পাঁচ বছরে পেঁয়াজের আমদানি বেড়ে দ্বিগুণ

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২২:৪৮

দেশে গত পাঁচ বছরের ব্যবধানে পেঁয়াজের আমদানি বেড়েছে দ্বিগুণ। অথচ এই সময়ে উত্পাদন বেড়েছে মাত্র ২০ ভাগ। আমদানির ওপর অনেকটা নির্ভরশীল হওয়ায় কোনো সংকট হলে দেশের বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। গত বছর ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিলে দেশের বাজারে ৩০ টাকা কেজির পেঁয়াজ ২৫০ থেকে ২৮০ টাকায় উঠে যায়। রাজধানীর খুচরা বাজারে এখনো প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১২০ টাকা। আর আমদানিকৃত পেঁয়াজ ৭০ থেকে ১২০ টাকা। গত কয়েক মাসের ব্যবধানে এই দর অনেকটা কম হলেও বর্তমানে যে                 দামে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে তা গত বছরের এই সময়ের তুলনায় ৫ গুণ বেশি।

সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবির) হিসাবে গত বছর এই সময়ে আমদানিকৃত ও দেশি পেঁয়াজ প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ২০ থেকে ২৫ টাকায়। সরকারের এই সংস্থাটি জানিয়েছে, সোমবার খুচরা বাজারে আমদানিকৃত পেঁয়াজের দর আরেক দফা বেড়েছে।

কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অনুয়ায়ী, দেশে পেঁয়াজের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমদানি নির্ভরতাও বাড়ছে। গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ আমদানি হয় ৫ লাখ ২৫ হাজার টন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৭ লাখ ২৪ হাজার টন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৯ লাখ ৮৭ হাজার টন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৮ লাখ ৬৩ হাজার টন ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১০ লাখ টনের বেশি পেঁয়াজ আমদানি হয়। অর্থাত্ ৫ বছরের ব্যবধানে আমদানি  বেড়েছে দ্বিগুণ।

অথচ এই সময়ে দেশে পেঁয়াজ উত্পাদন বেড়েছে মাত্র ২০ ভাগ। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ উত্পাদন হয় ১৯  লাখ ৩০ হাজার টন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২১ লাখ ৩০ হাজার টন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২১ লাখ ৫৩ হাজার টন, ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ উভয় অর্থবছরে ২৩ লাখ ৩০ হাজার টন করে পেঁয়াজ উত্পাদন হয়।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, প্রতি বছর পেঁয়াজ চাষে কৃষককে প্রণোদনা দেওয়া হয়। এ খাতে প্রতি বিঘা জমির জন্য কৃষককে এক কেজি বীজ, ২০ কেজি ডিএপি ও ১০ কেজি এমওপি সার দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে এই আর্থিক সহায়তার পরিমাণ ১ হাজার ৭১৪ টাকা। সারাদেশে ৭ হাজার ৭০০ কৃষককে এই প্রণোদনা দেওয়া হয়। কিন্তু তার পরও  উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পেঁয়াজের উত্পাদন বাড়ছে না কেন?

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কৃষক অন্যান্য ফসল উত্পাদনে যতটা আগ্রহী পেঁয়াজ উত্পাদনে ততটা নয়। কারণ, পেঁয়াজ বেশিদিন সংরক্ষণ করা যায় না। পেঁয়াজ সংরক্ষণে উপযুক্ত মানের কোল্ড স্টোরেজ নেই। আবার সব জমিতেও পেঁয়াজের ফলন ভালো হয় না। দেশের উত্তর-পশ্চিমের জেলাগুলোতে পেঁয়াজের ফলনটা ভালো হলেও সিলেট বা দক্ষিণে চট্টগ্রামের হাইল্যান্ড বা বেশি লো ল্যান্ডে এর ফলন হয় না। কারণ জমিতে পানি জমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া এক বছর দাম পেলে পরের বছরই হয়তো আবার লোকসান গুনতে হয়।

এ প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য দিতে এবার মৌসুমে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ থাকবে। তিনি বলেন, চাষিরা যখন পেঁয়াজ তোলেন, তখন দাম কমে যায়। দাম না পেয়ে কৃষকরা পেঁয়াজ আবাদে উত্সাহ হারিয়ে ফেলেন। তাই বাণিজ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের আলোচনা হয়েছে। পেঁয়াজ তোলা শুরু হলে আমদানি বন্ধ থাকবে। তিনি বলেন, যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে,  পেঁয়াজ নিয়ে সামনের বছর সমস্যা হবে না। উল্লেখ্য, গত বছর সংকটের কারণে পেঁয়াজের দাম বাড়ায় এ বছর দেশে বেশি পরিমাণ জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে।

রায়গঞ্জ (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা দীপক কুমার কর জানিয়েছেন, রায়গঞ্জে গত মৌসুমের তুলনায় এবার তিন গুণ জমিতে পেঁয়াজের চাষ হচ্ছে। বাজারে পেঁয়াজের দাম চড়া ও আবহাওয়া অনুকূল থাকায়  পেঁয়াজ চাষে কোমর বেঁধে নেমেছেন এলাকার কৃষকরা। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত মৌসুমে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছিল মোট ৫১ হেক্টর জমিতে। চলতি মৌসুমে আবাদ হয়েছে প্রায় ১৫০ হেক্টর জমিতে। পেঁয়াজ রোপণকাজ চলমান রয়েছে।

বগুড়া অফিস থেকে স্টাফ রিপোর্টার মিলন রহমান জানান, গত তিন বছর ধরেই জেলায় পেঁয়াজের চাষ বাড়ছে। এ বছর উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরে বগুড়ার ১২টি উপজেলায় পেঁয়াজ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে। সেখানে চাষ হয়েছে ৩ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে।

পাবনা প্রতিনিধি রুমী খোন্দকার জানান, পেঁয়াজ আবাদে বিখ্যাত পাবনায় এবার পেঁয়াজ আবাদ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি হয়েছে। পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (খামারবাড়ি) সূত্রে জানা যায়, চলতি  মৌসুমে পাবনা জেলায় পেঁয়াজ সুজানগর উপজেলায় ১৮ হাজার ৪০০ হেক্টরে ২ লাখ ২০ হাজার ৯০৫ টন, সাঁথিয়ায় ১৬ হাজার ৯৭০ হেক্টরে ২ লাখ ৩ হাজার ৭৩৮ হাজার টন, পাবনা সদরে ৪ হাজার ৪০০ হেক্টরে ৫২ হাজার ৮২৫ টন, ঈশ্বরদীতে ৬৩০ হেক্টরে ৭ হাজার ৫৬৪ টন, বেড়ায় ৪ হাজার ৪৬০ হেক্টরে ৫৩ হাজার ৫৪৫ টন, ফরিদপুরে ১ হাজার ৩২০ হেক্টরে ১৫ হাজার ৮৪৮ টন, চাটমোহরে ১ হাজার ১০০ হেক্টরে  ১৩ হাজার ২০৬ টন, ভাঙ্গুড়ায় ৩৮০ হেক্টরে ৪ হাজার ৫৬২ টন ও আটঘরিয়ায় ১ হাজার ৭৬০ হেক্টর জমিতে ২১ হাজার ১৩০ টন পেঁয়াজ  উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।