একুশে ফেব্রুয়ারি মানুষের হূদয়ের ভালোবাসার ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় শহিদ মিনারের পুরো বেদিটা। নানা রঙের ফুলের শ্রদ্ধাঞ্জলিতে বেদির বুকে আঁকা হয় বাংলাদেশের মানচিত্র। মানচিত্র ঘিরে থাকে ফুলের আল্পনা। ফাল্গুনে যত রঙের ফুল ফোটে, বাংলাদেশের মানুষ একুশের জন্য সব এনে ঢেলে দিতে চায় শহিদ মিনারের বেদিতে। ভাষার জন্য লড়াই করে প্রাণ বিসর্জন দেওয়া বাঙালির যে কত বড়ো ত্যাগ, এ যে কত বড়ো সাংস্কৃতিক চেতনার ঐশ্বর্য, তা দেখে পৃথিবীর যে কোনো স্থানে বসবাসকারী বাঙালি অহংকার বোধ করে থাকে। বিশ্ববাসী অবাক হয়ে বাঙালির এই প্রত্যয় দেখে, ছোটো দেশটার মানুষের সাহস দেখে। দেশটার মানুষের মাতৃভাষার প্রতি ভক্তি দেখে।
আমি ১৯৫২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি আমার স্কুল ঢাকার অভয় দাস লেনের কামরুন্নেসা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ছাত্রীদের মিছিলে অংশগ্রহণ করেছিলাম। ছোটোখাটো ছিলাম বলে মিছিলের সামনের দিকেই ছিলাম। অভয় দাস লেন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলা পর্যন্ত ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগানে মুখরিত ছিল আমাদের মিছিলটি। পথের দুই ধারের মানুষ করতালি দিয়ে উত্সাহিত করছিল আমাদের, সঙ্গে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করছিল বাতাস, একাত্মতা ঘোষণা করছিল ছাত্রীদের প্রতিবাদের সঙ্গে। সে এক অবিশ্বাস্য চেতনার উন্মেষ ঘটানোর স্মৃতি। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের সংস্কৃতমনা করে গড়ে তোলার জন্য একটি দিকনির্দেশনা। কিশোর বয়সে আমরা এই মহান আন্দোলনে শরিক হতে পেরেছি, যা সারা জীবনের জন্য গর্ব হয়ে আছে। একুশ আমাদের জন্য অনেক কিছু। একুশ যেন আমার চেতনায় উন্মেষ ঘটানোর একটি রবির কিরণ। আমার একান্ত বিশ্বাস, একুশ মানুষের সাংস্কৃতিক চেতনাকে সমৃদ্ধ করে। ফুলে ফুলে ঢাকার শহিদ মিনারটি ও একুশে যেন মানুষের ভালোবাসা পেয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে। শহিদ মিনারের একুশের ফুলগুলো নিয়ে আমার রাজ্যের ভাবনা। আমার স্বামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করার সুবাদে দীর্ঘ সময় ফুলার রোডে থাকার সুযোগ হয় আমার, সেই সময় খুব কাছ থেকে দেখেছি একুশের পর পবিত্র ফুলগুলোর কী অসহায় আর করুণ অবস্থা। কৈশোরে নগ্ন পায়ে প্রভাতফেরিতে শহিদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করেছি পাড়ার বড়ো ভাই-বোনদের সঙ্গে। সবার হাতে থাকত বাগান থেকে সংগ্রহ করা দু-তিনটি ফুল। বেশ কয়েক বছর ধরে একুশের ফুলগুলো নিয়ে আমি স্বপ্ন দেখি। নানা স্বপ্ন আমার ভাবনা ঘিরে থাকে।
একুশের সারা দিন সারা রাত আনসার, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাডেট দল, স্কাউট, পুলিশ শহিদ মিনারকে পাহারা দেবে। কেউ যেন ফুল নিয়ে কাড়াকাড়ি না করে। একুশে মানুষের ভালোবাসা যেমন ছিল, তেমনি থাকবে অন্তত ২২শের দুপুর পর্যন্ত। পাহারাটা দেবে এমনভাবে—১২টা থেকে ৬টা, ৬টা থেকে ১২টা, আবার ১২টা থেকে ৬টা—এমনি করে শেষ হবে একুশের দিনটা। ২২শে ফেব্রুয়ারি থাকবে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের ফুলগুলোকে বিদায় জানানোর পালা। সকাল ৯টা থেকে শহিদ মিনার থেকে রমনা সবুজ উদ্যান পর্যন্ত পথের দুই ধারে নীরবে মানববন্ধন করে দাঁড়াবে ছাত্রছাত্রী ও জনতা। ২২শে ফেব্রুয়ারি ভোরে পাশের রমনা সবুজ চত্বরে লম্বা করে তিন থেকে পাঁচটি (ফুলের পরিমাণের ওপর) ট্রেঞ্চ কাটা হবে। একুশের ফুলের সমাধি হবে সেখানে। সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে উপাচার্য তার দল নিয়ে উপস্থিত থাকবেন। ধীরে ধীরে তিন-চারটা ট্রাক আসবে। ট্রাকে থাকবে স্ট্রেচার। স্ট্রেচারে করে ফুলগুলো ট্রাকে তোলা হবে। উপাচার্য ও তার সঙ্গীরা, সঙ্গে থাকবে আনসার, ক্যাডেট, স্কাউট, পুলিশ সদস্য। ফুলগুলোকে স্যালুট করে দাঁড়িয়ে থাকবেন ততক্ষণ, যতক্ষণ না ধীরে ধীরে ট্রাক তিনটি এগোবে রমনার সবুজ পার্কের দিকে। রমনা পার্কে নগরপ্রধান সুশৃঙ্খল একটি দল নিয়ে দাঁড়াবেন স্যালুট দিয়ে। স্ট্রেচারে করে ফুলগুলো ঢেলে দেওয়া হবে ট্রেঞ্চে। ট্রেঞ্চ কয়টি ফুলে ফুলে ভরে গেলে মাটিচাপা দেওয়া হবে। বিউগলের অন্তিম সুর বাজানো হবে। সেই সঙ্গে শেষ হবে একুশের শ্রদ্ধাঞ্জলির পুরো আনুষ্ঠানিকতা। এ দৃশ্য দেখবে ছাত্র-জনতা নীরবে আর সুশৃঙ্খলভাবে। একদিন পর্যটকদের কাছেও এই বার্তা চলে যাবে। তারাও জানবে একুশের কথা। মানুষের অন্তরে সাংস্কৃতিক চেতনা জাগরুক করার একটি নক্ষত্র হয়ে জ্বলতে থাকবে এই পর্ব।
আমি এই স্বপ্নই দেখি একুশের পুষ্পাঞ্জলি নিয়ে। সবার হাতে যেন অন্তত একটি ফুল থাকে। হুড়াহুড়া ধাক্কাধাক্কি করে নয়, অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে নীরবতা রক্ষা করে যেন পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করা হয়; যে একুশ আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনাকে সমৃদ্ধ করে তার জন্য। আবার আরেকটি একুশের জন্য অপেক্ষা করব। ততদিনে নতুন ঘাসে ছেয়ে যাবে রমনার সবুজ চত্বরের ফুলের সমাধিগুলো। ফুলগুলো মাটিতে মিশে যাবে ছয় ঋতুর আবর্তনে। একুশের ফুলকে এইভাবে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য কোনো জমি বন্দোবস্ত বা একোয়ার করা লাগবে না। শুধু চাই একটু মানসিকতা। একুশের ফুল নিয়ে খোকা-খুকুরা ছড়া বানাবে, কবিতা লিখবে, রচনা লিখবে। ফুলগুলো মানুষের হূদয়ে ভক্তি-শ্রদ্ধা-ভালোবাসা জাগানোর প্রতীক হয়ে থাকবে। এ আমার স্বপ্ন, এ আমার ভাবনা। তারপর অপেক্ষায় থাকব আরেক ফাল্গুনের জন্য, আরেক একুশের জন্য।
n লেখক :১৯৫২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারির মিছিলের একজন
