মেলায় এতো খেলা!

আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৮:২১

রম্য গল্প

/ অয়েজুল হক

 

বইমেলা শুরু হয় বিকেল তিনটায়। কিন্তু কবি মারুফ একটার আগেই মেলার মাঠে উপস্থিত হয়ে যান। শুধু উপস্থিত থাকার ভেতরেই তিনি সীমাবদ্ধ নন। সম্ভব হলে মেলার ভেতর টেস্ট, ওয়ানডে, টি-টুয়েন্টি, ফুটবল, ক্রিকেট, হকি সব শুরু করে দেন। আপাতত প্রস্তুতি পর্বের অনুশীলন হিসেবে দৌড়ঝাঁপ চলছে। একটা বাজতেই দোয়েল চত্বর থেকে শুরু করে বাংলা একাডেমি। বাংলা একাডেমি থেকে রাস্তার এপাশের বইমেলা—সব মিলিয়ে বিরাট একটা এলাকা নিয়ে সৌরজগতের গ্রহ-নক্ষত্রের মতো চক্কর দিতে থাকেন। দশ মিনিট পর পর ফেসবুকে স্ট্যাটাস—আমি আছি এখানে, আমি আছি সেখানে, আমি আছি ওখানে। কেউ তার পোস্টে বিরক্ত হোক, অস্বস্তি বোধ করুক তাতে মারুফের কিচ্ছু যায় আসে না। আজ হঠাত্ করে তাকে বহুকাল আগের এক বন্ধু কল দেয়। লেখক বন্ধু হাসান। তিনি বলেন, ‘আপনি এখানে, ওখানে, সেখানে করেন কী?’

কবিদের নির্বিকার হতে হয়। কবি মারুফও নির্বিকার ভাবে জবাব দেয়, ‘ঘুরি’।

—মেলা তিনটায়, আপনি একটা থেকে ঘোরেন কেন?

—পৃথিবী, চন্দ্র, সূর্য সব ঘুরছে। আমি ঘুরব না?

—সাগর তো প্রতিনিয়ত ঢেউ নিয়ে তীরে আছড়ে পড়ে, তাই বলে আপনিও আছড়ে পড়বেন?

কবি মারুফ বিজয়ীর হাসি দিয়ে বলেন, ‘পড়ি তো। মেলা শুরু হতেই স্টলে আছড়ে পড়ি। পাঠকের ঘাড়ের ওপর পড়ি...।’

ওপাশ থেকে হাসান সাহেব লাইন কেটে দেন। সেদিনই ঘটতে থাকে বিপত্তি। তিনটার দিকে বই বিজ্ঞাপনের কিছু হ্যান্ডবিল নিয়ে গেটে দাঁড়িয়ে যান। আগন্তুক একজোড়া ছেলে-মেয়েকে দেখেই কাগজটা বাড়িয়ে দেন।

মেয়েটা কাগজ নিয়ে দলা পাকিয়ে কবি মারুফের মুখের ওপর ছুঁড়ে মেরে হনহন করে হেঁটে যায়। এ ধরনের বখাটে ছেলে-মেয়েদের উচিত শিক্ষা হলো, দাবড়িয়ে ধরে মুখ লাল করা থাপ্পড় দেওয়া। কবি হিসাবে কাজটা শোভনীয় নয় বলে নিজেকে গুটিয়ে নেন।

মনোক্ষুণ্ন হয়ে স্টলে এসে চুপ করে বসে পড়েন। এক যুবক কুড়ি মিনিট ধরে বই হাতড়াচ্ছে। বই যেন বাইন মাছ। সে ধরছে আর বাইন মাছের মতো হাত ফসকে বেরিয়ে যাচ্ছে। কবি দাঁড়িয়ে বলেন, ‘এটা নেন, ভালো বই।’

যুবক লাল চোখে তাকিয়ে বলে, ‘এটা মেলা না খেলা? যে স্টলে যাই কেউ একজন বলে এটা ভালো, এটা ভালো! কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ সেটা সবার কাছ থেকে শিখতে হবে?’

—শেখার কোনো শেষ নেই...।

মুখের কথা কেড়ে নিয়ে যুবক বলে, ‘হ্যাঁ, তাই তো দেখছি শেখার কোনো শেষ নেই। স্টলে স্টলে দাঁড়িয়ে ক্লাস নিচ্ছেন শিক্ষক।

এর সাথে আর কথা বলে লাভ নেই। বেশি বোঝা পাবলিক। একটু পরেই আরেকজন এসে বলে, ‘ভাই বউমেলা কোনদিকে’। কবি সাহেব রাগান্বিতস্বরে বলেন, ‘বউমেলা...। ইয়ার্কি করেন?’

—সরি ভাই, কোথায় যেন মৌমেলা হচ্ছে দেখলাম।

—শুনেন, বইমেলা তার জায়গায়, মৌমেলা সেটাও তার জায়গায়।

—ভাই, আর বউমেলাটা কোন জায়গায়?

লোকটার বিয়ে খুব জরুরি বোঝা যাচ্ছে। তাকে একটা বিরহ-ব্যথার বই দেওয়া যায়। কবি তার হাতে কবিতার বই— ‘ফিরে আসো বউ’ গুঁজে দিয়ে বলেন, ‘ভালো বই। পড়ে মজা পাবেন।’

লোকটা সানন্দে বইটা হাতে নিয়ে বলেন, ‘অটোগ্রাফ প্লিজ’।

কবি মারুফ অটোগ্রাফ দিচ্ছেন, সে সময় তিন-চারজনের একটা টিম তাকে ঘিরে ধরে। কী আনন্দ, আকাশে বাতাসে! ভক্তরা জড়ো হয়ে গেছে।

প্রধান ভক্ত বলেন, ‘আপনি কি অটোগ্রাফ দিচ্ছেন?’

—বলেন কি! অটোগ্রাফ, ফটোগ্রাফ সব দিচ্ছি। আপনার কোনটা লাগবে?

—আমি টিভি সাংবাদিক।

টিভি সাংবাদিক শুনেই কবি মারুফের মুখ শুকিয়ে আসে। আগুনের সংস্পর্শে যেমন পলিথিন কুঁচকে যায়, কবিও তেমন কুঁচকে ছোট হয়ে যান।

অল্প সময়ের মধ্যে কবি তার বই নিয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে।

—আচ্ছা, এটা আপনার কবিতার বই?

—জি।

—প্রিয় দর্শক, আপনারা দেখছেন কবি মারুফকে। তিনি লিখেছেন, ‘ফিরে আসো বউ’। আচ্ছা বউ কোথায় ফিরে আসবে?

—দেখুন, কবিতা মানে কিন্তু খেলা। বিয়ে করিনি বউ ফিরে আসবে কীভাবে?

—যা হোক, দর্শক—কবি বিষয়বস্তু এড়িয়ে গেছেন। আচ্ছা মেলা কেমন লাগছে?

—মেলা আসলে খেলা। খেলার মতো লাগছে।

—মেলা খেলা মানে!

কবি মারুফ ‘তো... তো’ শুরু করেন। ভয়ে শরীর কাঁপছে তার। কম্পিত গলায় বলেন, ‘দেখুন, জীবনটাই একটা খেলা।’

—দর্শক, কবি কথায় কথায় কিন্তু খেলার কথা বলছেন। কবিতা মানে খেলা, জীবন মানে খেলা। মেলা সেটাও এই কবি মারুফের কাছে খেলার মতো। ধন্যবাদ সবাইকে।    g