থেমে গেছে অবৈধ কেমিক্যাল গোডাউন উচ্ছেদ অভিযান

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০৬:২৭

পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের এক বছর পরও এ ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। আগুনে নিহত ৭১ নারী-পুরুষের পরিবার কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি। পরিবারগুলো তাদের দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে নিদারুণভাবে দিন কাটাচ্ছে। ঐ ঘটনায় নিহত ৬৭ জনের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট তৈরি গতকাল বুধবার শেষ হয়েছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগ ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পুলিশের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে। নিহতের মধ্যে এখনো তিন জনের লাশ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এই তিন জনের লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মরচুয়ারিতে রাখা আছে।

এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত চলছে একেবারে ঢিমেতালে। ঘটনার পর পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যাল গোডাউন উচ্ছেদ করতে টাস্কফোর্স গঠন করে অভিযান চালানো হয়। মাত্র ৩৩ দিন অভিযান পরিচালনা করে ১৭০টি কেমিক্যাল গোডাউন সিলগালা করা হয়। এরপর অদৃশ্য কারণে সেই অভিযান থেমে যায়। এখনো পুরান ঢাকায় দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্সপ্রাপ্ত আড়াই হাজার কেমিক্যাল গোডাউনের মধ্যে লাখ লাখ মানুষ ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। যে কোনো সময় চূড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির মতো আরো একটি ট্র্যাজেডি ঘটে যেতে পারে।

গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে চুড়িহাট্টার ৬৪, নন্দকুমার দত্ত রোডের ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলার কেমিক্যাল গোডাউনের বিস্ফোরণ থেকে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে ৬৭ জন নিহত ও ২০ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে পরবর্তী সময়ে চার জন মারা যান। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার দুই দিন পর স্থানীয় বাসিন্দা আসিফ বাদী হয়ে চকবাজার থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় একই উদ্দেশ্যে অবহেলাপূর্বক অগ্নিসংযোগের কারণে মৃত্যু ঘটানোসহ ক্ষতিসাধনের অপরাধে পেনাল কোডের ৩০৪(ক)/৪৩৬/৪২৭/৩৪ ধারা উল্লেখ করা হয়। মামলার বাদী আসিফের বাবা জুম্মন অগ্নিকাণ্ডে নিহত হন। মামলায় মৃত হাজি ওয়াহেদের দুই ছেলে মো. হাসান ও সোহেল ওরফে শহীদসহ অজ্ঞাত ১২ জনকে আসামি করা হয়।

অগ্নিকাণ্ডের উত্সস্থল সেই কেমিক্যাল গোডাউনের মালিককে পুলিশ এখনো শনাক্ত করতে পারেনি। পুলিশ বলছে, গোডাউনটির মালিক জনৈক ইমতিয়াজ আহমেদ। কিন্তু নাম ছাড়া তেমন কোনো তথ্য সংগ্রহ করতে পারেনি। ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলায় বিস্ফোরিত হওয়া কেমিক্যাল গোডাউনে পড়ে থাকা বডি স্প্রের ক্যানে লেখা ছিল ‘পার্ল ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’। এই পার্ল ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ভারত, দুবাই, তুরস্ক, ফ্রান্স ও জার্মানি থেকে পারফিউম ও বডি স্প্রে আমদানি করে। ঠিকানা রয়েছে, ৬৪ নন্দ কুমার দত্ত রোড, চকবাজার। এটিই মূলত ওয়াহেদ ম্যানশন। হাতিরপুলে একটি ভবনে পার্ল ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের অফিস ছিল। অগ্নিকাণ্ডের পর ঐ অফিসের সাইনবোর্ড, অফিসের কাগজপত্র ও মালামাল উধাও হয়ে যায়।

পার্ল ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের আমদানি করা প্রসাধনীতে মিলেছে বিএসটিআইয়ের অনুমোদিত স্টিকার। পুলিশ বিএসটিআইয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, সেখানকার আবেদনপত্রে ঠিকানা দেওয়া আছে ৬৬ মৌলভীবাজার, চকবাজার, ঢাকা। কিন্তু এই ঠিকানায় পুলিশ পার্ল ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পায়নি। পুলিশ বলছে, ইমতিয়াজ আহমেদ পার্ল ট্রেডের পরিচালক। এর মালিকের নাম খুব সম্ভবত আবুল কাশিফ। গত এক বছর ধরে পুলিশের খাতায় ইমতিয়াজ ও আবুল কাশিফ পলাতক রয়েছেন। জাতীয় পরিচয়পত্রের সার্ভার থেকে তাদের নাম-পরিচয় পুলিশ বের করতে পারেনি।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চকবাজার থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কবীর হোসেন বলেন, চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৬৭ জন মৃত ব্যক্তির ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন গতকাল বুধবার পর্যন্ত পুলিশের কাছে পৌঁছায়নি। এ ঘটনায় হাজি ওয়াহেদ ম্যানশনের মালিকের দুই ছেলে হাসান ও সোহেলকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তারা আদালতের নির্দেশে জামিনে রয়েছেন। তবে মামলার অপর আসামিদের কোনো ঠিকানা পাওয়া যায়নি।

আদালত সূত্র জানায়, তদন্ত প্রতিবেদন জমার জন্য ৯টি তারিখ পার হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি তারিখ ধার্য রয়েছে। মামলার বাদীও অভিযোগ করেছেন, তাকে মামলার তদন্তের অগ্রগতি জানানো হয় না। ঐ ঘটনার পর থেকে সরকারের পক্ষ থেকে তিনি এখনো কোনো ক্ষতিপুরুণ পাননি।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, আগুনের ঘটনায় নিহত ৬৭ জনের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে। ঘটনার সময় ৪৫ জনের লাশ তাদের পরিবার শনাক্ত করে নিয়ে যায়। ১৯ জনের লাশ ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে হস্তান্তর করা হয়। এখন তিন জনের লাশ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এই তিন জনের লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মরচুয়ারিতে রাখা আছে।

কেমিক্যাল গোডাউনের সেই ওয়াহেদ ম্যানশন ভবনে এখন আর কেউ থাকে না। কিছু রাখাও হয় না। অগ্নিকাণ্ডের পর ওয়াহেদ ম্যানশন ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হলেও নিচতলার মার্কেটের দোকানগুলোতে গত কয়েক মাস আগে সংস্কার করা হয়েছে। পোড়া ইট সরিয়ে নতুন ইটের গাঁথুনি দেওয়া হয়েছে।

থেমে গেছে অভিযান : ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ঢাকঢোল পিটিয়ে কেমিক্যাল গোডাউন সরানোর অভিযান চালায়। পাঁচটি টিমের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ টাস্কফোর্স অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন কেমিক্যাল গোডাউন সিলগালা করে। কেমিক্যাল গোডাউনগুলোর বাড়ির বিদ্যুত্, গ্যাস ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। এভাবে চলতে চলতে অভিযানটি একপর্যায়ে গোডাউন মালিকদের বাধার সম্মুখীন হয়। এরপর থেকে এই অভিযান ঝিমিয়ে পড়ে। গত বছরের ২৮ ফেব্রয়ারি থেকে চলা এই অভিযান ঐ বছরের ১ এপ্রিল থেকে বন্ধ করে দেয়। এই অবস্থায় আগের চেহারায় ফিরে গেছে পুরান ঢাকা। এখন সেখানে কেমিক্যাল গোডাউনে আগের মতো বেচাকেনা চলছে। ৩৩ দিন টাস্কফোর্স অভিযান চালিয়ে ১৭০টি কেমিক্যাল গোডাউন সিলগালা করে। আবাসিক এলাকায় এসব কেমিক্যাল গোডাউনের কয়েকটি থেকে মালামাল সরিয়ে নেওয়া হয়। বাকিগুলো আগের অবস্থায় রয়েছে। পুরান ঢাকায় দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্সপ্রাপ্ত আড়াই হাজার কেমিক্যাল গোডাউন রয়েছে। এর বাইরে আরো ১০ হাজার কেমিক্যাল গোডাউন রয়েছে, যার কোনো লাইসেন্স নেই। সব মিলিয়ে এখনো পুরান ঢাকায় লাখ লাখ মানুষকে রাসায়নিক গোডাউনের মধ্যে বসবাস করতে হচ্ছে।

ইত্তেফাক/বিএএফ