন শ্রেণিকক্ষে যাচ্ছে দিপু, রহিত, রানু, রাসেল, লালু আর মুন্না। লালু, রাসেল, মুন্না এবার তৃতীয় শ্রেণিতে আর রহিত ও রানু চতুর্থ শ্রেণিতে। এখানে সবার বড়ো দিপু, দিপুকে সবাই দিপু ভাই বলে ডাকে। ওরা সকলেই দিপুর কথা মেনে চলে।
ফাগুন মাস মানেই শীতের শেষের দিক, আর শীতের শেষ দিক মানেই তো আসন্ন ফেব্রুয়ারি মাস। ফেব্রুয়ারি মাসেই শুরু হয় শহিদ মিনার সংস্কারের কাজ। দিপুদের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বেশ দূরে একটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়। সেখানে পালন করা হয় মাতৃভাষা দিবস। ছাত্রছাত্রীরা ভোরে ঘুম থেকে উঠে হাতে এক গুচ্ছ ফুল নিয়ে খালি পায়ে চলে আসে বিদ্যালয়ে শহিদ মিনারে ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা কেউ আসে না। কারণ হলো, তাদের শহিদ মিনার নেই, তারা এসে কোথায় ফুল দেবে?
দিপুদের বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার। যাতায়াতে সময় লাগে এক ঘণ্টার মতো। উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মতোই দিপুদের মনেও সাধ জাগে ভোরে খালি পায়ে এসে ভাষা শহিদদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে, কিন্তু বিদ্যালয় যে অনেক দূরে।
দিপু, রহিত, রানু, রাসেল, লালু আর মুন্না একসঙ্গে বসে বুদ্ধি-পরামর্শ শুরু করল, কী করা যায়? ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা যে জানাতেই হবে।
একসময় দিপু বলল, চলো আমরা সবাই আমাদের বাড়ির পাশে কোনো ফাঁকা স্থানে শহিদ মিনার বানাই।
তখন রহিত বলে উঠল, এত ইট পাথর সিমেন্ট পাবো কোথায়? অনেক টাকা লাগবে তো, আর আমরা কি তৈরি করতে পারব?
দিপু জবাবে বলল, শুধু কি ইট পাথর দিয়েই শহিদ মিনার বানাতে হবে নাকি?
এটা শুনে সকলেই একসঙ্গে বলে উঠল, তাহলে...?
দিপু বলল, তোমরা সকলেই নিজ নিজ বাড়ি থেকে মোটা মোটা পাটকাঠি নিয়ে আসবে আর বাকি কাজ আমি করব, তোমরা শুধু আমাকে সাহায্য করবে।
তারপরে বাড়ি ফিরে তারা প্রত্যেকেই কাজ শুরু করে দিল। একপর্যায়ে তাদের শহিদ মিনার তৈরি সম্পূর্ণ হলো। একুশে ফেব্রুয়ারির ভোরবেলায় সকলেই ‘একুশে ফেব্রুয়ারি অমর হোক’ এই স্লোগানে নবনির্মিত শহিদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহিদদের শ্রদ্ধা জানাল। এভাবেই শেষ হলো দিপুদের ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো।
