শিফারুল শেখ
২০১৪ সালে এবং গত বছরের লোকসভা নির্বাচনে জয় পেয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এবং তার ‘চাণক্য’ হিসেবে খ্যাতি পেয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ধারণা ছিল, এবারের দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনেও তাদের সেই দক্ষতা বিজেপিকে ক্ষমতায় ফেরাবে। কিন্তু তা হয়নি। অরবিন্দ কেজরিওয়ালের দল আম আদমি পার্টি (আপ) ৭০ আসনের মধ্যে ৬২ আসন নিয়ে গতকাল শপথ নিয়েছে। হারের কারণ হিসেবে মন্ত্রী প্রকাশ জাভেদকার কংগ্রেসকে দায়ী করেছেন। আর অমিত শাহ বলেছেন, কুকথাই হয়তো বিজেপির হারের কারণ। বিপরীতে কেজরিওয়াল ধর্মীয় বিষয়কে সামনে না এনে কেবল নিজ সরকারের উন্নয়নকেই মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন। এক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন কেজরিওয়ালের নির্বাচনি প্রচারণার অন্যতম সহযোগী প্রশান্ত কিশোর। কেজরির ভূমিধস জয়ে তাই হিন্দুস্তান টাইমস শিরোনাম করেছে, ‘কেজরিওয়ালি দিল্লি’।
জয়ের যত কারণ : টানা তৃতীয়বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসে হ্যাটট্রিক করলেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল। প্রত্যাশার চেয়ে বেশি আসন পাওয়ায় উন্নয়নকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। বিজেপির মতো বড়ো দলকে হারাতে কেজরিওয়ালকে কৌশলী ভূমিকা নিতে হয়েছে। তিনি জাতীয় নাগরিকত্ব সংশোধিত আইন (সিএএ), নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি), দিল্লির শাহিনবাগসহ বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে একেবারেই নিশ্চুপ ছিলেন। লোকসভা ভোটের আগে যেভাবে মোদিকে তীব্র আক্রমণ করা হয়েছিল, এবার একেবারেই সেই পথে যাননি।
বিনামূল্যে বিদ্যুত্ : গত তিন মাসে দিল্লির অর্ধেক মানুষকে এক পয়সাও বিদ্যুতের বিল দিতে হয়নি। বিল এসেছে। কিন্তু তাতে বকেয়ার ঘরে ‘শূন্য’ লেখা। উপহারের এই রাজনীতির শুরু তামিলনাড়ুতে। টেলিভিশন থেকে রান্নার সামগ্রীসহ ভোটের জন্য নানা উপহার বিলি হয় সেখানে। কেজরিওয়াল দিল্লিতে কে কার ভোটার, সেই ভেদাভেদ করেননি। বিনামূল্যে ২০০ ইউনিট বিদ্যুত্, ৭০০ লিটার পানির ক্ষেত্রেও গরিব-ধনী পার্থক্য টানেননি। আপ প্রথম ক্ষমতায় এসেছিল ২০১৩ সালে। পরের বছর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বিদু্যুতে ভর্তুকি ছিল ২৯২ কোটি রুপি। চলতি বছরে তা ২ হাজার কোটিতে ছুঁই ছুঁই। এ বছর ১৭৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। বাকি রাজ্যগুলো যেখানে গড়ে মোট খরচের ১৪ শতাংশের মতো অর্থ শিক্ষায় খরচ করে, কেজরি সেখানে ২৫ শতাংশের বেশি করেছেন। তা সত্ত্বেও দিল্লির রাজকোষ ঘাটতি একই। নতুন করও চাপাতে হয়নি। এর রহস্যের বিষয়ে মুচকি হেসে কেজরি বলেছিলেন, আসলে বিনামূল্যে সুবিধা পরিমিত মাত্রায় হলে তার জন্য বাড়তি কর বসাতে হয় না।
শিক্ষার্থী-অভিভাবক খুশি : কারণ বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোর বেতন বৃদ্ধিতে লাগাম টেনে ধরেছে কেজরিওয়ালের সরকার। এতে দিল্লির প্রায় সব পরিবার কোনো না কোনোভাবে উপকৃত হয়েছে। গত পাঁচ বছরে আপ সরকার সরকারি বিদ্যালয়ের অবকাঠামো থেকে শুরু করে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং স্কুলের সঙ্গে অভিভাবকদের সম্পর্ক তৈরি, সবকিছুতেই ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। এছাড়া সরকারের তৈরি মহল্লা ক্লিনিকে ফ্রি চিকিত্সা ও ওষুধ দেওয়া, সরকারি (ডিটিসি) বাসে নারীদের বিনামূল্যে যাতায়াতের ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে বাসে ‘মার্শাল’ নিয়োগ, নিরাপত্তায় দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরাও স্থাপিত রয়েছে। নমনীয় হিন্দুত্ববাদও কাজে দিয়েছে। কেজরিওয়াল যেমন মুসলিমদের ইফতার পার্টিতে যোগ দিয়েছেন, তেমনি বিভিন্ন পূজায়ও অংশ নিয়েছেন।
নারী ভোটেই বাজিমাত্ : দিল্লির নারীরা উপুড় হস্তে ভোট দিয়েছেন আপকে। সমাজতাত্ত্বিকদের মতে, ভারতীয় মহিলারা তার স্বামী বা পরিবারের পুরুষ কর্তার নির্দেশে ভোট দেন। এবারের নির্বাচন এ ধারণার মূলে আঘাত করেছে। ভোট পরবর্তী বিশ্লেষণে দেখা যায়, আপ পেয়েছে নারী ভোটারদের ৬০ শতাংশ যা ২০১৫ সালের তুলনায় ৭ শতাংশ বেশি। বিজেপি পেয়েছে ৩৫ শতাংশ। এমনকি আপের প্রাপ্ত ভোটের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে নারী এবং পুরুষের সংখ্যা প্রায় সমান সমান। পুরুষ ভোট মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ বেশি। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক জয়তী ঘোষের মতে, বিজেপি যে ঘৃণার ভাষা ব্যবহার করেছে ও হিংসার পথ নিয়েছে তা কোনো মহিলার ভালো লাগার কথা নয়। এছাড়া সমীক্ষায় দেখা গেছে, গত অক্টোবরে মহিলাদের বাসভাড়া মওকুফের সুবিধা নিয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ নারী। বিজেপির তুলনায় আপে তাই গিয়েছে ৪২ শতাংশ বেশি।
কেজরিওয়াল ভবিষ্যত্
প্রধানমন্ত্রী?
২০১৩ সালে প্রথমবার ৪৫ দিনের মাথায় মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে কেজরিওয়াল কার্যত বোকামিই করেছিলেন বলে অনেকেই কটাক্ষ করেছিলেন। কিন্তু সেটা যে লম্বা দৌড়ের প্রস্তুতি ছিল, তা বোঝা যায় গত পাঁচ বছরে কেজরিওয়ালের উন্নয়নের রাজনীতিতে। এবারের ভোট গণনার সময় আম আদমি পার্টির এক সমর্থকের হাতে একটি ব্যানার লক্ষ্য করা যায় যেখানে লেখা ছিল ‘২০২৪ সাল, মোদি বনাম কেজরিওয়াল’। দিল্লির এবারের বিধানসভা নির্বাচন যতটা না ছিল আপ বনাম বিজেপি, এর চেয়েও বেশি ছিল মোদি বনাম কেজরিওয়াল। কারণ অমিত শাহ ঘোষণা দিয়েছিলেন, এবার তারা কোনো মুখ্যমন্ত্রী প্রার্থী ঘোষণা করবেন না। এবারের নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বেই বিজেপি লড়বে।
