অনুজকান্তি দাশ, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) সংবাদদাতা
চায়ের পরেই পান হচ্ছে সিলেটবাসীদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। সংরক্ষিত বনে ঐতিহ্যগতভাবে সুপারি কিংবা অন্যান্য বনজ বৃক্ষের সঙ্গে অর্থকরী ফসল হিসেবে গাছ পান বা খাসিয়া পানের আবাদ করে থাকেন খাসিয়ারা। খাসিয়ারা তাদের নিজস্ব ভাষায় পানকে বলেন, ‘পাথা’। পানের পাতায় পাতায় যেন আঁকা থাকে তাদের জীবন। পানের প্রতিটি গুছায় গুছায় ফুটে ওঠে খাসিয়া নারীর হাতের শৈল্পিক নকশা। এ পান চাষ করেই জীবিকা নির্বাহ করছে এতদ্ঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী খাসিয়ারা।
মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা ও রাজনগর উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় ছোটো-বড়ো ১০০টি পুঞ্জিতে তাদের বসবাস। এসব এলাকার বন পাহাড়ের বুকে এ পান চাষ করা হয়। পূর্বপুরুষ থেকেই যুগ-যুগ ধরে জুম চাষের মাধ্যমে এ জাতীয় পানের উত্পাদন করেন তারা। খাসিয়া পুরুষরা পান গাছের যত্ন ও পাতা সংগ্রহ করে থাকেন। আর নারীরা ঘরের বারান্দায় দলবদ্ধ হয়ে বসে পানগুলো বাজারজাত করার জন্য গুছিতে গুছিতে সাজিয়ে তোলেন। ১২টি পান পাতায় একটি গুছি আর ১২টি গুছিতে এক কান্তা বা মোটি হয়। এভাবে ১২ কান্তায় বা মোটিতে হয় এক কুড়ি। সময় ভেদে পানের দাম ওঠানামা করে। বর্ষায় প্রতিকুড়ি পান ৪০০-৬০০ টাকা এবং শুকনো মৌসুমে প্রতিকুড়ি ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা হয়। এভাবে প্রতি সপ্তাহে এক একটি খাসিয়া পরিবার দুই থেকে তিন কুড়ি পান বিক্রি করে থাকেন। তবে জুম চাষের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতা নেই বলে জানান তারা। এ ব্যাপারে কৃষি বিভাগের আওতায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও স্থানীয় সরকার বিভাগের সহযোগিতা কামনা করেন পানচাষিরা।
লাউয়াছড়া খাসিয়াপুঞ্জির পুঞ্জিপ্রধান ফিলা পতমি বলেন, বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকায় একই ধরনের বন ও পাহাড়ি অঞ্চলের জুম চাষের সম্ভাব্য এলাকা স্থাপন এবং নতুনভাবে তৈরি বনে এই চাষ সম্প্রসারিত হলে দেশে খাসিয়া পানের উত্পাদন বাড়িয়ে অধিক পরিমানে রপ্তানি করা সম্ভব হবে। এ দিকে কৃষি বনায়নের বহুতলীয় চাষ ব্যবস্থার আদলে এ পানের আবাদ খাসিয়া উপজাতিদের নিজস্ব উদ্ভাবন বলে উল্লেখ করেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি অফিসার নীলুফার ইয়াছমিন মুনালিসা সুইটি। তবে দেশের বন পাহাড় ঘিরে খাসিয়া পানের আবাদ হলে সেখানে বনজ গাছ সংরক্ষণের পাশাপাশি বনাঞ্চলের জীব-বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও ভূমিক্ষয় রোধ হবে বলে ধারণা করেন তিনি।
