মোজাহেদুল ইসলাম
বর্তমানে ক্যাবল টিভি অনেক জনপ্রিয় হলেও মাত্র কয়েক বছর আগ পর্যন্ত শুধু ওভার দ্য এয়ার ব্রডকাস্ট টিভির ওপর নির্ভরশীল ছিলাম আমরা। ক্যাবল টিভি চালানোর জন্য একটি ক্যাবল এসে আপনার ঘরের টিভির সঙ্গে যুক্ত হয় কিংবা সেট-টপ বক্সের সঙ্গে লাগানো থাকে। আর এই ক্যাবলটি আসে আপনার বাড়ির পাশের কোনো টিভি স্টেশন থেকে, যেখানে অনেক বড়ো বড়ো ডিশ অ্যান্টেনা লাগিয়ে স্যাটেলাইট থেকে ব্রডকাস্ট সিগন্যাল গ্রহণ করা হয়। ক্যাবল টিভিতে তো আপনি ইচ্ছা অনুসারে চ্যানেল পালটাতে পারেন, কিন্তু আপনি কোন্ প্রোগ্রাম কখন দেখবেন সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, যদি আপনি সেই প্রোগ্রামকে রেকর্ড করে না রাখেন।
আপনি টিভিতে এই মুহূর্তে শুধু সেটাই দেখতে পাবেন, যেটা চ্যানেলটি এই মুহূর্তে ব্রডকাস্ট করছে। কিন্তু এটাতে কেমন হয়, আপনি যে প্রোগ্রাম যখন দেখতে ইচ্ছা করবেন, ঠিক তখনই দেখতে পারবেন?—আর এই ধারণার ওপরই বর্তমানে আইপি টিভি (ইন্টারনেট প্রোটোকল টিভি, ইন্টারনেট টিভি বা ইন্টারনেট টেলিভিশন)-এর চাহিদা বেড়েই চলছে।
আইপি টিভি
প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বিনোদন গ্রহণ করার পদ্ধতিও পরিবর্তন হচ্ছে। রেডিও আসার পরে নিউজ পেপারকে চ্যালেঞ্জ করেছে, নিয়মিত টিভি রেডিওকে চ্যালেঞ্জ করেছে এবং বর্তমানে নিয়মিত টিভিকে আইপি টিভি বা ইন্টারনেট টিভি চ্যালেঞ্জ করছে। সাধারণভাবে দেখতে গেলে ইন্টারনেট টেলিভিশন অনেক সহজ একটি ব্যাপার। এখানে টিভি প্রোগ্রামের ব্রডকাস্ট সিগন্যাল আপনার বাড়ির ছাদে লাগানো অ্যান্টেনা, স্যাটেলাইট ডিশ, ফাইবার অপটিক ক্যাবল দ্বারা না এসে, সিগন্যাল ইন্টারনেট কানেকশন ব্যবহার করে স্ট্রিমিং (একই সময়ে ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড হয় এবং প্লে হয়) করতে হয়। অর্থাত্ এখানে কোনো রেডিও সিগন্যালে অডিও ভিডিও না পাঠিয়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে অডিও ভিডিও সেন্ড করা হয়। আপনার ১০-১০০ মেগাবিট/প্রতি সেকেন্ডের ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট কানেকশনের প্রয়োজন পড়বে, যাতে আপনি সুন্দরভাবে ইন্টারনেট প্রোগ্রামগুলোকে প্লে করতে পারেন।
আপনি চাইলে আপনার কম্পিউটারেও ইন্টারনেট টিভি উপভোগ করতে পারেন, আবার যদি বর্তমান টিভিকেই ইন্টারনেট টেলিভিশনে পরিণত করতে চান, তবে একটি আলাদা সেট-টপ বক্স প্রয়োজন হবে, যেটা ইন্টারনেট থেকে আসা অডিও ভিডিওকে ডিকোড করবে এবং আপনার টিভিতে প্লে করার জন্য পাঠিয়ে দেবে। তবে বর্তমানে ডেডিকেটেড ইন্টারনেট টেলিভিশন পাওয়া যায়, যেখানে আলাদা কোনো সেট-টপ বক্স লাগানোর প্রয়োজনীয়তা নেই।
আইপি টিভি যেভাবে কাজ করে
ট্র্যাডিশনাল টিভি ব্রডকাস্ট করার জন্য প্রোগ্রামকে বেতার তরঙ্গে পরিণত করা হয় এবং একটি অ্যান্টেনার মাধ্যমে বাতাসে ছেড়ে দেওয়া হয়। বাসার ছাদে থাকা আরেকটি অ্যান্টেনা সেই তরঙ্গকে ক্যাচ করে এবং তরঙ্গ থেকে ইলেকট্রিক্যাল সিগন্যালে পরিণত করে এবং আপনার টিভি সেই সিগন্যাল থেকে অডিও এবং ভিডিওকে ডিকোড করে প্লে করে।
আপনি যদি কোনো লাইভ টেলিকাস্ট দেখেন, তবে ভিডিওটি রেকর্ড এবং একই সময়ে ইন্টারনেটে সেন্ড করা হয়। কিন্তু আপনি যদি আগের কোনো প্রোগ্রাম বা পর্ব দেখেন বা যেকোনো ভিডিও দেখার ইচ্ছা করেন তবে সেটিকে বড়ো শক্তিশালী কম্পিউটারে (সার্ভার) স্টোর করে রাখার প্রয়োজন হয়। আর সার্ভারে অবশ্যই প্রোগ্রামগুলোর ডিজিটাল ফরম্যাট সংরক্ষিত করতে হয়, কেননা ইন্টারনেট এবং কম্পিউটার শুধু ডিজিটাল ফরম্যাটের ওপর কাজ করে। বর্তমান সময়ের ক্যামেরাগুলো প্রায় সবই ডিজিটাল ফরম্যাটে রেকর্ড করে কিন্তু কোনো প্রোগ্রাম যদি এনালগ রেকর্ড হয় তবে সেটাকে প্রথমে এনালগ টু ডিজিটাল কনভার্ট করে নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। ভিডিও কনভার্ট করার সময় একে কমপ্রেস (ভিডিও সাইজ কমিয়ে ফেলা হয়) করে নেওয়া হয় যাতে স্লো ইন্টারনেট কানেকশনেও বাফারিং ছাড়া ভিডিওটি চলতে পারে এবং সঙ্গে ভিডিওটিকে উপযুক্ত ফরম্যাটে এনকোড করা হয়। বেশির ভাগ ভিডিওকে MPEG2 এবং MPEG4 ফরম্যাটে এনকোড করা হয়।
ধরুন আপনি বাংলাদেশ থেকে ইন্টারনেট টেলিভিশন দেখতে চাচ্ছেন, কিন্তু আপনার ব্রডকাস্ট সার্ভার রয়েছে অ্যামেরিকাতে। এখন তারা যদি সিডিএন ব্যবহার করে তবে আপনি পছন্দের ভিডিও ফাইলগুলো অ্যামেরিকা থেকে না পেয়ে পাবেন আপনার নিকটবর্তী এশিয়ান কোনো সিডিএন থেকে, এতে ব্যান্ডউইথ স্পিড অনেক ভালো পাবেন, কেননা সার্ভার আপনার লোকেশন থেকে যত কাছে থাকবে, সেখান থেকে ডাটা অ্যাক্সেসও ততদ্রুত করা সম্ভব।
এবার ভিডিওটি আপনার টিভিতে প্লে হওয়ার পালা। ইন্টারনেট টিভি উপভোগ করার জন্য সাধারণত একটি সেট-টপ বক্স প্রয়োজনীয় হয়, যেমন—অ্যাপেল টিভি বক্স, বা অ্যামাজন টিভি বক্স ইত্যাদি। এই বক্সের সঙ্গে ইথারনেট ক্যাবল বা ওয়াই-ফাইয়ের মাধ্যমে ইন্টারনেট কানেক্টেড করা থাকে এবং এটি ইন্টারনেট থেকে আসা ভিডিও ডাটা প্যাকেটগুলো রিসিভ করে এবং প্যাকেটগুলো একত্রিত করে আবার পুনরায় ভিডিও ফাইল তৈরি করে। বক্সের মধ্যে একটি ডিকোডার প্রোগ্রাম থাকে, যেটি ভিডিও ফরম্যাটকে ডিকোড করে এবং সেটা টিভিতে ট্র্যান্সমিট করে, আর পরিশেষে টিভি আপনার ভিডিওটি প্লে করে। ডেডিকেটেড ইন্টারনেট টিভিতে বক্স লাগে না, এর ভেতরেই সকল ভিডিও ডিকোড হয় এবং টিভিকে সরাসরি ইন্টারনেটের সঙ্গে কানেক্টেড করানোর প্রয়োজন হয়।
ইন্টারনেট টিভির ধরন যেমন হয়
নরমাল টিভি থেকে ইন্টারনেট টেলিভিশনের বেশ কিছু বেশি সুবিধা রয়েছে। আপনি বিভিন্ন প্রকারের আইপি টিভি ধরন পছন্দ করতে পারেন এবং উপভোগ করতে পারেন। প্রথম ধরনটির নাম হচ্ছে ভিডিও অন ডিম্যান্ড (Video on Demand) বা ভিওডি (VOD); যেমন- নেটফ্লিক্স বা হুলু এই ধরনের টিভি সেবা প্রদান করে। এখানে কোনো অনুষ্ঠান বা প্রোগ্রাম এপিসোডগুলো প্লে-লিস্ট আকারে থাকে এবং আপনার পছন্দ করার জন্য সুবিশাল অপশন থাকে, প্রথমে আপনাকে এদের কাছ থেকে সাবস্ক্রিপশন নিতে হয় টাকা প্রদান করে তারপরে আপনি টিভি উপভোগ করতে পারেন। আপনি ভিওডিতে কোনো প্রোগ্রাম যখন ইচ্ছা প্লে করতে পারেন, পজ করতে পারেন, আবার আপনার অপছন্দের অংশগুলোকে স্কিপও করে দিতে পারেন, সবকিছুই হবে আপনার ইচ্ছা অনুসারে।
আরেক ধরনের টিভি প্রভাইডার রয়েছে যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করে ইন্টারপ্রাইজ ক্যাবল টিভি চ্যানেলগুলো স্ট্রিমিং করতে সাহায্য করে। এখানে আপনি আইপি টিভি ব্যবহার করে আপনার পছন্দের সকল ক্যাবল টিভি চ্যানেলগুলো লাইভ দেখতে পারেন।
