ড. হাফিজ মুহম্মদ হাসান বাবু
বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের একটি উন্নত দেশে রূপান্তরিত হতে চলেছে। বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা এ ধরনের যে সব সংস্থা রয়েছে তাদের সকলেরই অভিমত, বাংলাদেশ আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে একটি মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হবে। বর্তমান বাংলাদেশ সরকারও এক্ষেত্রে তাদের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশ বলে বিবেচিত হবে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ পৃথিবীর উন্নত দেশের কাতারে শামিল হবে। বর্তমান সরকার দেশের উন্নয়নে গত কয়েক বছরে দেশকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে, কিন্তু ডিজিটাল বাংলাদেশ তথা ভিশন-২০২১, ভিশন-২০৪১ ও ডেল্টা প্ল্যানিং-২১০০ বাস্তবায়নে সরকারকে নিন্মোক্ত বিষয়সমূহে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।
প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে উপযুক্ত ব্যক্তির মূল্যায়ন
প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ডিজিটাল বাংলাদেশের কার্যক্রম যথাযথভাবে কার্যকর করার জন্য যোগ্য লোককে উপযুক্ত জায়গায় দায়িত্ব প্রদানের বিষয়ে সরকারের কঠোর অবস্থান প্রয়োজন। খেয়াল রাখতে হবে যেন সুবিধাভোগীরা সাময়িক একটা সাফল্য সরকারের কাছে উপস্থাপনের ব্যাপারে অতি উত্সাহ না দেখায়। দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর একটা কাঠামো দাঁড় করাতে না পারলে কেবল কিছু ব্যক্তি ফায়দা লুটে নেবে— দল বা সরকার সার্বিকভাবে কোনো সুবিধা পাবে না।
আইসিটি ক্যাডার চালুকরণ ও তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবীদের কাজের সমন্বয়সাধন
বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের বড়ো হাতিয়ার হলো আইসিটি পেশাজীবীগণ। বাংলাদেশের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা আইসিটি বা ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে বা ডাক্তারি বিষয়ে পড়াশোনা করেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, দেশে আইসিটি বিষয়ে মেধাবী ডিগ্রিধারীদের জন্য আইসিটি ক্যাডার না থাকলেও অন্যান্য বিষয়ে ডিগ্রিধারীদের জন্য ক্যাডার সার্ভিস চালু রয়েছে। এতে করে আইসিটি বিষয়ে মেধাবী ডিগ্রিধারীরা হতাশাগ্রস্ত। সমাজে তাদের পেশার সুনির্দিষ্ট কোনো মর্যাদা না পেয়ে হতাশার কারণে দেশের আইসিটি বিষয়ের মেধাবীরা দেশ ত্যাগ করে বিদেশে পাড়ি জমায়। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যুগের সঙ্গে তাল মেলানোর জন্য অনেক নতুন নতুন বিষয়ের ক্যাডার সার্ভিস চালু হতে পারে, ঠিক যেমনটি দাবি রাখে আইসিটি পেশাজীবীরা তাদের আইসিটি ক্যাডারের।
প্রশাসন ক্যাডারের পেশাজীবীরা সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকলেও তাদের কাজের সমন্বয়সহ অন্যান্য বিষয়ে নজরদারির জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় রয়েছে, ঠিক একইভাবে আইসিটি পেশাজীবীরা সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকলেও তাদের কাজের সমন্বয়সহ অন্যান্য বিষয়ে নজরদারির জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো মন্ত্রণালয় নেই, যা দায়িত্ব হিসেবে আইসিটি মন্ত্রণালয়কে দেওয়া যেতে পারে। এতে করে আইসিটি পেশাজীবীদের বিভিন্ন কাজের মধ্যে সমন্বয় করে সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প সঠিকভাবে ও দ্রুতগতিতে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ
ঢাকার অতিকেন্দ্রীকতা বজায় রাখা বিকেন্দ্রীকরণ না হওয়ার প্রধান কারণ। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কয়েকটি প্রধান দপ্তর ঢাকার বাইরে কোনো জেলায় স্থাপন করা, নানা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান পালা করে নানা জেলায় আয়োজন করা এবং বিভাগীয় পর্যায়ে সরকারি অফিসে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার সীমা অনেক গুণে বাড়িয়ে দেওয়া। কয়েকটি বড়ো মাপের সরকারি বিভাগের প্রধান কার্যালয় পর্যায়ক্রমে আট বিভাগে স্থানান্তর করা (যেমন :রেলওয়ে ও নৌবাহিনীর সদর দপ্তর চট্টগ্রামে) ইত্যাদি। বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে আরো নানা পরামর্শ দিতে পারে। তার আগে দরকার সরকারের রাজনৈতিক ও নীতিগত সিদ্ধান্ত। সরকারকে আগে ঠিক করতে হবে ‘তারা বাংলাদেশকে এক-নগরের দেশ করে রাখবে না।’ তারা দেশের প্রশাসন, শিল্প ও ব্যবসাকে বিকেন্দ্রীকরণ করবে। এই অঙ্গীকার বা নীতি গ্রহণ না করলে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে বিস্তারিত কাজে হাত দেওয়া সম্ভব হবে না। রাজধানীকে বিকেন্দ্রীকরণ করা এখন আর বড়ো কাজ নয়। বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি অঞ্চল, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিটি কর্মকাণ্ড তথ্য-প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে যা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা নির্ভর না হয়ে দেশকে একটি তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর দেশে পরিণত করেছে। সুতরাং সরকারের প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের ফলে দেশের যে কোনো প্রতিষ্ঠান যে কোনো অঞ্চল থেকে তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারবে।
দুর্নীতি ও সন্ত্রাস দমন
দুর্নীতি ও সন্ত্রাস একটি দেশের উন্নয়নকে অনেক বাধাগ্রস্ত করে। তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার যদিও দেশের দুর্নীতিকে অনেকাংশে কমিয়েছে, তবুও দুর্নীতি দমনে এখনো আমাদের অনেক দূর যেতে হবে। তথ্য-প্রযুক্তির শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিত করা, দুর্নীতি দমনে কঠোর আইন প্রণয়ন করাসহ আরো অনেক দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপ গ্রহণ করে বাংলাদেশকে ২০৪১ সালের মধ্যে দুর্নীতি ও সন্ত্রাস মুক্ত দেশ হিসেবে ঘোষণা করা।
বিচার ব্যবস্থা
বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা এক জটিল প্রক্রিয়ায় কার্যক্রম পরিচালনা করে যা এদেশের মানুষের কাছে অনেকটা কষ্টদায়ক। তাই ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল ও দেশের সর্বত্র সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি প্রযুক্তিনির্ভর ও সুন্দর বিচার ব্যবস্থার প্রয়োজন। জটিল বিচার ব্যবস্থার চেয়ে একটি সহজ ও ভীতিবিহীন বিচার ব্যবস্থা সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য। প্রয়োজনে সাধারণ মানুষের চাহিদা বিবেচনা করে কেন্দ্রীয় বিচার ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীয়করণ করতে হবে; যার মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা কমে আসবে এবং সাধারণ মানুষের সুবিচার প্রাপ্তি সহজ ও দ্রুততর হবে।
আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি
ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের অন্যতম উপকরণ হলো আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি। তথ্য-প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার ও ব্যবহারের জন্য গাজীপুরের কালিয়াকৈরের বঙ্গবন্ধু হাইটেক পার্কসহ দেশের অন্য হাইটেক পার্কগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে ২০৪১ সালের মধ্যে কালিয়াকৈর বঙ্গবন্ধু হাইটেক পার্কসহ দেশের সকল জেলায় হাইটেক পার্কের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। দেশে হাইটেক পার্কগুলোতে যেসব শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠিত হবে তাদের সঙ্গে দেশের কোনো না কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা বাধ্যতামূলক করে দিতে হবে। এতে শিল্পকারখানাগুলো নিজস্ব অস্তিত্বের স্বার্থে যেমন দেশীয় প্রযুক্তি ও মেধাকে ব্যবহারের সুযোগ পাবে, ঠিক একইভাবে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দেশের শিক্ষার্থীবৃন্দকে বাস্তবসম্মত শিক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাবে। পুঁথিগত মেধা সৃষ্টির চেয়ে এখন বাংলাদেশে বড়ো প্রয়োজন মেধার সত্যিকার ব্যবহারিক বাস্তবায়ন যা বাংলাদেশের মানুষের প্রতিদিনের কাজে লাগে। এছাড়াও দেশের সত্যিকার প্রযুক্তিবিদদের তাদের কর্মক্ষেত্রের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়ভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন
ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন ও শিক্ষিতের হার বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। ২০০৯ সালে বর্তমান সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের সময় দেশের সাক্ষরতার হার ছিল ৫২ শতাংশ যা বর্তমানে ৭২.৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। শিক্ষার মানোন্নয়নকল্পে প্রত্যেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাসহ সহজ বাস্তবমুখী শিক্ষা প্রদান পদ্ধতি প্রণয়ন করতে হবে। ২০৪১ সালের মধ্যে দেশের সব গ্রামে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্কুল ও কলেজ স্থাপন করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর এবং দেশের সমাজ ব্যবস্থার আলোকে বাস্তবসম্মত শিক্ষা দিতে হবে যার মধ্যে নৈতিকতাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। প্রয়োজনবোধে স্নাতক পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার আওতায় আনা যেতে পারে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের কারিগরি ও সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থাকে আমূল পরিবর্তন করে দেশের শিল্প ও বাস্তবতানির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে। বাংলাদেশ অমিত সম্ভাবনাময় দেশ। এখানকার জনগণ কঠোর পরিশ্রমী। প্রশাসনিক দক্ষতা আর সদিচ্ছার মাধ্যমে এ দেশের উন্নয়ন করা অসম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনামূলক নেতৃত্ব এবং বর্তমান সরকারের সদিচ্ছায় এ দেশ এগিয়ে যাবে বহুদূর। তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর যে বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখছি, তা সত্যিই একদিন দৃশ্যমান হবে তা আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
লেখক :প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ কম্পিউটার সোসাইটি ও প্রেসিডেন্ট, ইন্টারনেট সোসাইটি, বাংলাদেশ চ্যাপ্টার
