খন্দকার মাহমুদুল হাসান
বাংলা ভাষা ও বর্ণমালা সৃষ্টির পেছনে রয়েছে হাজার হাজার বছরের ইতিহাস। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে উপমহাদেশ ও আশপাশের কোথাও কোথাও প্রচলিত ছিল ব্রাহ্মী লিপি। মৌর্য বংশীয় বিখ্যাত সম্রাট অশোকের আমলে ব্রাহ্মী ও খরোষ্ঠী লিপির প্রচলন থাকার অনেক প্রমাণ রয়েছে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও চীন থেকে এসব লিপি উত্কীর্ণ পাথরখণ্ড, স্তম্ভলেখ, পর্বতলেখ প্রভৃতি পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের প্রাচীনতম শিলালেখটি পাওয়া গেছে বগুড়া জেলার মহাস্থানে। সেটি লিখতেও এই ব্রাহ্মী লিপিই ব্যবহার করা হয়েছে। এই লিপি থেকে বহু পরিবর্তনের পথ বেয়ে সৃষ্টি হয়েছে বাংলা লিপি বা বর্ণমালা। বাংলা বর্ণমালার আধুনিক রূপের স্পষ্ট আভাস আমরা দেখতে পাই মধ্যযুগেই। কাজেই বাংলা লিপির উদ্ভব ও বিবর্তনের পেছনে আছে প্রায় আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস। তবে ব্রাহ্মী লিপিরও একটা পশ্চাত্ভূমি আছে। সে বিবেচনায় এ ইতিহাসকে তিন হাজার বছর পর্যন্ত পিছিয়ে দেয়া যায়।
বাংলা ভাষায় যারা কথা বলে তারা বাঙালি। যেহেতু এই ভাষা প্রায় এক হাজার বছর আগে সৃষ্টি হয়েছে, তাই সুনির্দিষ্ট জাতি হিসেবে বাঙালির ইতিহাস যে এক হাজার বছরের কম পুরনো নয় তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে বাঙালি জাতি সৃষ্টির এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। সে ইতিহাস মোটেই মাত্র হাজার বছরের নয়। বাংলার আদি বাসিন্দা নেগ্রিটো বা অস্ট্রালয়েডদের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে আসা জনগোষ্ঠীগুলোর দীর্ঘ অসমসত্ত্ব মিশ্রণ ঘটেছে। পরবর্তী জনগোষ্ঠীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল আর্য ও মঙ্গোলীয়রা। এই জনগোষ্ঠীগুলোর আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য ছিল। তাদের মধ্যে যেমন দেহবৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য ছিল, তেমনি ছিল ভাষাবৈশিষ্ট্যের পার্থক্য। এই মিশ্রণের ফলে এমন এক জাতির সৃষ্টি হলো যাদের নৃ ও ভাষা বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একইসঙ্গে মিশ্রভাব ও নতুনত্ব ছিল। বাঙালির মধ্যে তাই পূর্বপুরুষের বৈশিষ্ট্য যেমন পাওয়া যায়, তেমনি আছে আলাদাভাবে শনাক্তযোগ্য বৈশিষ্ট্যও। এই নতুন মিশ্র জাতি বাঙালির সৃষ্টি প্রক্রিয়াও প্রায় তিন হাজার বছরের ইতিহাসকে ধারণ করে রেখেছে।
বাঙালি তার ইতিহাসকে স্মরণ করে গৌরববোধ করে। ভাষার মর্যাদা রক্ষাকে নিজের মর্যাদা বলেই গণ্য করে। একটুও দ্বিধা করেনি নিজের প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দিতে। তারই প্রমাণ আমরা দেখেছি ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে। যেহেতু এই জাতির প্রধান ঐক্যসূত্র হলো ভাষা, তাই ভাষার অধিকার হলো শিকড় সংরক্ষণের অধিকার। শিকড় না থাকলে যেমন গাছ বাঁচবে না, তেমনি বাংলা ভাষা না থাকলেও পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে বাঙালি জাতি।
