/ এস আর শানু খান
বন্ধু মতলেব মাতুব্বর। সারা গ্রামে যার পরিচিতি ফকাইম্যা মতলেব। আমাদের গ্রাম্য ভাষায় ফকাইম্যা মানে হলো, যে অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় বাকবিতণ্ডা চালায়। স্কুলে ১৫ বছর কাটিয়েও প্রাইমারির গণ্ডি পার হতে না পারায় স্যারেরা ক্লাস থ্রি থেকে মাফ চেয়ে মতলেবকে বিদায় জানিয়েছিলেন। মতলেব আমাদের সাথে ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হলেও আমরা যখন অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়ি তখনো মতলেব থ্রি-তে পড়ে। একবার আমাদের প্রাইমারি স্কুলে গিয়ে স্যারদের সাথে কথা বলতে বলতে মতলেবের প্রসঙ্গ ওঠতেই স্যারেরা সমস্বরে বলতে শুরু করলেন মতলেবের গল্প।
এক স্যার বললেন, আমি এই ১৫ বছরের এক মতলেবের পরীক্ষার খাতা দেখতে গিয়ে যে পরিমাণ মার্কস গ্রেস দিয়েছি তার হিসাব করা মুশকিল। এমনও সময় গেছে মতলেব মাত্র এক পেয়েছে। আমি ৩২ দিয়ে পাশ দেখিয়েছি। কারণ এই স্কুলে মাঝে মাঝে মতলেবকে বড্ড বেমানান লাগে। উটের মতো একটা ছেলে পড়ে টু-থ্রিতে। কচিকাঁচা বাচ্চাদের মধ্যে সত্যি ওকে কেমন যেন লাগে। বেচারির ধৈর্য্যও আছে বটে, ১৫ বছর এভাবে এক স্কুলে একঘেঁয়েমি যে লাগেনি ওর।
মতলেব কিছুদিন স্কুল কামাই করলেই আমরা (স্যারেরা) হাফ ছেড়ে বলাবলি করতাম, যা এবার বোধহয় মতলেবতন্ত্র থেকে বাঁচলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্য, বেচারা আবার হাজির হতো।
স্কুলের শিক্ষকরা তাকে মাতুব্বর বলতেন। সেখান থেকেই মতলেব মাতুব্বর নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। মতলেবের কাছে যখন স্যারেরা শুনতে চাইতেন—এই যে এতদিন পরে আবার কি দরকার ছিল স্কুলে আসার?
মতলেব বলত, স্যার মাঝে মাঝে এই স্কুলের কথা মনে পড়লে মনের ভিতর কেমন যেন করে ওঠে। কাউকে স্কুলে আসতে দেখলে আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারি না। তাই তো মাঝে মাঝে লুঙ্গি পরেও স্কুলে চলে আসি।
মতলেবের এই প্রাইমারি স্কুলের প্রতি ভালোবাসার কথা উপজেলা শিক্ষা অফিসার পর্যন্ত প্রায় সবারই জানা। মতলেব একবার স্কুলের হয়ে উপজেলা পর্যায়ের একটা বিতর্ক প্রতিযোগিতায় নাম দিয়েছিল। তাতে স্যারেরা বড্ড চিন্তায় পড়ে যান। কারণ, কী করতে কী করে তা আল্লাহই জানে। অবশেষে সেই অনুষ্ঠানে লুঙ্গি পরা মতলেব হাজির। স্যারেরা বললেন, এই বড় জায়গায় এভাবে আসলে ইজ্জত থাকে মতলেব?
মতলেব বলল, স্যার না আসলে তো ইজ্জত আরও বেশি যেত। আমার মনে ছিল না অনুষ্ঠানের কথা। মাঠে ভাত নিয়ে যাচ্ছিলাম। দেখি সবাই কোথায় যেন যাচ্ছে। শোনার পরে মনে পড়ল—অমনি একজনের সাইকেলে উঠে চলে এলাম।
সেদিন অবশ্য তাকে এক স্যারের প্যান্ট পরিয়ে স্টেজে উঠানো হয়েছিল। অন্য কোনো স্টুডেন্টের প্যান্ট কি ওর মাজায় খাটে! তাকে তো কোনো এক স্যারের বয়সীই বলা যায়।
সেদিন একপর্যায়ে শুরু হলো বিতর্ক। মতলেবকে প্রথমে প্রশ্ন করা হলো বাংলাদেশের কয়েকজন সরকারের নাম বলো—
মতলেব বলল, ওলিয়ার সরকার, তার ছেলে মতুর সরকার, কায়েম সরকার, অভি সরকার। হিন্দু পাড়ার বিশ্ব সরকার।
প্রশ্নকারী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এরা আবার কোন সরকার?
মতলেব বলল, এরাই সত্যিকারের সরকার। বংশ টাইটেলই এদের ‘সরকার’। আমাদের এলাকায় বাড়ি। কোনো ভেজাল নাই।
দ্বিতীয় প্রশ্ন, আপনাদের এলাকায় বিদ্যুত্ এসেছে ২০১৮ সালের কত তারিখে সঠিকভাবে বলতে পারবেন?
মতলেব বলল, স্যার আপনার প্রশ্নে ভুল আছে। আমি জন্মের পর বুঝতে শিখেই দেখতেছি আমাদের গ্রামে বিদ্যুত্ আছে। এবং তার সমস্ত শরীরে ছাগলের মতো লোমও আছে।
প্রশ্নকারী রেগে গিয়ে বললেন, এটা কোন বিদ্যুতের কথা বলছো।
মতলেব বলল, স্যার, ঐ যে বিশ্ব সরকারের কথা বললাম না? ঐ বিশ্ব সরকারের একমাত্র ছেলের নামই বিদ্যুত্ সরকার।
তৃতীয় প্রশ্ন, আপনার উত্তর বড়ো কথা নয়। প্রশ্ন করতে হবে তাই করছি। রাজা-বাদশাদের শাসন সম্পর্কে আপনি কী জানেন?
মতলেব বলল, জানি মানে, সব জানি। আমার দাদার চাচাতো ভাইয়ের নাম ছদের শেখ। তার এক ছেলের নাম রাজা, আর এক ছেলের নাম বাদশা। তারা বাপের ওঢেল জমিজমা চাষাবাদ করে। তাদের অনেক বড় আমগাছ আছে। সেই আম গাছের আম কুড়াতে গেলে মানুষদের ধরে ধরে মারতো। এখন তারা আমাদের আমগাছের নিচে আসে। বুঝেছেন স্যার বিধির লেখা বড় কঠিন।
এবার প্রশ্নকারী রেগে গিয়ে মতলেবকে স্টেজ থেকে নেমে যেতে বললেন। আরও বললেন, কি পাগল ছাগল ধরে এনেছে স্যারেরা। এরা কোন স্কুলের। কোন স্যারেরা এনেছেন? তিনাদের কি বিবেক বলে কিছু নাই।
মতলেব আবার মাউথ ধরে চেঁচিয়ে বলতে শুরু করল, স্যার আপনাদেরই বিবেক নাই। আমাদের স্কুলের সাথে লাগা বাড়িটাই বিবেকদের বাড়ি। ৬ ফুট ৮ ইঞ্চি লম্বা। তার বউ ৪ ফুট ১ ইঞ্চি। বিবেক ম্যারেজ সিগারেট বিক্রি করে বেড়ায়। আর আমাদের বলেন বিবেক নেই।
মনোখালী, হরিতলা, শালিখা, মাগুরা।
