অত্যাধুনিক পাইলস অপারেশন ও বাংলাদেশ

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:২০

অধ্যাপক রকিবুল মোহাম্মদ আনোয়ার

দেশে পাইলস সমস্যা ব্যাপক আকারে রয়েছে। বাংলাদেশে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কমবেশি প্রায় সব বয়সের মানুষই পাইলস সমস্যায় ভোগান্তির সম্মুখীন হন। পাইলসের রোগীরা পায়ুপথ দিয়ে রক্তক্ষরণ,পায়ুপথ ফুলে যাওয়া, ব্যথা অনুভব করা, পায়ুপথ দিয়ে পাইলস বেরিয়ে আসা, মলদ্বারের চারপাশে চুলকানোসহ বিভিন্ন উপসর্গে পীড়িত হন। উপসর্গগুলো দীর্ঘস্থায়ী হলে অথবা অনেক সময়ে উপসর্গগুলো ত্বরিতভাবে মারাত্মক আকার ধারণ করলে জটিলতা রোগীর জীবনে হুমকির সৃষ্টি করতে পারে। সে কারণে এবং যেহেতু পাইলসের উপসর্গ কোলন অথবা রেক্টাল ক্যানসারের উপসর্গ অনেক সময় একই রকম হতে পারে, তাই পাইলস উপসর্গ সম্পর্কে জনসাধারণের সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।

পাইলস পায়ুপথ দিয়ে বেরিয়ে আসে কি না তার ওপর নির্ভর করে পাইলসকে চার  মাত্রায় বিভক্ত করা হয়ে থাকে এবং পাইলস চিকিত্সা বহুলাংশে এই মাত্রা বিভেদের ওপর নির্ভরশীল। পায়ুপথে শুধু রক্তক্ষরণ প্রথম ডিগ্রি/মাত্রা পাইলসের বৈশিষ্ট্য, এই মাত্রার পাইলস কখনোই পায়ুপথ দিয়ে বেরিয়ে আসে না। দ্বিতীয় ও তৃতীয় মাত্রা পাইলস পায়ুপথ দিয়ে বেরিয়ে আসে মল ত্যাগ করার সময়ে কিন্তু মল ত্যাগ সম্পন্নের পর দ্বিতীয় মাত্রার ক্ষেত্রে নিজ থেকেই মলদ্বারের ভেতরে চলে যায় এবং তৃতীয় মাত্রা পাইলসের ক্ষেত্রে রোগীকে অঙ্গুলি দ্বারা চাপ দিয়ে পুনরায় মলদ্বারের ভেতরে প্রতিস্থাপন করতে হয়। চতুর্থ মাত্রার পাইলস সব সময়ই পায়ুপথের বাইরে অবস্থান করে।

প্রথম মাত্রা ও প্রথামাবস্থায় দ্বিতীয় মাত্রা পাইলস চিকিত্সা :

ইনজেকশন ও ব্যান্ড লাইগেশনের মাধ্যমে চিকিত্সা করা হয়ে থাকে।

সেই সঙ্গে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারা পদ্ধতি পরিবর্তন করে নরম কিন্তু শক্ত অথবা পাতলা নয়, এমন মল ত্যাগ করার অভ্যাস করা।

উপরিউক্ত চিকিত্সার মাধ্যমে প্রথম মাত্রা ও প্রথমাবস্থায় দ্বিতীয় মাত্রা পাইলসের চিকিত্সা সম্ভব হতে পারে।

অগ্রবর্তী দ্বিতীয় মাত্রা এবং তৃতীয় ও চতুর্থ মাত্রা পাইলস চিকিত্সা :

এই মাত্রার পাইলস শুধু শল্যচিকিত্সায় অপারেশনের মাধ্যমেই আরোগ্য করা সম্ভব হয়। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের দু’জন শল্য চিকিত্সক মিলিগান ও মরগান ১৯৩৭ সালে এ ধরনের পাইলসের জন্য পায়ুপথের তিন অবস্থানে চর্মসহ অভ্যন্তরীণ অংশ কেটে ফেলে রোগীর আরোগ্য করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। দুর্ভাগ্যক্রমে এ অপারেশনের পর প্রচণ্ড ব্যথা হয়, বিশেষভাবে মলত্যাগের পর, ঘা শুকাতে দেড় থেকে দুমাস সময় লাগে, ঘন ঘন মলত্যাগ এবং অনেক ক্ষেত্রে মলত্যাগের অনুভূতি এলেই দ্রুতভাবে টয়লেটের দিকে ধাবিত হতে হয়। মলত্যাগের পর মনে হয় যে মলাশয় মলমুক্ত হয়নি এবং আবারও মলত্যাগের অনুভূতি অনুভব করা যায়। অনেক সময়ে অপারেশানের পর দেড় থেকে দুই মাসের আগে কাজে ফিরে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং পরিবার আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়। অপারেশনের জটিলতায় মলদ্বার সংকুচিত হয়ে যেতে পারে অথবা মল আটকে রাখার ক্ষমতা হারিয়ে জীবনযাত্রা দুর্বিষহ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

১৯৯৩ সালে ইতালির প্যালেরমো বিশ্ববিদ্যালয়ের শল্যবিভাগের অধ্যাপক ডা. এন্টোনিও লংগো নতুন পদ্ধতির মাধ্যমে মলদ্বারে ক্ষত না করে, চর্ম অথবা মাংস না কেটে পাইলসের অত্যাধুনিক অপারেশান আবিষ্কার করেন। এই অত্যাধুনিক পদ্ধতি ল্ডস্ট্যাপলেডহেমোর হাইডেক্টটমিল্ফ অথবা ‘স্ট্যাপ লেডহেমোর হাইডোপেঙ্ল্ফি নামকরণে ভূষিত। এটি একটি অস্ত্রোপচার-পদ্ধতি যা অস্বাভাবিকভাবে বর্ধিত হিমোরোডিয়াল (পাইলস) টিস্যু অপসারণ করে, তারপর অবশিষ্ট হেমোরোডিয়াল (পাইলস) টিস্যুকে তার স্বাভাবিক শারীরিক অবস্থানে ফিরিয়ে আনে। এতে করে পাইলসের স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরে আসে এবং রোগী উপসর্গমুক্ত হয়। অধ্যাপক ডা. এন্টোনিও লংগো বিশ্বাস করেন যে পায়ুপথ থেকে বেরিয়ে আসা পাইলসকে ঝুলেপড়া মাংসপিণ্ডের সঙ্গে তুলনা চলে। কোষ্ঠকাঠিন্য, গর্ভাবস্থা এবং অন্যান্য কারণে উপর্যুপরি আঘাতে পাইলসের পরিপোষক বন্ধনীগুলো দুর্বল হতে শুরু করে সঙ্গে সঙ্গে পাইলসগুলোও ঝুলে পড়তে থাকে। তখন সামান্য ঘর্ষণে পাইলসের মধ্যকার শিরা থেকে রক্ত ঝরা শুরু হয়, যে রক্তের পরিমাণ অল্প থেকে প্রচুর হওয়া অস্বাভাবিক নয়। প্রফেসর লংগো যে পদ্ধতি ব্যবহারে সাফল্য অর্জন করেছেন সে পদ্ধতির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ঝুলে পড়া পাইলসকে আগের স্বাভাবিক অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়া এবং পাইলসের রক্ত সঞ্চালনকে বাধাগ্রস্ত করে ফুলে যাওয়া রক্তনালিগুলোকে শুকিয়ে দেওয়া হয়। পাইলসের স্বাভাবিক কার্যকলাপ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং রোগী উপসর্গমুক্ত হয়। যে অত্যাধুনিক যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে অপারেশান করা হয় সে যন্ত্র মলদ্বারের বাইরে কোনো কাটাছেঁড়া করে না কিন্তু মলদ্বারের ভেতরে পায়ুপথ থেকে প্রায় দেড় ইঞ্চি ওপরে একটা অংশ চক্রাকারে কেটে নিয়ে আসে এবং একই সঙ্গে কাটা জায়গার প্রান্ত টাইটেনিয়াম দ্বারা তৈরি সূক্ষ্ম স্টেপেল দিয়ে জোড়া দেওয়া হয়। যে স্থানে কাটা ও জোড়া দেওয়া হয় সেখানে ব্যথার স্নায়ু/পেইন ফাইবার থাকে না, যার ফলে অপারেশনের পর রোগী ব্যথাহীন থাকে অথবা যত্সামান্য ব্যথা অনুভূত হয়, ঘা শুকানোর প্রশ্ন আসে না এবং রোগী দ্রুত কাজে ফিরে যেতে পারে। অপারেশানের পর রোগী পশ্চিমা দেশগুলোতে একই দিনে বাড়ি চলে যেতে পারে। কিন্তু আমরা আমাদের রাহেটিড স্পেশ্যালাইজড হাসপাতালে রোগীর সুবিধার্থে এক বা দুদিন হাসপাতালে রাখার ব্যবস্থা করি।

n লেখক :পাইলস বিশেষজ্ঞ