কেউ উদ্যোক্তা, কেউ সমাজসেবী। কেউ বিলাসী জীবন ছেড়ে সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করেছেন।
কেউ আবার শত প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে শূন্য থেকে শুরু করে সফলতার শিখরে পৌঁছেছেন। এমন তিন নারী এবার পেয়েছেন
শামসুন্নাহার রহমান পরাণ পদক ২০২০। লিখেছেন— আজহার মাহমুদ
ফেরিওয়ালা মোমেনা এখন ক্ষুদ্র
পোশাক উদ্যোক্তা
মোমেনা বেগমের বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগরে। ২০০০ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে বেড়াতে আসেন চট্টগ্রামে। সেখানে একটি গার্মেন্টসে চাকরির সুযোগ পান। পরে ঐ গার্মেন্টসের কর্মকর্তা কাজী সাইফুল ইসলামকে বিয়ে করেন। ২০০৪ চালে প্রথম সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে চাকরি ছেড়ে দেন। পরে আবার ভাবতে শুরু করেন নিজ উদ্যোগে কিছু করা যায় কি না। তখন তারা শহরের সল্টগোলা ক্রসিংয়ে থাকতেন। এ সময় তিনি দেখতে পান পার্শ্ববর্তী একটি স্কুলগেটে প্রতিদিন শত শত মা সন্তানদের স্কুলে দিয়ে অপেক্ষা করেন। তখন তার মাথায় এলো নারীদের কিছু পণ্য আছে যেগুলো অন্যকে দিয়ে কেনানো যায় না, আবার কেনালেও পছন্দ হয় না। সেই ভাবনা থেকেই মোমেনা ঘাসফুল থেকে ১৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে নারীদের অন্তর্বাস এবং শিশুদের কিছু সামগ্রী ফেরি করতে শুরু করেন। ২০০৯ সালে ঐ স্কুলগেটের পাশেই এমটি ফ্যাশন নামের একটি শোরুম করেন। ২০১৫ সালে এসে পুরোদমে কারখানা গড়ে তোলেন মোমেনা। চাকরি ছেড়ে স্বামীও যোগ দেন তার ব্যবসায়। বর্তমানে প্রতি মাসে ৭-৮ লাখ টাকা বিক্রি হয়।
রাঙ্গামাটির তবলছড়ির সফল
নারী মঞ্জুলিকা
মঞ্জুলিকার জন্ম রাঙ্গামাটির তবলছড়িতে। স্থানীয়ভাবে তিনি ‘হত্তালী’ নামে পরিচিত। ১৯৭৩ সালে রাঙ্গামাটি কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন তিনি। এর আগে এসএসসির পর শাহ বালক উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। স্বামী প্রয়াত চিরঞ্জীব চাকমা ছিলেন সমাজসেবক। বেইন টেক্সটাইল প্রতিষ্ঠার পর মঞ্জুলিকা নিজের দক্ষতা উন্নয়নে নজর দেন। বিসিক থেকে ক্ষুদ্র শিল্প, বিপণন ব্যবস্থাপনা ও বিক্রয় প্রসার এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন সেমিনার, কর্মশালায় অংশ নিয়েছেন। বেইন টেক্সটাইলের উত্পাদিত পণ্য দেশের ফ্যাশন হাউজগুলোর মাধ্যমে আমেরিকা, ফ্রান্স, হল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হতে শুরু করে। তাকে অনুসরণ করে এখন পর্যন্ত পার্বত্য অঞ্চলে ছোটোবড়ো ৩৫টি হস্ত ও বস্ত্রশিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। ২০০৯ সালে ইউএনডিপি ও সিএইচটিডিএফের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নিয়াজ জামানের সঙ্গে যৌথ গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন, যা পরের বছর ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের প্রকাশনায় উপস্থাপিত হয়।
নিভৃত সমাজসেবী
রাজিয়া সামাদ
রাজিয়া সামাদ ডালিয়া ১৯৬৪ সালে চট্টগ্রাম মহিলা কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন। ১৯৮৩ সালে স্বামী সরকারি কর্মকর্তা প্রকৌশলী আব্দুস সামাদের মৃত্যুর পর ঢাকার একটি স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৯০ সালে নিজের জমানো অর্থ ও পারিবারিক সহায়সম্পদ বিক্রি করে ঢাকার আয়েশি জীবন ফেলে চলে জান বাবার জন্মভিটা শেরপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সেখানে দরিদ্র মানুষের শিক্ষা ও চিকিত্সার জন্য উপমা বিদ্যালয় ও উপমা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে নিজের বাসায় এনে নকশীকাঁথা সেলাই শেখানোর ব্যবস্থা করেন। ১৯৯৫ সালে পিতার নামে চালু করেন খান বাহাদুর ফজলুর রহমান ফাউন্ডেশন। ১৯৯৭ সালে গঠন করেন শেরপুর ডায়াবেটিক সমিতি। পরে শেরপুরের লাহিড়ী কাচারি এলাকায় নিজস্ব জায়গায় ডায়াবেটিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ১৫ শিক্ষার্থীর পড়াশোনার খরচ চালানো হয়। ১৯৮৩ সাল থেকে শেরপুর সরকারি মহিলা কলেজে স্বামীর নামে ‘আব্দুস সামাদ স্মৃতি বৃত্তি’ প্রচলন করেন।
