প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব চীন ছাড়াও আরো বেশ কিছু দেশে ছড়িয়ে পড়ায় বাংলাদেশ থেকে বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। তবে বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে এই সতর্কতা কোনো আনুষ্ঠানিক সতর্কতা বা নিষেধাজ্ঞা নয় বলে জানান আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। গতকাল রবিবার সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘করোনা ভাইরাস যেহেতু বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে, তাই খুব প্রয়োজন না হলে বিদেশে ভ্রমণ করাকে নিরুত্সাহিত করছি আমরা, তবে নিষেধ করছি না।’ দেশের বাইরে ভ্রমণ করে ফেরত আসা কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের মাধ্যমে যেন ভাইরাস দেশে প্রবেশ করেতে না পারে, সেজন্য সতর্কতামূলক এই পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে জানান ফ্লোরা।
তিনি বলেন, ‘কিছু কিছু দেশে এই ভাইরাসের উত্স সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সেক্ষেত্রে সেরকম কোনো জায়গায় গিয়ে বাংলাদেশের কোনো নাগরিক যদি সংক্রমিত হন, তাহলে বাংলাদেশে ভাইরাস প্রবেশ করা ঠেকানো আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।’ ভ্রমণকালীন সতর্কতা হিসেবে জনসমাগমে যাওয়া থেকে বিরত থাকা, বাজারে কম যাওয়া, শ্বাসনালির সংক্রমণ রয়েছে এমন ব্যক্তির এক মিটারের মধ্যে না যাওয়া, করমর্দন না করা এবং কোলাকুলি না করার উল্লেখ করেন তিনি। চীনের বাইরে দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি ও ইরানে দ্রুত বাড়ছে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ। বিশ্ব জুড়ে আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছে গেছে ৮০ হাজারের কাছাকাছি। এ ভাইরাসের সংক্রমণে আরো ১০১ জনের মৃত্যু হয়েছে শনিবার; মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪৬১ জনে, যাদের মধ্যে ১৯ জন ছাড়া বাকি সবার মৃত্যু ঘটেছে চীনে। ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে চীনের পর দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি ও ইরানে ভাইরাস উপদ্রুত এলাকাগুলো অবরুদ্ধ করে ফেলার মতো কঠোর ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে, কিন্তু মৃত্যুর মিছিল থামছে না। চীনের জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সব মিলিয়ে চীনে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৬ হাজার ৯৩৬ জনে। আর ২৯টি দেশ ও তিনটি অঞ্চল মিলিয়ে এ পর্যন্ত অন্তত ৭৮ হাজার ৭২৪ জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট। চীনের মূল ভূখণ্ডের বাইরে আরো চার জনের মৃত্যুতে শনিবার মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৯ জন। তাদের মধ্যে ইরানে পাঁচ জন, দক্ষিণ কোরিয়ায় চার জন, জাপানে তিন জন, হংকং ও ইতালিতে দুই জন করে এবং ফিলিপাইন, ফ্রান্স ও তাইওয়ানে এক জন করে আক্রান্তের মৃত্যু হয়েছে। এতদিন করোনা ভাইরাসের প্রকোপ চীনের মধ্যেই ছিল বেশি। কিন্তু গত কয়েক দিনে চীনের বাইরে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দ্রুত বাড়ছে নতুন রোগীর সংখ্যা। এ রোগ যাতে অন্যান্য দেশে মহামারি আকার না নেয়, সেজন্য এখনই সর্বোচ্চ তত্পরতা চালানো জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়েসাস। তার মতে, এখনো এই ভাইরাসের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, তবে যত সময় যাচ্ছে, সুযোগ ততই কমে আসছে।
নতুন করে আরো অন্তত ১৫ জনের শরীরে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে ইরানে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়ে বলছে, করোনা ভাইরাসে গতকাল রবিবার আরো এক জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এ নিয়ে দেশটিতে করোনায় মোট আট জনের প্রাণহানি ঘটল। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র কিয়ানুশ জাহানপুর বলেছেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত মোট ৪৩ জনকে করোনা সংক্রমিত হিসেবে পেয়েছি। এছাড়া এতে প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে আট জনে। আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেশটির ১৪টি প্রদেশের সব স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করেছে ইরান সরকার। আগামী এক সপ্তাহ দেশের সব সিনেমা হল, প্রদর্শনীও বন্ধ থাকবে। এছাড়া দেশটির রাজধানী তেহরানে সাবওয়ে স্টেশনের সব ঝরনা ও বিস্ট্রো (খাবারের দোকান) পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখতে বলেছে কর্তৃপক্ষ। প্রতিদিন সব বাস ও মেট্রোরেল জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করতে বলা হয়েছে। এদিকে ইরানে করোনয় আক্রান্ত ও প্রাণহানির সংখ্যা বাড়তে থাকায় দেশটির সঙ্গে সব ধরনের বিমান চলাচল স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে কুয়েত এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ।
করোনা ভাইরাস সংক্রমণ বেড়েই চলেছে দক্ষিণ কোরিয়ায়। এতে মারা গেছেন আরো দুজন। এ পর্যন্ত দেশটিতে পাঁচ জন মারা গেছেন। দেশটির স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন ১৬৯ ব্যক্তি আক্রান্ত হয়েছেন। ২৪ ঘণ্টায় প্রায় দ্বিগুণসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হয়ে শনিবার এ সংখ্যা গিয়ে ঠেকেছে ৬০২ জনে। এ পরিস্থিতিতে দেশটির প্রেসিডেন্ট সর্বোচ্চ সতর্কতা ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করেছেন। দেইগু শহর ও চেওংডো কাউন্টিকে শুক্রবার ‘স্পেশাল কেয়ার জোনস’ উল্লেখ করা হয়েছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে সরকারি সংস্থাগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে স্বাস্থ্য নীতিমালা এবং ভাইরাস সংক্রমণ বৃদ্ধি প্রতিরোধে সমন্বিত একটি পরিকল্পনার খসড়া প্রস্তুত করতে বলেছেন। শনিবার দেশটিতে ২৭ জন নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দক্ষিণ কোরয়া ও জাপানের জন্য তাদের ভ্রমণ সতর্কতা এক ধাপ বাড়িয়ে লেভেল-২ করেছে (১-৪)।
