মো. শফিকুল ইসলাম
বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে তো বটেই, এই বিদ্যায়তনিক পরিবেশের বাইরেও র্যাগিং পরিচিত শব্দ। এটি নবীন শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে চলেছে। তাদের পরিবারের জন্যও বিষয়টি আতঙ্কের। সিনিয়র শিক্ষার্থী কর্তৃক নবীন শিক্ষার্থীদের নানাভাবে অত্যাচার ও হেনস্তার নাম র্যাগিং। গালিগালাজ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, এমনকি তাদের পিতা-মাতা, নিজ জেলা নিয়ে নানাভাবে হয়রানি করা হয় এই প্রক্রিয়ায়। যেমন, সিনিয়র আপুকে ভালোবাসার প্রস্তাব দিতে বাধ্য করা, শীতের রাতে খালি গায়ে ১ মাইল হেঁটে আসা, আপত্তিকর বিষয় অভিনয় করে বলানো ইত্যাদি।
সম্প্রতি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দু্ই নবীন শিক্ষার্থী সিনিয়র ছাত্রছাত্রী কর্তৃক র্যাগিংয়ের শিকার হয়। পরবর্তীকালে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের হাসপাতালে ভর্তি করায়। ছাত্রটি মানসিকভাবে দু-একদিন কিছুটা ভারসাম্যহীন ছিল, এর প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধন হয় এবং গণমাধ্যম র্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে খুবই তত্পর ভূমিকা পালন করে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাত্ক্ষণিকভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করে। প্রতিবেদন আমলে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা বোর্ড ঐ তিন শিক্ষার্থীকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করে এবং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চূড়ান্ত বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানিয়েছে।
সম্প্রতি হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুসারে একটি অ্যান্টি র্যাগিং কমিটি করার নির্দেশনা রয়েছে, যার প্রধান হিসেবে ছাত্র উপদেষ্টা সদস্যসচিব, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও হলো প্রভোস্টদের সদস্য রাখার সুপারিশ রয়েছে। এটি প্রশংসার যোগ্য। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতি, মাদক ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন এবং বাস্তবায়নের দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। র্যাগিং বিষয়েও হাইকোর্টের এই নির্দেশনা প্রশংসার দাবিদার।
আমার বিনীত অনুরোধ, প্রধানমন্ত্রীর মতো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন র্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেন। র্যাগিং নিয়ে সংসদে পাশকৃত সুষ্ঠু আইন থাকা প্রয়োজন বলেও মনে করি।
র্যাগিংয়ের কারণে মৃত্যুর ইতিহাস রয়েছে। ঘটনাটি ঘটে ১৮৭৩ সালে নিউ ইয়র্কের কার্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মার্টিয়ার লেগেটের সঙ্গে। ২০০৭ সালে ভারতের জরিপে বের হয়ে আসে ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী মনে করে র্যাগিং তাদের ভবিষ্যত্ জীবনের পথচলাকে কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।
সময় এসেছে, নবীনদের জন্য একটি নিয়মতান্ত্রিক জীবন পরিচালনা করার পরিবেশ নিশ্চিত করা। নবীন শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনিয়রদের এবং নিজের বা অন্য বিভাগের শিক্ষক শিক্ষার্থীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিত। সিনিয়র শিক্ষার্থী শেখানোর নামে কোনো নবাগত শিক্ষার্থীকে র্যাগ দিয়ে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন না করে ভালোবাসা ও সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে জুনিয়র ভাইবোনকে বিশ্ববিদ্যালয় তথা জাতির উন্নয়নে কীভাবে ভূমিকা রাখবে, সেই বিষয়ে যুগোপযোগী পদক্ষেপ নিতে সহযোগিতা করা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, শিক্ষকরা এবং প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে র্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে প্রয়োজনীয় নিদের্শনা দেওয়া এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
যে র্যাগিং সংস্কৃতির উদ্ভব হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতকে এবং এটি গ্রিসের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন খেলোয়াড়ের আগমন ঘটলে টিম স্পিরিট বাড়াতে এবং শারীরিক ও মানসিক শক্তি পর্যবেক্ষণের জন্য চর্চিত হতো আজকের সমাজ কাঠামো ভিন্ন হওয়ায় তা অবশ্যই অসামঞ্জস্য ও বাতিলযোগ্য বলে আমরা মনে করি।
n লেখক :সহকারী অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
