/ শফিক হাসান
শনি থেকে শুক্র—সপ্তাহে সাতদিন। সাতদিনের প্রতিটি বারেরই আলাদা আলাদা নাম রয়েছে। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি— বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে এই সাতটি নামের পৃথক অর্থও আছে! এটা শুধু সময়-নির্দেশকই নয়— অর্থ-নির্দেশকও!
শনি
শনি-মঙ্গলবার দূরযাত্রা নিষেধ— এতে অমঙ্গল হয়! তার মানে কি বাকি পাঁচদিনের যাত্রা শুভ— এসব দিনে কোনো দুর্ঘটনাই ঘটে না! মোটেও নয়। তবে এসব হিসাবনিকাশ, চুলচেরা বিশ্লেষণ পণ্ডিতের ব্যাপার— তারাই ভালো বুঝবেন। বিপদাপদে পড়লে মানুষ বলে, ‘শনির দশায় পেয়েছে’। সপ্তাহের যে কোনো দিনই শনির দশায় পেতে পারে! এ ‘শনি’র দশার মধ্যেও এক ধরনের শান্তি আছে। বিশেষ করে সরকারি চাকরি যারা করেন। শুক্রবারের পাশাপাশি শনিবারেও সরকারি ছুটি থাকে। এর আগে-পরে যদি আরো কোনো সরকারি ছুটি মিলে যায়— কথাই নেই! কেউ বিপদে পড়লে আমরা বলি, বেচারা শনির দৃষ্টিতে পড়েছে। অশনি সংকেত বয়ে আনতে এ শনির জুড়ি নেই!
রবি
রবি মানে সূর্য। অথবা সূর্যের প্রতিশব্দের নাম রবি। কিন্তু রবিবার এলেই কি সূর্য ওঠে— সপ্তাহের অন্যদিনগুলোতে ওঠে না? যদি উঠেই থাকে— তাহলে শুধু রবি মানে সূর্য হবে কেন! ব্যাকরণবিদরাই ভালো জানবেন। তবে এধরনের দ্বন্দ্বের সমাপ্তিকল্পে আজকাল কেউ কেউ রবিবারকে রোববার হিসেবে ডাকতে শুরু করেছেন। পত্রিকাগুলোও লুফে নিয়েছে শব্দটি। রবিবারের সাহিত্য-আড্ডা পরিচিতি পায় রবিবাসরীয় হিসেবে। সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অনেকেই আদর করে রবি ডাকেন— রবি ঠাকুর, রবিবাবু, রবিকবি। আবার রবি চৌধুরীর মতো গায়করা গানে গানে বলে যান— শুক্রবারে চোখাচোখি, শনিবারে কথার পর রবিবারে প্রেম হয়ে যায়...!
সোম
সোমনাথ মোটেও সোমবারে জন্মাননি। সোমলতার রস পান করা কিংবা সোমতীর্থে যাওয়াও তার জন্য বাধ্যতামূলক নয়। তাহলে সোমবার কেন? সোমবার এই জন্যই— সোমবার না থাকলে রবি এবং মঙ্গলবারের মাঝখানে কিছুই থাকে না। শূন্যতার চেয়ে কিছু না কিছু থাকা ভালো! দৈনিক ইত্তেফাকের ফান ট্যাবলয়েড বের হয় রবিবারে। এর পরদিন সোমবার। সঙ্গত কারণেই সোম পেয়েছে ভিন্নমাত্রার মর্যাদা!
মঙ্গল
নামের সাথে অর্থের মিল সবসময় ঘটে না! যেমন সুন্দরবনের গোলপাতা গোল নয়— লম্বা! তেমনি মঙ্গলবারকে অনেকেই অমঙ্গলের প্রতীক হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এ দিনে ভ্রমণ মানা, যে কোনো শুভ কাজ মানা, গ্রামাঞ্চলে বাঁশ কাটা মানা! কানা ছেলের নাম পদ্মলোচনের মতো অবস্থা মঙ্গলবারেরও! যদিও অমঙ্গল ঘটার জন্য শনি-মঙ্গল লাগে না— বাংলাদেশের মানুষ এমনিতেই বিরাট দৌড়ের ওপর আছে। প্রতিটি দিন আসে অমঙ্গলের বার্তা নিয়ে। অনেক শুভ কাজের আগে মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালানো হয়। এটা ভাবা অবশ্যই ঠিক হবে না— মঙ্গলবারে যে প্রদীপ জ্বালানো হয় সেটাই মঙ্গলপ্রদীপ! কিংবা মঙ্গলপ্রদীপ বেছে বেছে শুধু মঙ্গলবারেই জ্বালানো হয়ে থাকে!
বুধ
বুধ একটি গ্রহের নাম। তাহলে মঙ্গল গ্রহই কেন সবসময় লাইমলাইটে থাকে— সেখানে বসতি স্থাপনের চিন্তা করে! গ্রহ হিসেবে বুধ কি মঙ্গলের চেয়ে পিছিয়ে? বুধের নাম উচ্চারিত হয় না বললেই চলে! ব্যাপারটা কি এমন— বুধ ছোট গ্রহ আর মঙ্গল বড়? কিংবা মঙ্গলগ্রহের স্ট্যাটাস বেশি, বুধ নিচু জাত? বৈষম্য সবখানেই আছে। একজনকে ষড়যন্ত্রমূলক দাবিয়ে রেখে অন্যজন বড় হতে ছাড়ে না। মঙ্গল এ সুযোগটাই ভালোভাবে নিয়েছে। দুঃখের বিষয়, এ বৈষম্য নিরসনে আজতক কোনো মানববন্ধন বা প্রতিবাদ-সমাবেশ হয়নি!
বুধ মানে জ্ঞানী বা প্রতিসম্পন্ন ব্যক্তি। প্রতিভাবান মানুষরাও আজকাল নিজেদের সম্মান সমুন্নত রাখার কথা চিন্তা করেন না। করেন না বলেই বুধকে বঞ্চনার শিকার করে রাখেন, পাশাপাশি নিজেদেরও!
বৃহস্পতি
বৃহস্পতি এখন আমার তুঙ্গে— গানে গানে শিল্পী নিজের তুঙ্গস্পর্শী অবস্থানের কথা জানিয়ে দেন। কিন্তু শুধু শিল্পীরই নয়— অনেকের অবস্থাই এখন তুঙ্গে। ঘুষখোর কর্মকর্তাদের অবস্থা তুঙ্গে, রাজনীতির হর্তাকর্তাদের অবস্থা তুঙ্গে, সরকারি চাকুরেদের অবস্থা তুঙ্গে। এমনকি বৃহস্পতিবারে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকার বিনোদন পাতার বিভাগীয় সম্পাদকের অবস্থাও তুঙ্গে! কারণ ওই দিন সম্পাদকের ডে অফ! তারকাদের অবস্থা আরো তুঙ্গে— তাদের সচিত্র সংবাদ পরিবেশিত হয়, থাকে নানা ধরনের গুণকীর্তন আর ভালো ভালো কথা! ‘অমুক কাজ করে তৃপ্তি পেয়েছি’, ‘সহশিল্পী হিসেবে তমুকের তুলনাই হয় না’, ‘অমুক ধারাবাহিক নাটক, তমুক বাংলা ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছি’ টাইপ কথা বলার সুযোগ সচরাচর পাওয়া যায় না!
কারো যদি একাদশে বৃহস্পতির মতো শুভ ফলদায়ক ঘটনা ঘটে— বৃহস্পতি ছাড়িয়েও সুখানুভূতি আসে!
শুক্র
জানালার পর্দাও জানে, ছুটির দিন মানে আলস্য— বহু বছর আগে দেওয়া কবি সরকার আমিন’র ফেসবুক স্ট্যাটাস।
অলসতার সাথে ছুটির একটা নিবিড় অথচ অলিখিত বন্ধন আছে! শুক্রবার মানেই ছুটির দিন। ছুটির দিন মানে একটু দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা, ভালো খাবারদাবারের আয়োজন থাকা, দল বেঁধে সিনেমা দেখা বা বেড়াতে যাওয়া; নয়তো কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া! শুক্রবার মানে বসের গালমন্দের আওতার বাইরে থেকে তাকে দেখিয়ে দেওয়া— আপনি আমার কিচ্ছু করতে পারবেন না! ফাঁকিবাজ মানুষের মনে ভাবনা জড়ো হয়— প্রতিদিন কেন শুক্রবার হয় না?
এ প্রশ্নের উত্তর অনেকভাবেই দেওয়া যায়। একটা উত্তর হচ্ছে— প্রতিদিন শুক্রবার হলে আলাদাভাবে দিনের কোনো নামই থাকতো না। সেক্ষেত্রে পাঠকরা নাম-মাহাত্ম্য নিয়ে এমন মনোহর (!) একটি রচনা পাঠ করার আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতেন!
