এসডিজি ও মানসম্মত শিক্ষা

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:৫৮

হায়দার আহমদ খান এফসিএ

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অনেক পরিকল্পনা ও গবেষণা চলছে। বর্তমান মুক্তবাজার অর্থনীতির বিশ্বে বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন এবং উন্নতির জন্য সরকারের সূক্ষ্ম কার্যক্রম এবং কার্যকর পদক্ষেপ থাকতেই হবে। থাকতেই হবে এই কারণ যে, রক্ত দিয়ে এ দেশের পতাকা অর্জন করতে হয়েছে। বর্তমান বিশ্বেও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়—মানুষের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন। আলোচনা এবং পরিকল্পনার প্রধান বিষয় মানুষের সক্ষমতা নিয়ে। কারণ মানুষের সক্ষমতার উন্নয়নই পারে দারিদ্র্র্র্যের বিষচক্র থেকে স্থায়ীভাবে বের হয়ে আসার নিশ্চয়তা। সে লক্ষ্যকে সামনে রেখে সারাবিশ্বে জাতিসংঘের নেতৃত্বে ১৭টি লক্ষ্যকে সামনে রেখে ২০১৬ সাল থেকে শুরু হয়েছে ‘Sustainable Development Goals-SDG’-এর কার্যক্রম নতুন মাত্রায়। ১৭টি লক্ষ্যের চতুর্থ লক্ষ্যটি মানসম্মত শিক্ষা। বাংলাদেশেও চলছে সেই ১৭টি লক্ষ্যকে সামনে রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং কার্যক্রম।

উন্নয়নের যাত্রাপথের পরবর্তী পদক্ষেপ, বাংলাদেশের অষ্টম-পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, যার আসল উদ্দেশ্য ‘Promoting Prosperity Fostering Inclusiveness’। পরিকল্পনায় আছে দেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন। সম্প্রতি এক সংবাদে প্রকাশ, ‘বাংলাদেশ সরকারের প্রত্যাশা অনুযায়ী ২০৪১ সালের মধ্যে দেশে দরিদ্র হবে অতীতের কাহিনি, স্বাস্থ্য সেবা পাবে সবাই, বেকারত্ব থাকবে না এবং জনসংখ্যার শতভাগ হবে সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন’ ( দৈনিক ইত্তেফাক, ১০/২/২০২০ইং)। বাস্তবে এই উন্নয়নের পরিকল্পনা চলে আসছে ১৯৭২ সাল থেকে। প্রচেষ্টার প্রভাবে এখন খাদ্যের অভাবে কেউ মারা যায় না, আলহামদুলিল্লাহ। তবে বাংলাদেশের সব মানুষের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিত্সাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করাই মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যাশা (গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, ১৫(ক)।) সরকারও দাবি করছেন সে লক্ষ্যে কাজ চলছে। তবে দেশের বর্তমান বাস্তবতা হলো এখনো প্রায় ৪ কোটি মানুষের দৈনিক আয় ২০০ টাকারও কম এবং বত্সরে ৬৫ লাখ মানুষ দরিদ্র হয় চিকিত্সা ব্যয় মেটাতে। সংখ্যার বিবেচনায় ৪ কোটি মানুষ অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

একটি দেশের উন্নয়ন, উন্নতির জন্য প্রয়োজন সম্পদ। বাংলাদেশে আছে শুধুই মানুষ। বাংলাদেশের এই জনগণকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে পারলে দেশের উন্নতির গতি এবং মাত্রা অন্যরকম হতে পারতো। আমরা উন্নত দেশের বাসিন্দা দাবি করতে পারতাম এবং বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের শ্রমিকের চাকরির জন্যে সরকারকে অন্য দেশের সরকারের সঙ্গে দেন-দরবারের প্রয়োজন হতো না।

বাংলাদেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক অবস্থার জন্য দেশের মানুষের একটি অংশ তাদের সন্তানের লেখাপড়া করাতে পারে না বা সম্ভব হয় না। বিপুল সংখ্যক মানুষের সন্তান উপযুক্ত শিক্ষা, চাকরির বাজারে প্রবেশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে শুরু মাধ্যমিকে প্রায় ১৩.৩৭ লাখ শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে চাকরির জগতে প্রবেশের সার্টিফিকেট পেয়েছিল মাত্র ৯.৮৮ লাখ। চলতি মাসের ৩ তারিখ থেকে শুরু হয়েছে এসএসসি পরীক্ষা। সংবাদে প্রকাশ, এই পরীক্ষায় অংশ নেয় ২০ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৯ জন শিক্ষার্থী। ২০১৪ সালের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল ৩০ লাখ ৯৪ হাজার ২৬৫ জন শিক্ষার্থী। পাঁচ বছরের শিক্ষা জীবনের মাথায় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরবর্তী পরীক্ষার জগতে নেই ১০ লাখ ৪৬ হাজার ছেলেমেয়ে। তারা কর্মজগতে আছে নিশ্চয়ই। তাদেরকে কর্মক্ষমতার বিচারে মানবসম্পদ বলা যাবে? দেশের ব্যবসায়ী নেতারাও বলছেন, দেশের চাকরির বাজারে প্রতি বছর প্রবেশ করে ২৩-২৫ লাখ ছেলেমেয়ে। তার মানে কর্মজগতে প্রবেশ করা কর্মীদের একটি বড়ো অংশ অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত এবং এমন কারণেই হয়তো একটি অংশ বেকার। সরকার দাবি করছেন নানাবিধ পরিকল্পনা নিয়ে উপযুক্ত এবং মানসম্মত শিক্ষা দিয়ে মানবসম্পদে রূপান্তর করার। এমন কী বিশ্বসেরা অবস্থানে যাওয়ার। কথা আর কাজে মিল আনতে পারলে তা সম্ভব। মানুষের জীবনে শিক্ষা ছাড়া সকল সম্পদ ক্ষণস্থায়ী। আর সে শিক্ষাই দিতে পারে মানুষের জীবনের টেকসই আর্থিক সচ্ছলতা।

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা যেহেতু ভিন্ন সে কারণেই সরকারকে আরো একটু কঠোর হতে হবে সরকারের কাজের মান এবং জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে। সরকারের উন্নয়ন ব্যয়ে যেমন বিশ্বরেকর্ড সৃষ্টি হচ্ছে তেমনি কাজের মানের ক্ষেত্রে বিশ্বরেকর্ড থাকতে হবে। বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষার হার মন্দ না, তবে মান নিয়ে নানাবিধ অভিযোগ। অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা শতকরা ৮১ জন ইংরেজি পড়তে ও লিখতে পারে না এবং শতকরা ৭৮ জন অঙ্কে অদক্ষ। সম্প্রতি একাধিক সংবাদে প্রকাশ বাংলাদেশের শিক্ষা জগতের বর্তমান বহুবিধ সমস্যা।       ‘শিক্ষক নেই, জোড়াতালি দিয়ে চলছে লেখাপড়া (প্রথম আলো, ৩০/০১/২০২০)। করদাতাদের কষ্টার্জিত টাকা সরকার শিক্ষা প্রসারে ব্যয় করছে ঠিকই কিন্তু নানাবিধ কারণে সুফল থেকে দেশ এবং জাতি বঞ্চিত। সৃষ্টি হচ্ছে শিক্ষিত বেকার।

বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রথম এবং প্রধান অন্তরায় অশিক্ষা এবং মানসম্মত শিক্ষার অভাব এবং এই মানসম্মত প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার অভাবেই বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের উত্পাদনশীলতা যেমন কম তেমনি শিক্ষা জগতে উপযুক্ত এবং মানসম্মত শিক্ষকেরও অভাব। বর্তমান মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় হেরে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সামনের দিন আরো বেশি প্রতিযোগিতামূলক হবে। কারণ চতুর্থ শিল্পবিপ্লব আসছে আমাদের সামনে রোবটকে নিয়ে। আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন কাজের প্রধান ধারক এবং বাহক সরকার। দেশের উন্নয়ন একদিনে যেমন হয় না তেমনি একদিনের উন্নয়নও দৃশ্যমান হতে হবে তা হলেই পরিকল্পনা অনুযায়ী সময় শেষে জনগণ উন্নয়নের স্বাদ পাবে। মনে রাখতে হবে সরকারের আসল সফলতা দেশের মানুষকে মানবসম্পদে রূপান্তরের জন্য শতভাগ শিক্ষিত করার সঙ্গে মানসম্মত শিক্ষার নিশ্চয়তা। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, মানসম্মত শিক্ষার অভাবে যেমন বেকার সমস্যার সৃষ্টি করে তেমনি বহুবিধ সামাজিক অপরাধেরও জন্মদাতা। সামাজিক অপরাধের প্রথম এবং প্রধান ক্ষতিগ্রস্ত জগত্ বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের রাজনীতি। রক্ত দিয়ে স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরেও আমরা যেমন শিক্ষায় পেছনে তেমনি রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও সমস্যার সন্মুখীন। আমরা নিশ্চয়ই এমনটা চাই না।

n লেখক : চেয়ারম্যান, এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন-ইডিএ