পাঠকের পতন

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২২:৪৫

রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধৃত করেই এই আলাপ শুরু করা যেতে পারে। ফাল্গুনের এই তোলপাড় করা ঝরা পাতার দিনে প্রতিটি বৃক্ষই প্রকাশ করে রবীন্দ্র বয়ানের অপূর্ব প্রাসঙ্গিকতা। প্রতিটি বৃক্ষই যেন হিমেল হাওয়ায় গুনগুন করে গাইতে থাকে ‘ওরে ভাই, ফাগুন লেগেছে বনে বনে’। এই বৃক্ষবিহীন শহরে বনে বনে আগুন ছড়িয়ে দেওয়া বসন্ত যখন আসে, বইমেলাও আসে। কিন্তু লেখকদের মনে সাধারণত ফাগুন আসে না, আগুনটুকু নিজের ভেতরে লুকিয়ে রেখে তাকেও হাসতে হয়।

বিশেষত তরুণ লেখকের কথা যদি বলি, এই পাঠকশূন্য দেশে তরুণ লেখকের পক্ষে বই প্রকাশ করা ভয়াবহ এক দুঃসাহস। কারণ প্রতিষ্ঠিত লেখকদেরও বইয়ের বিক্রি নিয়ে আতঙ্কিত থাকতে হয়। তরুণ লেখকের সেই আতঙ্ক আরো অনেক বেশি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তরুণ লেখকের বইটি টাকার বিনিময়ে প্রকাশিত হয়, এই মাঝারি আয়ের দেশে একজন তরুণ লেখক কতটা আর্থিক অসচ্ছলতার সঙ্গে যুদ্ধ করেন, সেটা একবার কল্পনা করে দেখুন। এমন আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যে বইটি লেখক বিপুল স্বপ্ন নিয়ে প্রকাশ করেন, সেটি যখন একেবারেই কম বিক্রি হয়, আর্থিক দিক থেকে তরুণ লেখককে দুর্ভোগের শিকার হতে হয়। শুধু আর্থিক নয়, মানসিকভাবেও তাকে প্রচণ্ড বিপর্যয় পেরিয়ে যেতে হয়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বই কম বিক্রি হওয়ার কারণে লেখককে কটু বাক্যও শুনতে হয়, তার সামাজিক সম্মান ও অবস্থানও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে বই বিক্রি একজন তরুণ লেখকের একটি আত্ম-অহংকারের জায়গা হয়তো। বই খুব কম বিক্রি হলে লেখকের আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে। তরুণ লেখকের স্বপ্নের শক্তি এতই প্রবল, সেই স্বপ্ন কোনো কারণে ব্যর্থ হলে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারেন। এমনকি এটি একটি মানসিক ট্রমায়ও রূপান্তরিত হতে পারে।

গত কয়েক বছরে একুশে বইমেলার যে চিত্র, সেখানে প্রকৃত নির্মোহ লেখকমাত্রই বিক্রিবিহীন। প্রযুক্তির পায়ের লাথি খেয়ে বর্তমান বাংলাদেশ বইপত্র থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছে। বইমেলায় সামাজিক, রাজনৈতিক এবং আরো নানা কারণে বই যদিও বিক্রি হয়, কিন্তু অনেক পাঠকই বই শুধু সাজিয়ে রাখেন ঘরের একটি শোপিস হিসেবে। বর্তমানে বইয়ের পাঠক সংখ্যায় অতি নগণ্য। শুধু বাংলাদেশ নয়, যন্ত্রের কালো থাবায় জগত্ জুড়েই যেন মানুষ বই থেকে দিনে দিনে দূরে সরে যাচ্ছে।

লেখক যত ভালোই লিখুন, বর্তমান বাজারে তার বই নিশ্চয়ই আমলা ও রাজনৈতিক নেতাদের চেয়ে বেশি বিক্রি হবে না, লেখকের মতো নিরীহ একজন ব্যক্তিকে তোষামোদ করতে কার এত দায়! শুধু আমলা-রাজনীতিবিদ নন, একজন সাধারণ ইউটিউবারের বইও প্রখ্যাত লেখকদের তুলনায় অনেক বেশি বিক্রি হয়।

তরুণ লেখকদের প্রতি সংবাদপত্রেরও রয়েছে গুরুদায়িত্ব। কিন্তু এ কথা কে না জানে, সংবাদপত্র নিজে থেকেই এই দায়িত্ব কাঁধে বয়ে বেড়ালেও প্রকৃত যোগ্য তরুণ লেখকদের তারা সাধারণত খুঁজে পায় না। দুঃখজনক সত্য হলো, বই ও লেখককেন্দ্রিক প্রচারণায় অনেক সংবাদপত্রে পক্ষপাতদুষ্টতা ও বিচক্ষণতার ঘাটতি প্রায়শই দেখা যায়। তরুণ লেখকের জীবনে এই রাজধানী শহরে ফাল্গুন বসন্তসজ্জায় সুশোভিত ও উপভোগ্য হয়ে আসে না। কেননা, ফাল্গুনের বইমেলা তাকে ভয়ংকর এক প্রতিযোগিতা ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করে এবং শেষ পর্যন্ত তার সৃজনশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।