ভূমিদখল ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের সমস্যা

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:২৫

বর্তমানে বাংলাদেশে ভূমিদখল ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হইয়াছে। দখল হইতেছে সরকারি জমি, খাস বা ওয়াক্ফ জমি, ক্ষমতাহীন ব্যক্তির জমি। সর্বগ্রাসী এই দখলদারি হইতে বাদ যাইতেছে না নদনদী, খাল-বিলও। দখল হইতেছে সড়ক-মহাসড়কের দুই পাশের ফাঁকা জায়গা, গড়িয়া উঠিতেছে অবৈধভাবে দোকানপাট, কারখানা, বিপণিবিতান। শহর-উপশহরের ফুটপাত তো বটেই, বাজার এলাকায়ও খাসজমিতে অবৈধভাবে গড়িয়া তোলা হইতেছে দোকানপাট, এমনকি পাকা মার্কেট। এই সকল অবৈধ স্থাপনার খবর পাইয়া প্রশাসন মাঝেমধ্যেই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করিয়া থাকে। কোনো কোনো জায়গায় অভিযান বাধার সম্মুখীন হয় স্থানীয় ক্ষমতাসীনদের দ্বারা। কোথাও সৃষ্টি হয় আইনি জটিলতাও। স্থাপনা নির্মাণকারী ব্যক্তি হয়তো আদালতে মামলা ঠুকিয়া দেন। অভিযান পরিচালনায় আসে স্থগিতাদেশ বা অভিযোগ নাকচ করিয়া রায় আসে অভিযানের পক্ষে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, উচ্ছেদের পর একটি সময় পুনরায় স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। অর্থাত্ উচ্ছেদ স্থায়ী হয় না, উচ্ছেদকাজে ধারাবাহিকতা থাকে না। এই ক্ষেত্রে প্রভাব রাখে স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামো। অনেক ক্ষেত্রে ভূমি দখল ও অবকাঠামো নির্মাণ হয় স্থানীয় ক্ষমতাসীন মহল ও প্রশাসনের যোগসাজশে। এই দুষ্টচক্র ভাঙিতে না পারিলে ভূমিদখল বন্ধ করা যাইবে না। আবার দেখা যায়, কোনো একটি স্থান দখল করিয়া সেখানে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক সংগঠনের অফিস বা কার্যালয় গড়িয়া তোলা হয়। পরবর্তীকালে সেই অফিস উঠিয়া গেলেও জমি থাকিয়া যায় ঐ প্রভাবশালীর দখলকৃত হইয়া। অন্যদিকে যেই প্রক্রিয়ায় লিজ দেওয়া হয় তাহাতে অনেক ক্ষেত্রে লিজ গ্রহণকারীও ক্ষতিগ্রস্ত হইয়া থাকেন। সরকার যে কোনো জমি অধিগ্রহণ করিতে পারে। যে কোনো লিজের জমির লিজও তুলিয়া লইতে পারে। তখন দেখা যায় লিজগ্রহীতার স্থাপনা ব্যয় পানিতে গিয়াছে। 

সারাদেশে বিপুল পরিমাণ সরকারি জমি দখল হইয়া আছে। এক হিসাবে, রেলওয়ের প্রায় ৯ হাজার একর জমি বেদখলকৃত। ইহার মধ্যে অনেক স্থানে পাকা স্থাপনা নির্মাণও করা হইয়াছে। আবার কেহ কেহ দখলকৃত জায়গা অন্যের কাছে বিক্রয় বা অর্থের বিনিময়ে হাতবদলও করিয়াছেন। এই সকল দখলকৃত জমি উদ্ধারে সরকারি তত্পরতা নিশ্চিতভাবেই বাড়াইতে হইবে। সম্প্রতি ঢাকার আশপাশের নদীগুলি দখলমুক্তকরণে অভিযান চালানো হইয়াছে। ইহা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এই ধরনের অভিযান সারাদেশে পরিচালনা করিতে হইবে। যেই সকল অসত্ কর্মকর্তা-কর্মচারী এই দখলদারির সহিত জড়িত তাহাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। পাশাপাশি আমরা আশা করি, ভূমি অফিসগুলি শীঘ্রই পূর্ণাঙ্গরূপে ডিজিটালাইজ হইবে। তাহা হইলে এই সংক্রান্ত সমস্যা অনেকাংশে কমিয়া আসিবে। বিদ্যমান ভূমি ও স্থাপনা দখল পুনরুদ্ধার আইন, ১৯৭০ সালে প্রণয়ন করা হইয়াছিল। ইহার অনেক ধারা বর্তমানে আর প্রয়োগযোগ্য নহে। ইহা সংশোধনে সম্প্রতি সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছে। আইনটি অতি সত্বর যুগোপযোগী করিয়া কার্যকর করিতে হইবে। আমরা আশা করি, নূতন আইনটি কার্যকর ও যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হইলে দেশে ভূমিদখল ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের প্রবণতা অনেকাংশেই হ্রাস পাইবে। সার্বিকভাবে সরকারের উদ্যোগ ও উচ্ছেদে ধারাবাহিকতার পাশাপাশি জনগণের সচেতনতা ও নজরদারিই পারে ভূমিদখল ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ করিতে।