সংশপ্তক মীজানুর রহমান এবং একটি অনন্য বিকেল

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৮:৩৭

আকাশ আনোয়ার

আমার জীবনের অনেকগুলো অধ্যায়ের একটি হচ্ছে লেখা। কিশোরবেলায় সাহিত্য ও তথ্যনির্ভর লেখার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম। তবে দস্যু বনহুর, মাসুদ রানা সিরিজও পড়েছি। পর্যায়ক্রমে ব্রিটিশ, রুশ, ফরাসি, চীনা এবং আমেরিকার সাহিত্যের প্রতি মনোযোগী হয়ে উঠি। সম্পাদনার ক্ষেত্রে ‘সংবাদ সাময়িকী’, ‘ইত্তেফাক সাময়িকী’ এবং সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’র কাজ খুব কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। আজিমপুর থেকে দি গ্লিম্পস নামের একটি পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছি ’৮৭ সালের দিকে, তবে আমার জীবনে অনুপ্রেরণার একটি ত্রৈমাসিক মীজানুর রহমান সাহিত্য পত্রিকা

২ ফেব্রুয়ারি ধানমন্ডি, ঢাকায় এক বিকেলের আড্ডায় গিয়েছিলাম। নানা রকম পিঠা-পুলি আর সুস্বাদু খাবারের আয়োজন ছিল। তবে যে মানুষটি তাঁর কর্মময় সময় কাটিয়েছেন এ বাড়িতে—তিনি আজ নেই, তবে না থেকেও তিনি ছিলেন আসরের সব আলাপের মধ্যমণি। তিনি সংশপ্তক মীজানুর রহমান।

১৯৮২-৮৩ সালের কথা। আমি তখন সংবাদপত্র পড়ার পোকা। লেখাপড়ার জন্য পাবলিক লাইব্রেরি যাই। সে সময়ে পাবলিক লাইব্রেরিতে সংবাদ সাময়িকী খুব একটা পেতাম না। ইত্তেফাক, সংবাদ, দৈনিক বাংলা, বাংলার বাণী দৈনিক পড়েও পড়ার ক্ষুধা মিটত না। সন্ধান করতাম তথ্যভিত্তিক লেখার। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বঙ্কিমচন্দ্র, শরত্চন্দ্র, সত্যজিত্ রায়, হুমায়ুন আজাদ, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, সন্তোষ গুপ্ত, আবদুল্লাহ আল মুতী, ফয়েজ আহমদ, আহসান হাবীব ও আশরাফ সিদ্দিকীসহ স্বনামধন্য লেখকদের লেখা পড়তাম। কিন্তু অপেক্ষা করতে হতো। বিচিত্রা পড়ে ফেলতাম এক নিমেষে। সংবাদপত্রের স্ট্যান্ডগুলোতে চোখ রাখতাম। বাংলাদেশে তখন সমসাময়িক বই, গল্প, উপন্যাস প্রকাশ হতো খুব কম। একদিন আবিষ্কার করলাম মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা। কিনে ফেললাম, ভালো লাগল। বিচিত্রায় যেমন দু-একটি ফিচার পেতাম, এখানে পেয়ে গেলাম একসঙ্গে অনেকগুলো। দামেও কম। সেই সময় থেকেই ‘মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা’ কিনতে থাকি। মনে পড়ে সে সময় বক্তৃতায়, আলাপে প্রায়শই মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা এবং শ্রদ্ধেয় মীজানুর রহমানের নাম উচ্চারিত হতো।

সেই আড্ডায় ছিলেন আলোক শিক্ষালয়ের পরিচালক রাশেদা নাসরিন এবং পথিকৃত্ ফাউন্ডেশন-এর পরিচালক মাহফুজা হক। কথার মাঝে যখন সবাই অন্যদিকে নিমগ্ন সেই অবসরে আমি একাগ্রচিত্তে চোখ রাখি, পড়তে শুরু করি মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা/মীজানুর রহমান সংখ্যা ২০০৮। হঠাত্ খেয়াল করি নীরবে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন আয়োজক নুরজাহান মীজান। মনে হলো এই মুহূর্তে যদি ফিরে পেতাম ২৬ জুন ২০০৫-এ চলে যাওয়া বাংলা ভাষায় প্রকাশিত মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা শীর্ষক সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদককে। কী যেন একটা গভীর মমত্ববোধে হারিয়ে গেলাম একাত্তরে হারানো মায়ের স্মৃতিতে। মনে হলো মা এসে দাঁড়িয়েছেন। এবং পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা দেখিয়ে বলছেন আমাদের হারানো দিনগুলোর স্মৃতিকথা। যেখানে আমি আর কখনো ফিরে যেতে পারব না।  

আমার জীবনের অনেকগুলো অধ্যায়ের একটি হচ্ছে লেখা। কিশোরবেলায় সাহিত্য ও তথ্যনির্ভর লেখার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম। তবে দস্যু বনহুর, মাসুদ রানা সিরিজও পড়েছি। পর্যায়ক্রমে ব্রিটিশ, রুশ, ফরাসি, চীনা এবং আমেরিকার সাহিত্যের প্রতি মনোযোগী হয়ে উঠি। সম্পাদনার ক্ষেত্রে ‘সংবাদ সাময়িকী’, ‘ইত্তেফাক সাময়িকী’ এবং সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’র কাজ খুব কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। আজিমপুর থেকে দি গ্লিম্পস নামের একটি পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছি ’৮৭ সালের দিকে, তবে আমার জীবনে অনুপ্রেরণার একটি ত্রৈমাসিক মীজানুর রহমান সাহিত্য পত্রিকা। আমার মতো অনেকেই সে সময়ে ঋদ্ধ হয়েছেন এ পত্রিকা থেকে। ৮২-৮৩ সাল থেকে নিয়মিত নাটক করতাম ‘নান্দনিক নাট্য সম্প্রদায়’-এ। ১৯৮৬-৮৭ সালে ‘শঙ্খ সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রবাহ’ নামে টিএসসি-কেন্দ্রিক একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলি। সে প্রতিষ্ঠানে ‘শঙ্খ’ নামের একটি প্রকাশনার কাজ করি। জীবনের নানা কারণে আমরা অনেক কিছু ভুলে যাই যদিও, সঠিক সময়, সঠিক ক্ষণ এলে আবার তা মনে পড়ে যায়। ১৯৯৩ সালে অস্ট্রেলিয়া যাবার পর সিডনি থেকে প্রথম প্রেসে মুদ্রিত পত্রিকা ‘আভাস’ বের করি। কিন্তু মনের মিনারে সেই যে দাগ কেটেছিল ত্রৈমাসিক মীজানুর রহমান সাহিত্য পত্রিকা, সে আঁচড় মনে গভীর রেখাপাত করেছিল।

গত ২৭ জানুয়ারি আলোক শিক্ষালয়ের আমন্ত্রণে গিয়েছিলাম মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। সেখানেই পরিচিত হই শ্রদ্ধেয় নুরজাহান মীজান-এর সঙ্গে। শ্রদ্ধেয় মীজানুর রহমানের স্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠানের শেষভাগে আলোকের পরিচালক রাশেদা নাসরিন পরিচয় করিয়ে দিলেন। স্নিগ্ধ, শান্ত একজন মানুষ। প্রথম দেখাতেই শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছে করে। আলাপচারিতার একপর্যায়ে তিনি আমন্ত্রণ জানালেন তাঁর বাসায়। তখনো জানি না আমার জন্য কী বিস্ময় অপেক্ষা করছে। তিনি খুব বিনয়ের সঙ্গে বললেন, ‘আসুন দেখবেন ভালো লাগবে।’

এখানে শ্রদ্ধেয় জাহানারা আবেদিন-এর কথা না বললেই নয়। ২০০৭ সালে অস্ট্রেলিয়ায় ‘বাংলা একাডেমি অস্ট্রেলিয়া’ থেকে আয়োজন করেছিলাম ‘শিল্পাচার্য জয়নুল আন্তর্জাতিক চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা’। প্রতিযোগিতা শেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে আমন্ত্রণ করেছিলাম শ্রদ্ধেয় জাহানারা আবেদিনকে। শিল্পাচার্য জয়নুলের অর্ধাঙ্গিনীকে খুব কাছে থেকে দেখেছি; বহুবার মনে হয়েছে শিল্পাচার্য এবং তাঁর রেখে যাওয়া শিল্পকর্মকে তাঁর মতো করে ভালোবাসতে কাউকে দেখিনি। একইভাবে কথাটা প্রযোজ্য শ্রদ্ধেয় নুরজাহান মীজানের ক্ষেত্রে। তিনি তাঁর পরম শ্রদ্ধেয় স্বামীকে শুধু মনেই রাখেননি, পরম ভালোবাসায় এখনো আঁকড়ে আছেন। বাড়ির পরতে পরতে তাঁর সৃষ্টি আর কর্মময় জীবন সাজিয়ে রেখেছেন, বুকে আগলে রেখেছেন তাঁর স্মৃতি। শুধু তা-ই নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি সহযোদ্ধা হিসেবে কাজ করেছেন। শ্বাসকষ্ট রোগ তাঁকে বেশ অসহায় করেছিল। কিন্তু স্ত্রীর নিবিড় তত্ত্বাবধানে আবারও নতুন জীবনে প্রাণ সঞ্চার করতেন। এক নিমিষে মনে হয়েছে বাঙালি প্রত্যেকটি পরিবার যদি তাঁদের মতো হতেন তবে আমাদের বাঙালি সৃষ্টিগুলো সময়ের আবর্তে হারিয়ে যেত না। আর্কাইভ বা স্থায়ী কোনো প্রকল্প হয়ে যুগ যুগ ধরে আগামী প্রজন্মকে প্রণোদনা দিত। সত্যি একজন অনন্য মানুষ শ্রদ্ধেয় নুরজাহান মীজানকে কাছে থেকে না দেখলে জানা হতো না এই অপূর্ব মানুষটি সম্পর্কে। তাঁর প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা এই অভাজনকে ভালোবাসার একটি অনন্য বিকেল উপহার দেবার জন্য।

মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা সাহিত্য, সংগীত ও শিল্পবিষয়ক ত্রৈমাসিক পত্রিকা। এ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন মীজানুর রহমান। এভাবেই প্রথম জানি তাঁর সম্পর্কে। ১৯৩১ সালে ১৯ ফেব্রুয়ারি বিক্রমপুর জন্ম নিয়েছিলেন অত্যন্ত ক্ষুরধার আর মেধাবী মানুষটি। তাঁর বাবা ফজলুর রহমান কলকাতায় কাজ করতেন। বাবার কর্মসূত্রে তাঁকেও যেতে হয়েছিল কলকাতা। তবে ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর বাবার সঙ্গে চলে আসেন পূর্ববঙ্গে। ১৯৪৯ সালে তিনি ‘ঝংকার’ নামের পত্রিকা দিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন তত্কালীন পাকিস্তানে। সে সময়ে তখনকার নামি দামি লেখকরা লিখতেন ঝংকারে। কিন্তু শিল্পের ভাবনায় সে পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায়। তিনি ভর্তি হলেন ঢাকা আর্ট কলেজে। শিল্পাচার্যের সরাসরি ছাত্র। এছাড়াও ছিলেন কামরুল হাসান, সফিউদ্দিন প্রমুখ। আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় সে সময়ে শিক্ষা শেষের আগেই সরে পড়তে হলো তাঁকে। আবারও সম্পাদনা। এবারে ‘রূপছায়া’ পত্রিকা সম্পাদনা জনপ্রিয় হয়ে টিকে গেল প্রায় ১০ বছর। এরপর নানা উত্থান-পতনে সময় কেটেছে। বেতারে চাকরি, প্রেস তৈরি কোনো কিছুতেই জড়িয়ে থাকলেন না। এল ১৯৮৩ সাল, এলো ‘মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা’। প্রথম জীবনের মীজানুর রহমানকে হয়তো কেউ সাধারণ একজন সম্পাদক ভেবেছেন, কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতা, নির্লোভ মানসিকতা, লেখার বিষয়বস্তু নির্বাচন, গঠনমূলক লেখকদের লেখা সংযোজন, সঠিক মান নিয়ন্ত্রণ, ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে প্রকাশনাটির প্রকাশ—এ সবই তাঁকে দিয়েছে এগিয়ে যাবার দুরন্ত সাহস। শিল্পের অনেকগুলো অঙ্গনে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন তিনি। একজন চিত্রশিল্পী হয়েও সমাজ, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং মানুষের প্রতি সম্প্রীতি ও দায়িত্ববোধ থেকে তিনি এ পত্রিকা সম্পাদনায় মনোযোগী হন। তিনি তাঁর নিজের নামানুসারে পত্রিকাটির নামকরণ করেন। সময়ের বিবর্তনে তিনি বেশ অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা প্রকাশ করেছিলেন। গণিত সংখ্যা, বৃক্ষ সংখ্যা, নদী সংখ্যা ইত্যাদি এখনো সংবাদজগতে পথিকৃত্ হয়ে আছে। এছাড়াও ছিল উল্লেখযোগ্য বই—ধর্মান্ধতাকে উপজীব্য করে ‘কৃষ্ণ ষোলো’ এবং ঢাকা শহরের নান্দনিক স্মৃতি নিয়ে ‘ঢাকা পুরাণ’। মানুষ তাঁর পত্রিকা পড়ে ঋদ্ধ হবেন—এজন্য জীবন-মন সঁপে দিয়েছিলেন মানুষটি। হয়েছেও তা-ই। সেদিন যখন বইয়ের তাকে তাঁর সৃষ্টিকর্ম দেখছিলাম, মনে হয়েছে এদেশের অসংখ্য সংবাদপত্র তাঁর সৃষ্টি থেকে অনেক বিষয় পাঠকদের জন্য সন্নিবেশ করেছে। তাঁর বাসায় আর্কাইভে এসব পত্রিকায় মৃদু হাত দিয়ে তাঁর অস্তিত্ব বুঝবার চেষ্টা করেছি। ১৯ ফেব্রুয়ারি ছিল এই অসীম মানুষটির জন্মদিন।