বর্তমান সময়ে যতগুলো সামাজিক ব্যাধি রয়েছে তার মধ্যে বাল্যবিবাহ অন্যতম। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী আঠারো বছরের নিচে সবাই শিশু আর এই আঠারো বছরের নিচে যদি কারো বিয়ে দেয়া হয় তবে সেটা বাল্যবিবাহ বলে গণ্য হবে। তবে ছেলে শিশুর বেলায় সেটা ২১ বছর পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। ১৮ বছরের নিচে কোনো মেয়েকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে দেয়া আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। চিন্তার বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশে একশ’ ভাগ নারীর মধ্যে ষাট ভাগ নারীই বাল্যবিবাহের স্বীকার হচ্ছে। বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জরিপের উপর ভিত্তি করে জানতে পাই গ্রামাঞ্চলের বেশিরভাগ মেয়েই বাল্যবিবাহের শিকার হয়। কারণ এখনো গ্রামাঞ্চলের অনেক স্থানেই পৌঁছায়নি সুশিক্ষা। অশিক্ষিত জনগোষ্ঠির কাছে এখনো বোঝা হিসাবেই গণ্য নারী। এদের বাল্যবিবাহের কুফল সম্বন্ধে কোনো ধারণাই নেই। প্রতিবেশীরা মেয়ে বড় হলে যেন বেশি চিন্তায় ভোগেন অনেকটা এমন যে ‘মায়ের চেয়ে মাসীর দরদ বেশি’। মেয়ে বড় হলে বিয়ে না দিলে কটুকথা বলেন। এছাড়া ঘটকরা তো আছেনই। নানা প্রলোভন দেখান মেয়ের বাবা-মাকে। অশিক্ষিত পরিবারের বাবা-মা লোভের বশবর্তী হয়ে ১৮ বছরের নিচে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেন। শিক্ষা ছাড়া্ও আরেকটি বিষয় বাল্যবিবাহকে বেশ উত্সাহিত করে তা হলো দরিদ্রতা। দরিদ্রতার কারণে পিতামাতা মেয়ের লেখাপড়াসহ যাবতীয় মৌলিক চাহিদা মেটাতে না পেরে বাল্যবিবাহের পথে হাঁটেন। অসময়ে বিয়ে দিয়ে দেন। আবার এর সঙ্গে ইভটিজিংও জড়িত। এর কারণে মেয়েদের অধিকার স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। তাদের প্রাপ্য অধিকার এবং স্বাভাবিক জীবন-যাপন ব্যাহত হয় চরমভাবে। ফলে পরিবার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে বাল্যবিবাহ দিতে বাধ্য হয়। অনেক অভিভাবক নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে লেখাপড়া বন্ধ করে দেয় এবং কম বয়সে বিয়ে দিতে উঠেপড়ে লাগে। বাল্যবিবাহ মেয়েদের জীবনে চরম অভিশাপ ডেকে আনে। একটি মেয়ের শৈশব-কৈশর কাটে খেলাধুলার মধ্যদিয়ে, ঠিক সেই মেয়েটিকে বিয়ে দিলে সে সংসারের হাল কী করে ধরবে। তার স্বামী,সংসার সম্বন্ধে কোনো ধারণা থাকে না। তাই সে স্বামীর বাড়িতেও নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে না। স্বামীর বাড়িতে পূর্ণ স্বাধীনতা থাকে না। যার ফলে অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েরা স্বামীর বাড়িতে পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে চায়। বিভিন্ন কাজে ছেলেমানুষী করে। ফলে তার স্বামীর সঙ্গে মনোমালিন্যের মত ঘটনা ঘটে। একটি মেয়ে ছোটবেলা থেকেই অনেক বড় স্বপ্ন নিয়ে বড় হয়। তার স্বপ্ন থাকে সে লেখাপড়া করে অনেক বড় কিছু হবে কিন্তু তার সঙ্গে বাল্যবিবাহ সংঘটিত হলে সে তার স্বপ্ন থেকে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না। কারণ বেশির ভাগ স্বামীর বাড়ি থেকেই লেখাপড়ার সুযোগ দেওয়া হয় না। অন্যদিকে কম শিক্ষিত বলে তাকে স্বামীর বাড়িতে মাথা নিচু করে বাঁচতে হয়। আঠারো বছরের নিচে মেয়েকে বিয়ে দিলে সে নানা শারীরিক সমস্যায় ভোগে। অনেকে আত্মহত্যাও করে। সব কথা বিবেচনা করে চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যায় একটি নিষ্পাপ মেয়ের জীবনে ধ্বংসরূপ আসে বাল্যবিবাহের হাত ধরে। দিনদিনই এটি ভয়াবহ সমস্যায় রূপান্তর হচ্ছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ নারীই কোনো না কোনো কারণে বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছেন। পৃথিবীর জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। মানবসভ্যতা বিকাশে নারী-পুরুষের অবদান প্রায় সমান। কিন্তু অধিকাংশ নারীই যদি বাল্যবিবাহের শিকার হয় তাহলে তারা শিক্ষিত হ্ওয়ার সুযোগ পাবে না। ফলে দেশের উন্নয়ন সম্ভব হবে না। তাই দেশের উন্নয়ন, সুন্দর মানুষ ্ও সুন্দর সমাজ গঠনের জন্য সম্মিলিতভাবে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তবেই একটি স্বপ্নের মৃত্যুকে বাঁচানো সম্ভব হবে।
n লেখক : শিক্ষার্থী, কড়ৈতলী উচ্চ বিদ্যালয়, চাঁদপুর
