প্রথমবারের মতো ভারত সফরে এসে দেশটির প্রতি ভালোবাসা এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের কথা জনসমক্ষে জানালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আহমেদাবাদের মোতেরায় সরদার বল্লভভাই প্যাটেল স্টেডিয়ামে লাখো ভারতীয়র সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করবে। পাকিস্তানের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্র কাজ করছে- যাতে তারা শক্তভাবে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে। পাকিস্তানের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ভালো। খবর:এনডিটিভি ও আনন্দবাজার পত্রিকার।
ভারতের অপেক্ষার পালা শেষ করে গতকাল সোমবার স্থানীয় সময় বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে গুজরাটের আহমেদাবাদে সরদার বল্লভভাই বিমানবন্দরে অবতরণ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বহনকারী বিমান এয়ার ফোর্স ওয়ান। ভারতে আসার আগে একের পর এক টুইট করেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তেই ট্রাম্প হিন্দিতে টুইট করে বলেন, আমরা ভারতে আসতে খুবই আগ্রহী। এখন মাঝপথে আছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই সকলের সঙ্গে দেখা হবে।
আহমেদাবাদের বিমানবন্দরে ট্রাম্পকে আলিঙ্গন করে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এরপর স্ত্রী মেলানিয়াকে নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প যান ভারতের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর সাবরমতী আশ্রমে। সাবরমতী আশ্রমে ট্রাম্প ও মেলানিয়াকে উত্তরীয় পরিয়ে স্বাগত জানানো হয়। এরপর মহাত্মা গান্ধীর মূর্তিতে মালা দেন ট্রাম্প ও মোদি। আশ্রমের পবিত্রতা রক্ষায় ট্রাম্প ও মেলানিয়া দুইজনই পায়ের জুতা খুলে বাইরে রাখেন। গোটা আশ্রমটি মোদি নিজেই তাদের ঘুরিয়ে দেখান। ট্রাম্প ও মোলানিয়া দুজনে চরকাও কাটেন। পরিদর্শক বইতে ট্রাম্প ইংরেজিতে লিখেছেন, এই অভূতপূর্ব সফরের জন্য আমার মহান বন্ধু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ধন্যবাদ। তবে মহাত্মা গান্ধীর বিষয়ে কোনো কথা লিখেননি তিনি। সেখানে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে তারা মোতেরায় ‘নমস্তে ট্রাম্প’ অনুষ্ঠানে যোগ দেন। ট্রাম্পকে বিমানবন্দর থেকে মোতরার স্টেডিয়াম পর্যন্ত স্বাগত জানাতে রাস্তার দুই পাশে হাজির হয়েছিল এক লাখের বেশি মানুষ।
মঞ্চে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মেলানিয়াকে স্বাগত জানিয়ে নরেন্দ্র মোদি বলেন, আজ মোতেরা স্টেডিয়ামে নতুন ইতিহাস রচিত হচ্ছে। পাঁচ মাস আগে হিউস্টনে ‘হাউডি মোদি’ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলাম। আর আজ আহমেদাবাদে এসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঐতিহাসিক সফরের সূচনা করলেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আপনাকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রে স্বাগত। ভারত-যুক্তরাষ্ট্র শুধু অংশীদার নয়, সবকিছু ছাপিয়ে দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
এরপর বক্তৃতার শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, নমস্কার, যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে ভালবাসে। যুক্তরাষ্ট্র সব সময় ভারতের বিশ্বস্ত বন্ধু থাকবে। আমি আমার বিশেষ বন্ধু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ধন্যবাদ জানাই। এই শহরে একজন চা বিক্রেতার সন্তানের স্মরণীয় উত্থান হয়েছে। তিনি একজন মহত্ ব্যক্তি। সবাই তাকে ভালবাসে, তিনি একজন দারুণ বক্তা। আপনি শুধু গুজরাটের গর্ব নন। কঠোর পরিশ্রম এবং অধ্যাবসায়ের মাধ্যমে যে অনেক কিছু অর্জন করা যায়, তার জীবন্ত উদাহরণ। অভূতপূর্ব উত্থানের একটা চলমান গল্প আপনি। তবে পাশাপাশি ট্রাম্প এটাও বলেন, মোদি এক জন দৃঢ় মনোভাবাপন্ন ব্যক্তি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, গত সাত বছরে ভারতের উত্থান স্মরণীয়। গত দুই দশকে যে গতিতে ভারতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তা বিষ্ময়কর। ভারতের মানুষ সারা বিশ্বের মানুষের অনুপ্রেরণা। তিনি বলেন, প্রত্যেক দেশেরই তাদের সীমান্ত সুরক্ষিত এবং নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কাজ করছে। এই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্বের ভূমিকা ভারতের রয়েছে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্র কাজ করছে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, এ দেশের সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে মিলেমিশে থাকেন। আর এই একতাই বিশ্বের কাছে অনুপ্রেরণা। মানুষের স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিয়েছে ভারত। গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ ও সহিষ্ণু দেশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ট্রাম্প বলেন, ভারত থেকে বিশ্বের অন্যতম বড় বাজার। ভারতের সঙ্গে ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অস্ত্র চুক্তি হবে। ভারতের সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করতে সব রকম চেষ্টা চালাবে যুক্তরাষ্ট্র। এ কারণেই ভারতকে অত্যাধুনিক সেনা হেলিকপ্টার সরবরাহ করা হবে। শুধু অস্ত্র চুক্তি নয় ভারতের সঙ্গে বড় বাণিজ্য চুক্তিও হবে।
নমস্তে ট্রাম্প অনুষ্ঠান শেষে আহমেদাবাদ থেকে আগ্রায় গিয়ে মেলানিয়ার হাতে হাত রেখে তাজমহলে সান্ধ্যভ্রমণ করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এ সময় ট্রম্পের পরনে ছিল সাদা শার্ট, হলুদ টাই আর কালো কোট। আর ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ঝকঝকে সাদা পোশাকে, কোমরে বাঁধা সবুজ উত্তরীয়। পাশ্চাত্যের পোশাকে ভারতীয় ফ্যাশনের ছোঁয়া!
গতকালই তারা আগ্রা থেকে দিল্লি পৌঁছান। আজ মঙ্গলবার দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করবেন ট্রাম্প এবং মোদি। এই আলোচনায় ট্রাম্প ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়টি উত্থাপন করবেন বলে আগেই মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে। অন্যদিকে মেলানিয়া ট্রাম্প যাবেন দিল্লির একটি স্কুল পরিদর্শনে। বিকাল তিনটায় ট্রাম্প ভারতী ব্যবসায়ীদের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। রাত ১০টার দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নয়াদিল্লি ছেড়ে যাবেন।
