ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ১১ জন ছাত্র ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম কালো পতাকা উত্তোলন করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ভাষা সৈনিক মোহাম্মদ সুলতান। মহান ভাষা আন্দোলনে জীবন বাজি রেখে আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন জেলে গেছেন একাধিকবার। পাঠ্যপুস্তকে তার কথা স্থান পায়নি, এমনকি পালিত হয় না তার জন্ম বা মৃত্যুবার্ষিকীও।
বাবা-মায়ের ৮ সন্তানের মধ্যে পঞ্চম মোহাম্মদ সুলতান জন্ম নিয়েছিলেন ১৯২৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর পঞ্চগড় জেলার (তত্কালীন দিনাজপুর জেলা) বোদা উপজেলার মাঝগ্রামে। ব্রিটিশ আমলের পুলিশ বিভাগের ঝানু অফিসার ডেপুটি সুপারিন্টেন্ডেন্ট অব পুলিশ পিতা মরহুম মোহাম্মদ শমসের আলী সাহেব ছিলেন কর্তব্যপরায়ণ এবং স্বাধীনচেতা। মোহাম্মদ সুলতান যশোর জেলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা, রাজশাহী সরকারি কলেজে স্নাতক ডিগ্রি, তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতোকত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ যখন ১৪৪ ধারা ভাঙতে অস্বীকৃতি জানান তখন মোহাম্মদ সুলতানসহ ১১ জন ছাত্র ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেন। তিনিই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। ১৯৮৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করিডোরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
২০০৭ সালে কয়েকজন ভাষা সৈনিকের নামে ধানমন্ডির কয়েকটি সড়কের নামকরণ হয়। ধানমন্ডি ৩ নম্বর সড়কটি এখন ভাষা সৈনিক মোহাম্মদ সুলতান সড়ক নামে পরিচিত। নতুন প্রজন্মের মানুষ যখন এই সড়ক অতিক্রম করবে তখন কৌতুহলবশত যদি এই ভাষা সৈনিক সর্ম্পকে জানতে উত্সাহী হয় তাহলে কোথায় খুঁজে পাবে তার জীবনী?
বর্তমান প্রজন্মের কাছে ভাষা সৈনিক মোহাম্মদ সুলতানের ইতিহাস, কর্মময় জীবন ও ভাষা আন্দোলনসহ বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে অর্ন্তভুক্ত করা ও মরণোত্তর একুশে পদকসহ স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছেন মোহাম্মদ সুলতানের পরিবারের সদস্যরা।
২০১৩ সালে পঞ্চগড় জেলা প্রশাসন কৃতিসন্তান মোহাম্মদ সুলতানকে মরণোত্তর সম্মাননা প্রদান করে। তত্কালীন জেলা প্রশাসক বনমালী ভৌমিক সম্মাননা স্মারক তুলে দেন তার দুই মেয়ে সুম্মিতা সুলতানা ও চন্দনা সুলতানার হাতে। জেলা প্রশাসন পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার বোদা-মাড়েয়া সড়ক ভাষা সৈনিক মোহাম্মদ সুলতানের নামে নামকরণ করে।
মোহাম্মদ সুলতানের ভাতিজা প্রধান শিক্ষক কামরুজ্জামান রুবেল বলেন, ‘আমার চাচা একজন নিবেদিত ভাষা সৈনিক ছিলেন। তিনি ভাষা আন্দোলন ও একুশে ফেব্রুয়ারিতে বই বের করতে গিয়ে জেলে গিয়েছেন। তার যে কীর্তি ও অবদান তা বর্তমান প্রজন্ম তেমন জানেন না। ভাষা আন্দোলনের ৬৮ বছর এবং দেশ স্বাধীনের ৪৯ বছর পেরিয়ে গেলেও তিনি কোনো পদক বা স্বীকৃতি পেলেন না, কষ্ট এটাই।’
শিক্ষার্থী হালিমা আক্তার সম্পা বলেন, ‘আমি শুধু তার নামই শুনেছি। কিন্তু বিস্তারিত জানি না। উনি একজন ভাষা সৈনিক এবং পঞ্চগড়ের গর্ব। ওনার সম্পর্কে আমাদের ভালোভাবে জানা উচিত।’
জেলার বোদা মহিলা মহাবিদ্যালয়ের প্রভাষক সমাজসেবক এমরান আল আমিন বলেন, ‘তার নামে একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে। কিন্তু গণমানুষের কাছে কিংবা নতুন প্রজন্মের কাছে মোহাম্মদ সুলতান যে ভাষা রক্ষার ক্ষেত্রে অবদান রেখেছিলেন, তিনি যে আমাদের এলাকার ও দেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন তা পৌঁছাতে পারেনি।’
অসাম্প্রদায়িক, অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ও আত্মনিবেদিত প্রাণ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ে দীপ্ত আপোসহীন এক বিপ্লবী ব্যক্তি ছিলেন মোহাম্মদ সুলতান। সুলতান বাংলাদেশের মানুষকে ভালোবেসেছেন। মানুষের কল্যাণের জন্যেই নিবেদিত ছিল তার জীবন। সবার প্রিয় সুলতান বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন—এ প্রত্যাশা দেশের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের।
মোহাম্মদ সুলতানের অন্যান্য তথ্য
কৈশোরেই ‘ভারত ছাড়ো’ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সুলতান প্রথম আকৃষ্ট হন। ১৯৪৬ সালে পাকিস্তান আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। পরবর্তীকালে ১৯৪৮ সালে রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলন এবং ছাত্র আন্দোলনে মোহাম্মদ সুলতান অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫১ সালে যুবলীগে যোগ দেন এবং যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হন। মোহাম্মদ সুলতান ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম কালো পতাকা উত্তোলনকারী ছাত্র। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্ম পরিষদ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর যে ১১ জন সংগ্রামী ছাত্র নেতা ফজলুল হক হলের পুকর পাড়ের সিঁড়িতে বসে রাত ১টায় ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মোহাম্মদ সুলতান ছিলেন তাদের অন্যতম।
ভাষা আন্দোলনের পর তিনি এম আর আখতার মুকুলের অংশীদারিত্বে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পুস্তক বিক্রয় কেন্দ্র পুঁথিপত্র প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫৩ সালের মার্চ মাসে কবি হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায় ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক সংকলন একুশে ফেব্রুয়ারি প্রকাশ করেন। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে সাহিত্যের মাধ্যমে ধরে রাখার ঐতিহাসিক দায়িত্ব তিনি পালন করেন। অবশ্য প্রকাশনার কিছুদিন পরেই মুসলিম লীগ সরকার একুশে ফেব্রুয়ারি বইটি বাজেয়াপ্ত করে। রাজনৈতিক কারণে মোহাম্মদ সুলতানকে দীর্ঘদিন কারা ভোগ করতে হয় এবং আন্ডারগ্রাউন্ডে যেতে হয়। তবে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত মোহাম্মদ সুলতান বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক সমিতির সহ-সভাপতি এবং বাংলা একাডেমির জীবন সদস্য ছিলেন। ১৯৮৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
