আর্থিক ব্যবস্থাপনায় উন্নয়ন দরকার

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:৪৮

প্রফেসর ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী

দেশের আর্থিক খাতে ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মী-কর্মকর্তাদের মধ্যে ন্যায়নিষ্ঠা, কর্মের প্রতি আগ্রহ, গ্রাহকসেবার মান উন্নয়ন, সঞ্চয় বিনিয়োগের মধ্যে উত্কর্ষতা সাধন করা গেলে বাংলাদেশের উন্নয়নে বর্তমান সরকারের যে নিরলস প্রয়াস তা আরো বেগবান হতো। সম্প্রতি দেখা যায় যে, বাংলাদেশ বিশ্বে মোট দেশজ উত্পাদনের ক্ষেত্রে চতুর্থস্থান অধিকার করেছে। এটি অবশ্যই সরকারপ্রধানের নিরলস প্রয়াসের ফল। পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার স্বার্থে সম্প্রতি সরকারপ্রধান বেশ কিছু মূল্যবান নির্দেশনা দিয়েছেন। এগুলো বাস্তবায়নে তদারকি সংস্থাসমূহকে আরো বেশি করে তত্পর হতে হবে। ইতিপূর্বে পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা গেছে যে, পুঁজিবাজারে বেশ কিছু রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ছাড়ার কথা ছিল; কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে যে, সেগুলো পরে স্থগিত হয়ে যায়। এটি অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, রেগুলেটাররা করপোরেট গভার্নেস না থাকায় ডেবট মার্কেট এবং ডেরিভেটিভস মার্কেট চালু করেননি। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ব্যাংকনির্ভর শেয়ারমার্কেট যথাযথ সমাধান নয়। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ-ব্যবস্থাপনার জন্য পুঁজিবাজারকে গতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও যারা তদারকি সংস্থায় আছেন তাদের ঢিলেমির জন্য উদ্যোগ ম্লান হয়ে গেছে। কেননা তারা কেবল দিনকে রাত বানায়, রাতকে দিন বানায়। যদি সরকারি নির্দেশ ও আদর্শের প্রতিফলন কার্যকর করতে পুঁজিবাজারে নিয়ন্ত্রক সংস্থায় চেয়ারম্যান ও সদস্য হিসেবে ব্যর্থ হয়, তবে পদ ধরে রাখার কী দরকার। শিল্প উন্নয়নের জন্য পুঁজিবাজারকে অবশ্যই বহুমাত্রিকতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। তাদের কর্মপদ্ধতিতে ঝুঁকিব্যবস্থাপনার মান উন্নয়ন করা বাঞ্ছনীয় হয়ে পড়েছে। যদি সরকার নির্দেশিত রপ্তানিপণ্য বহুধাবিভক্তকরণ করতে চায়, তবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে এগিয়ে আসতে হবে। এদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের অনীহা কমে গেছে—তাদের ধারণা পুুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করলে প্রাপ্তিযোগ নাও ঘটতে পারে। সাধারণ বিনিয়োগকারী ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বাজারের অবস্থা পর্যালোচনা না করেই অনেক ক্ষেত্রে বিনিয়োগে অনীহা দেখান। এদিকে নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশের মান যাতে উন্নত হয় সে জন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। আবার দেশের সাধারণ মানুষের বিমাব্যবস্থার প্রতি অনীহা—যা দূর করে বিমা গ্রহণে আগ্রহী করতে হবে। বিভিন্ন সময়ে যে দামের নির্ভর সংবাদ আছে তা যেন যথাসময়ে বিনিয়োগকারী এবং অন্যরা পায় সে ব্যবস্থা করতে হবে। পুঁজিবাজার থেকে শিল্পে বিনিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। আজ থেকে প্রায় ২৬ বছর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে যা পড়েছিলাম, ২০২০ খ্রিষ্টাব্দে এসে দেখা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংক তার দায়িত্ব পালনে অনেকখানি অক্ষম। বরং এক শ্রেণির বাণিজ্যিক ব্যাংক গ্রাহক ও ঋণগ্রহীতাদের ওপর এমনভাবে লুক্কায়িত  চার্জ, কমিশন, ফি আরোপ করছে যা থেকে প্রকট হয়ে উঠছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্তব্যকর্মে গাফিলতি ও অদক্ষতা। বাংলাদেশ ব্যাংকের অদক্ষতার কারণেই সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যাংকিং ব্যবসায় পিছিয়ে আছে। একটি বাস্তব উদাহরণ দেই। একটি ব্যাংকে আমার একটি ক্রেডিট কার্ড ছিল। গত ডিসেম্বরে ১০ হাজার ৯৯৯ টাকা পাওনা হয়েছিল। যেহেতু ভুলে গিয়েছিলাম, সেহেতু আমি তাদের কাছে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে জানতে চাই আমার ক্রেডিট কার্ডের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে—কী করা। তারা জানায়, আমার পাওনার কথা। সঙ্গে সঙ্গে ১২ জানুয়ারি ১১ হাজার ৫০০ টাকা দেই। অথচ ১৫ জানুয়ারি ২০২০ খ্রিষ্টাব্দে আবার ৯৪৮/৯৯ টাকার বিল প্রেরণ করে। আমি ফোন করে জানতে চাই, আমি এসএমএস পাইনি; কিন্তু আপনারা এসএমএসের কথা বলছেন অথচ সফট কপি স্টেটমেন্ট কেন পাঠালেন না। আবার ১ জানুয়ারি কেনইবা আপনারা ফোন করে আমার টাকা পাওনার কথা জানালেন না। গ্রাহক অফিসার বলল যে, এতে নাকি গ্রাহক হিসাবে বিরক্ত হবে। এতে দেখা গেল যে, সামান্য ভুলের জন্য ১০ হাজার ৯৯৯ টাকায় আমার প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা ১৫ দিনে দিতে হচ্ছে। এ তো মহাজনি কারবারের চেয়েও মারাত্মক। আগে ব্যাংকিং সার্ভিসের চার্জগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকে পর্যালোচনা করা হতো। এখন এগুলোর বালাই নেই। কেবল এডহকভিত্তিতে মুদ্রানীতি পরিচালিত হচ্ছে। যেভাবে স্টেটমেন্টসহ বিভিন্ন চার্জ বসাচ্ছে, তাতে বাংলাদেশ ব্যাংক রাবারস্ট্যাম্প হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কারণেই বেসরকারি বিনিয়োগ হ্রাস পাচ্ছে, কর্মসংস্থানের গতি সঞ্চারিত হচ্ছে না। তারা ঋণ খেলাপিদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে। পত্রিকায় রিপোর্টে দেখা গেছে—যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিচ্ছে। আসলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনর্গঠন দরকার।

সরকার সম্প্রতি বিদেশ থেকে পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রার ক্ষেত্রে ২ শতাংশ ইনসেনটিভ ঘোষণা করেছে—এটি একটি ভালো উদ্যোগ। পাশাপাশি ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনায় যারা অর্থ প্রেরণ করছেন, তাদের জন্য বিমার ব্যবস্থা থাকা দরকার। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশস্থ বাংলাদেশের দূতাবাসসমূহ, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের প্রবাসীদের ডাটাবেইজ থাকতে পারে এবং তারা যদি চাকরির কারণে বিদেশি ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা প্রেরণে ব্যর্থ হন, তাহলে দূতাবাসের পক্ষ থেকে তাদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তারা যার বরাবর অর্থ প্রেরণে ইচ্ছুক সেটি যেন ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে প্রেরণের ব্যবস্থার উদ্যোগ নিতে পারে। আবার বিদেশ থেকে প্রেরিত অর্থ যেন বেনিফিশিয়ারির দোরগোড়ায় মানি অর্ডারের মতো ব্যাংকিং কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করতে পারে। দেশের যে ঋণখেলাপি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে সেক্ষেত্রে কেবল বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহই নয় বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা এবং দেখেও না দেখার ভান করা জড়িত রয়েছে। কেবল দৈনন্দিন কাজ করার জন্য কিন্তু বঙ্গবন্ধু কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্থাপন করেননি। এ মুহূর্তে দেশে ৫৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংক রয়েছে, যার মধ্যে কেবল রাকাবের কার্যালয় ঢাকার বাইরে। অন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের প্রধান কার্যালয়ও ঢাকার বাইরে স্থাপন করা গেলে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় এবং সরকারপ্রধান যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চাইছেন তা উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে সাফল্য লাভ করত। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক, একই স্থানে এত বেশিসংখ্যক বাণিজ্যিক ব্যাংক থাকায়, বর্তমান যে কোনো সময়ে ক্রাউডিং আউট এফেক্ট (Crowding out effect) দেখা দিতে পারে। ব্যাংকিং ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, নতুন উদ্যোক্তা তৈরির জন্য সহায়তা না করে বরং প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতি ও উদ্যাক্তাদের নিয়ে টানাটানি করছে। ফলে ননপারফরমিং লোন বাড়ছে। এমনও উদাহরণ আছে ঋণখেলাপির বেড়াজালে জর্জরিত হওয়ার পরও আটটি বোনাস নিয়েছে। সম্প্রতি সেই বেসিক ব্যাংকের বেতন সমন্বয় সাধন করতে গেলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সেটি বন্ধ করার প্রয়াস গ্রহণ করে। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশে সিঙ্গেল ডিজিট না করার জন্য যেভাবে বিভিন্ন ব্যাংক প্রায় দুই বছর ধরে ফন্দিফিকির করছে, তাতে সন্দেহ জাগে, তারা আদৌ পহেলা এপ্রিল সেটি বাস্তবায়ন করবে কি না! দেশের অগ্রযাত্রায় ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা নিয়ামক শক্তি। জনগণ সাধারণত ঐতিহ্যগতভাবে এদেশে বিমা গ্রহণের প্রতি অনুরুক্ত নয়। নিতান্ত না পারতে বিমা গ্রহণ করে থাকে। সরকার এ বছর একটি জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে শস্যবিমা গ্রহণ করতে চাইছেন। আবার গবাদি পশুর ওপর বিমা গ্রহণের ব্যবস্থার উদ্যোগ নিয়েছেন। যদিও অপ্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে গবাদি পশুর বিমা এনজিওরা করে থাকে, তবে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে তেমন নেই। বিদেশে স্বাস্থ্য বিমা অত্যন্ত জনপ্রিয়। কিন্তু আমাদের দেশে খুব বেশি বিমা গ্রহণ ইচ্ছুক ব্যক্তি নেই।

লিজ ফাইন্যান্সিং এবং ভেঞ্চার ক্যাপিটেল জনগণের কাছে তেমন জনপ্রিয় হয়নি। অথচ লিজ ফাইন্যান্সিং এবং ভেঞ্চার ক্যাপিটেলকে সাধারণ মানুষ গ্রহণ করলে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা সহজ হতো। ব্যাংকবহির্ভূত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে আরো শক্তিশালী করা দরকার, যাতে তারা দেশে বিনিয়োগ উপযোগী পরিবেশকে সমৃদ্ধ করতে পারে। মূলত বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় সামাজিক কল্যাণ সাপেক্ষে কাজ করা গেলে যে সমস্ত সমস্যা রয়েছে সেগুলো দূরীভূত হবে এবং রাষ্ট্রের উন্নয়নে কাজ করতে সক্ষম হবে। সরকার বিদ্যুত্ থেকে আরম্ভ করে কৃষি-শিল্প বিকাশে যথেষ্ট চেষ্টা করছেন। সরকারের এ কর্মকাণ্ডে সমার্থক ভূমিকা পালন করতে হলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে একটি বিশেষ শ্রেণির প্রতি তাদের চিরায়ত আনুগত্য পরিত্যাগ করে সরকার প্রধানের দেখানো পথে অগ্রসর হতে হবে। পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থায় যারা আছেন তাদেরকে অবশ্যই পুঁজি বাজারের সমস্যা দূরীভূত করার কাজে নিয়োজিত হওয়া উচিত ছিল। আবার ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেও মুদ্রা সরবরাহ সঞ্চয়-বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা, গ্রাহকসেবার মান উন্নতকরণ এবং দেশের অগ্রযাত্রায় সরকারের গতিশীল পথকে শক্তিশালী করতে হবে।  সরকারপ্রধান ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এটিকে সাফল্য লাভ করতে হলে সামাজিক নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে সামাজিক ব্যাংকিং ভিন্ন মাত্রায় ভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার অধীনে স্বল্প খরচে অথচ কোনো লুক্কায়িত খরচ যাতে না থাকে নিশ্চিতকরত চালু করা দরকার। সরকার দেশে যে সেফটি নেটওয়ার্ক চালু করেছেন সেটি একটি ভালো উদ্যোগ। দেশে কিছু ঋণখেলাপির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দরকার। পাশাপাশি প্রাজ্ঞ অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে আর্থিক খাতের উন্নয়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করে, কমিটির সুপারিশমালার আলোকে আর্থিক খাতকে সুসংহতকরণ করা দরকার। এদেশে আর্থিক মুক্তির প্রয়াস সফল হোক।

n লেখক : ম্যাক্রো ও ফিন্যান্সিয়াল ইকোনমিস্ট ও প্রফেসর

ইমেইল :[email protected]