রিয়াদ হোসেন
করোনা ভাইরাসের প্রভাবে চীনসহ সারা বিশ্বেই প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এ ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে নিহতের সংখ্যাও। চীনের বাইরে অন্যান্য দেশেও এ ভাইরাস ছড়িয়েছে, যদিও তা আশঙ্কাজনক নয়। তবে করোনা ভাইরাসের প্রভাব ইতিমধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যে পড়তে শুরু করেছে। গোটা বিশ্ব থেকে চীন একরকম বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে। সীমিত হয়ে গেছে বিমান যোগাযোগ। ফলে প্রাথমিক ধাক্কা লেগেছে বিমান পরিবহন, হোটেল ব্যবসাসহ সার্বিক পর্যটন খাতে।
চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। এই সময়টিতে ঢাকায় প্রচুর আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী হয়। করোনা ভাইরাসের প্রভাব পড়েছে এসব প্রদর্শনীতে। প্রদর্শনীগুলোতে চীনের প্রতিষ্ঠান ও তাদের নাগরিকদের আধিক্য থাকে। করোনা আতঙ্কে ইতিমধ্যে এ ধরনের অন্তত আটটি প্রদর্শনী বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় বৃহত্তম টেক্সটাইল ও মেশিনারির প্রদর্শনীও হওয়ার কথা ছিল আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে। এ প্রদর্শনীটি দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড়ো প্রদর্শনী বলে আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিল্স অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছিল। এতে ১ হাজার ৬৫০টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেওয়ার কথা ছিল, যার প্রায় ৩০০-ই অংশ নেওয়ার কথা ছিল চীনের প্রতিষ্ঠান। কিছু প্রদর্শনী বাতিল করা না হলেও সেখানে চীনের প্রতিষ্ঠান অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। চীনের নাগরিকদের ঢাকায় ভিসা প্রদান প্রক্রিয়ায়ও আগের চেয়ে কিছুটা জটিল হয়েছে। তাদের অন অ্যারাইভাল (ঢাকায় বিমানবন্দরে আসার পর তাত্ক্ষণিক ভিসা দেওয়া) ভিসার সুযোগ আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। এসব বিচেনায় আয়োজকরা প্রদর্শনী বাতিল করাকেই উপযুক্ত সিদ্ধান্ত মনে করছেন। তবে এভাবে প্রদর্শনী বাতিল হওয়ায় এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খাত মিলিয়ে সার্বিকভাবে উদ্যোক্তাদের প্রায় ২০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হবে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশের আমদানিকৃত রসুনের ৯০ শতাংশই আসে চীন থেকে। দেশটিতে নতুন করে দেখা দেওয়া করোনা ভাইরাসের প্রভাবে রসুনের আমদানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। অবশ্য অসাধু ব্যবসায়ীরা এর সুযোগ নিতে তত্পর। ইতিমধ্যে রসুনের মজুত শুরু করার পাশাপাশি দর বেড়ে গেছে। যদিও এসব রসুন আগেই আমদানি করা। একইভাবে বাংলাদেশে আমদানিকৃত আদারও উল্লেখযোগ্য অংশই আসে চীন থেকে।
তবে এসবের বাইরেও সবচেয়ে বড়ো উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের। বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য গার্মেন্টস। রপ্তানির ৮৪ শতাংশই আসে এ খাত থেকে। এসব রপ্তানি পণ্যের কাঁচামাল বিশেষত ওভেন ফেব্রিকের অর্ধেকই আসে চীন থেকে। অন্যদিকে অ্যক্সেসরিজের উল্লেখযোগ্য অংশ এবং বিপুল পরিমাণ কেমিক্যালও সেখান থেকে আমদানি হয়। এসব পণ্য যথাসময়ে চীন থেকে না আসলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানি ব্যাহত হবে। করোনা ভাইরাস নিয়ে উদ্বিগ্ন সারা বিশ্ব। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো এই রোগ সংক্রমণের ফলে অর্থনীতির ক্ষতি হিসাব করতে শুরু করেছে। কারণ চীনের সঙ্গে পুরো বিশ্বের অর্থনীতির যোগসূত্র রয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সংবাদ অনুযায়ী গতকাল শুক্রবার জাপানের নীতিনির্ধারকরা আশঙ্কা করছেন, অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিক সময়কালে দেশটির অর্থনীতিতে তীব্র সংকোচন ঘটতে পারে। এমনিতেই জাপানের প্রবৃদ্ধি খুব একটা বাড়ছে না। রোগটি ছড়িয়ে পড়লে দেশটির অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় আরো কমে যেতে পারে। সিঙ্গাপুরের মতো দেশেও মন্দার আশঙ্কা করা হচ্ছে। মালয়েশিয়া পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রণোদনা প্যাকেজ নেওয়ার চিন্তা-ভাবনা করছে। খোদ চিনের বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দেশটির অর্থনীতে যে ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে, তার পরিমাণ দেশটির জিডিপির ১ শতাংশের মতো।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ১৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি আসে সেখান থেকে। আর বাংলাদেশের রপ্তানি ১ বিলিয়ন ডলারের কম। বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের মধ্যে বেশির ভাগই পোশাক। এর বাইরে কিছু কৃষিপণ্য ছাড়াও কাঁকড়া কুঁচিয়াও রয়েছে। করোনার কারণে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানিতেও ভাটা পড়েছে। গার্মেন্টস উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে সেখানে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমতির দিকে। আর দক্ষিণাঞ্চলের কাঁকড়া ও কুঁচিয়া রপ্তানিও হচ্ছে না গত দুই সপ্তাহ ধরে। ফলে প্রায় শতকোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে এসব এলাকার কাঁকড়া ও কুঁচিয়া চাষিদের।
