মানুষের নেশা বা শখের কোন শেষ নেই। প্রত্যেক মানুষেরই রয়েছে কিছু না কিছু শখ বা নেশা। তবে কিছু কিছু মানুষের রয়েছে কিছু বিচিত্র নেশা। তেমনি বিচিত্র নেশার একজন হলেন মোসলেম। তিনি কিশোর বয়স থেকে সংগ্রহ করে চলেছেন বিশেষ বিশেষ খবরে পত্রিকা ও পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদের কাটিং। প্রায় ৫০ বছর যাবৎ নিরলসভাবে এ কাজটি করে চলেছেন ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার বেকারকান্দা গ্রামের ৭০ বছর বয়সী মোসলেম উদ্দিন।
কিশোর বয়স থেকে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকা পড়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় পত্রিকা সংগ্রহের শখ। তারপর থেকে তিনি বিশেষ বিশেষ দিনের ও বিশেষ বিশেষ খবরের ইত্তেফাক পত্রিকা সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করতে থাকেন। তার সংগ্রহে রয়েছে দৈনিক ইত্তেফাকসহ হাজার হাজার ইংরেজি-বাংলা পত্রিকা, পত্রিকার কাটিং, প্রত্যেক বছরের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসের সংখ্যা, বিভিন্ন ফিচার সমৃদ্ধ সংখ্যা। তার সংগ্রহে রয়েছে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সংসদে দেওয়া হোসেন শহীদ সোরওয়ার্দীর ভাষণের দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকা, ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের খবরের দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকা, ১৯৬৯ সালের জুলাই মাসে মার্কিন নভোচারীদের চাঁদে অবতরণের খবর সম্বলিত দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকা, ১৯৭১সালের রেসকোর্স ময়দানে দেয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকা, বঙ্গবন্ধুর বাকশাল গঠনের পর কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম মিটিং এ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ (২১ জুন, ১৯৭৫), ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকাণ্ডের খবরের পত্রিকা, কাশ্মীর সমস্যা, ফিলিস্তিন সমস্যা, বাঙালী জাতীয়তাবাদ বনাম বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, আদিবাসী কারা?, জয় বাংলা না জয় বাংলাদেশ, শেখ হাসিনার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ। রয়েছে চার্লস-ডায়না, ক্লিনটন-মনিকা, এরশাদ-মেরীর বিষয় নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের পত্রিকা।
আরো পড়ুন: পাঠকের ভালোবাসায় ৬৬ বছরে ইত্তেফাক
দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত ‘সৃষ্টি রহস্যের খোঁজে হাবল’ নিবন্ধ সমৃদ্ধ পত্রিকা। এছাড়াও তার সংগ্রহে রয়েছে ভারত, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের বাংলা ও ইংরেজি বিভিন্ন পত্রিকা। পুরাতন পঞ্জিকা, চিঠিপত্র, বিভিন্ন পত্রিকার কলাম ও নিবন্ধের কাটিং ও পত্রিকা। এ সকল পত্রিকা তিনি তারিখ অনুযায়ী সাজিয়ে রেখেছেন তার একটি ছোট্র কুঁড়ে ঘরে।

মোসলেম উদ্দিন এ প্রতিনিধিকে জানান, অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বড় ভাইয়ের সাথে নিয়মিত দৈনিক ইত্তেফাক পড়তেন। সেই থেকে আর ইত্তেফাক পড়া বন্ধ হয়নি। পাশাপাশি তিনি সংবাদ, নিউ নেশানসহ অন্যান্য পত্রিকাও পড়তেন। তবে ইত্তেফাক না পড়লে তার তৃপ্তি হতো না। শত অভাব অনটনের মাঝেও ইত্তেফাক পত্রিকা কিনা বন্ধ করেননি তিনি।
মোসলেম উদ্দিন গৌরীপুর উপজেলার বেকারকান্দা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯৪৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মৃত রহিম উদ্দিন সরকার। ৪ ভাই, ৩ বোনের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ। গজন্দর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি ও আরকে হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করেন। অর্থাভাবে ৫ বছর পড়াশোনা বন্ধ থাকে তার। পরবর্তীতে তার একটি পালিত ছাগল ৩৪ টাকায় বিক্রি করে গৌরীপুর কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি হন।
টিউশনি করে নিজের লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে সেখান থেকে তিনি এইচএসসি ও স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি একজন ইংরেজি শিক্ষক। কিন্তু তদবির ও চাহিদা মত ডেনেশান দিতে না পারায় কোথাও তার চাকরি হয়নি।
বর্তমানে তিনি আর্থিক অনটনের মধ্যে জীবন যাপন করছেন। নিজের কোন জমিজমা বা সহায় সম্বল নেই। ছোট্ট একটি কুঁড়ে ঘরে বসবাস করার ফলে সঠিকভাবে সংরক্ষণের অভাবে তার সংগ্রহগুলো নষ্ট হতে চলেছে। চিরকুমার মোসলেম উদ্দিন ৭০ বছর বয়সে এখনো তিনি রোজগারের জন্য সারদিন প্রাইভেট টিউশনি করে বাড়িতে এসে রান্না করে খেতে হয়। তিনি মমতাময়ী প্রধানমন্ত্রীর কাছে সাহায্য কামনা করছেন।
ইত্তেফাক/বিএএফ
