তিনি বিনামূল্যে গাছ বিতরণ করেন, গ্রামের মানুষকে বই পড়তে দেন। উঠোন বৈঠক করে ছাত্র-ছাত্রীদের বই পড়ে শোনান। তার দেওয়া প্রায় বিশ হাজার গাছ সতেরটি গ্রামে বেড়ে উঠেছে। নিজে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। চাকরি না করে মুরগির ফার্ম করেছেন। ডিম ও মুরগির বাচ্চা বিক্রি করে বই ও গাছের চারা কিনেন। দেশবরেণ্য লেখিকা সেলিনা হোসেন তাকে ‘স্বপ্নের ছেলে’ নামে অভিহিত করেছেন। তার নাম মাহমুদুল ইসলাম মামুন। মামুনের মা মাহমুদা বেগম বলেন, ‘প্রকৃতির প্রতি তার প্রেম ছোটবেলা থেকেই। গাছ ও পাখির প্রতি তার খুব মায়া। ছোটবেলা থেকেই গাছ ও শিক্ষার প্রতি তীব্র আকর্ষণ ছিল তার। অনার্সে পড়ার সময়, গাছের যত্ন আর বইপড়ার প্রতি মানুষকে সচেতন করার কাজ শুরু করে।’
মামুনের বাড়ি পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার আজিজনগর গ্রামে। বাবা আজহারুল ইসলাম পঞ্চগড় চিনিকলের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারি। মা মাহমুদা বেগম গৃহিনী। দুই ভাইয়ের মধ্যে মামুন ছোট।
পলান সরকারকে নিয়ে প্রচারিত প্রতিবেদন মামুনকে অনুপ্রেরণা যোগায়। মামুন ভাবলেন, গাছ বিতরণ তো করাই যায়। পাশাপাশি আর কি করা যায়। নতুন কী যোগ করা যায়। তিনি গাছের সঙ্গে বই পড়তে দেওয়া শুরু করেন। পাড়া-মহল্লায় বিভিন্ন বয়সী মানুষদের জড়ো করে বই পড়িয়ে শোনাতে লাগলেন। এক সময় গড়ে তুললেন সন্ধ্যা-রাতের পাঠশালা।
মামুন বলেন, ‘আমি আসর বসাতে পারি। মানুষ আমার কথা শোনে। তাদের এক জায়গায় জড়ো করে বই পড়ে শোনাই। আবার বই পড়তে দিয়ে যাই।’ ২০১৩ সাল থেকে মামুন তেঁতুলিয়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের মানুষদের মাঝে গাছ বিলিয়ে আসছেন। ১৭টি গ্রামে মামুনের দেওয়া হাজার হাজার গাছ বেড়ে উঠেছে। কম করে হলেও এই গাছের সংখ্যা বিশ হাজার ছাড়িয়ে গেছে বলে মামুন জানান।
মামুন বলেন, ‘ছোটকালেই আমি সব বড় বড় লেখকদের বই পড়ে ফেলি। ব্র্যাকের কিশোরী পাঠাগার থেকে মেয়েরা বই আনত। তাদের থেকে লুকিয়ে সে বই আমি পড়ার জন্য নিয়ে আসতাম। পড়ে আবার ফেরতও দিয়ে আসতাম। একদিন ভাবলাম, গাছ দিতে তো মানুষের বাড়ি বাড়ি যেতেই হয়। সেইসঙ্গে তাদেরকে বইও পড়তে দেওয়া যায়। তাই গাছের সঙ্গে বই ও পড়তে দিতে শুরু করি।’
এই ধরনের সেবামূলক কাজ বেছে নেওয়ার কারণ হিসাবে মামুন বলেন, ‘সামাজিক দায়বদ্ধতা ও নাগরিক হিসেবে কর্তব্য পালন করছি। দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে এগিয়ে এসেছি। আর ভালোলাগা তো আছেই।’
মামুনের একটি হাঁস-মুরগির খামার আছে। সবজির চাষও করেন। সেখান থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়ে গাছের চারা ও বই কিনেন। মামুন বলেন, ‘এসব কাজের জন্য আমি বাড়িতে হাঁস-মুরগি পালনের জন্য খামার গড়ে তুলেছি। ডিম ও বাচ্চা বিক্রি করে গাছের চারা ও বই কিনি। পারিবারিক চা-বাগানেও কাজ করি।’ রংপুর, ঠাকুরগাঁও, তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড়, দিনাজপুর তো বটেই—মামুন অন্য যেসব জেলায় গিয়েছেন, সেখানেই গাছ লাগিয়েছেন। ঢাকা শহরেও মামুনের লাগানো গাছ আছে বলে জানা গেলো। লেখিকা সেলিনা হোসেন, মুহিত কামাল, নাসরিন জাহান এমন অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির বাড়ির ছাদে মামুনের লাগানো গাছ রয়েছে।
মামুন নতুন করে কোনো কাজ শুরু করার সময় লেখিকা সেলিনা হোসেনের পরামর্শ নেন। স্নেহ, ভালোবাসা ও সঠিক পরামর্শ দিয়ে সেলিনা হোসেন সব সময় তার পাশে থাকছেন বলে মামুনের কাছে জানা গেলো। সেলিনা হোসেনকে তিনি গাছের চারা ও বই উপহার দেন। মামুন বিভিন্ন সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ফুল, ফলজ ও বনজ গাছের চারা উপহার দিয়েছেন।
