বিমল সরকার
নেই নীতি, নেই কোনো আদর্শ। বাছবিচার তো নেই-ই। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, একশ্রেণির লোক একেবারে উন্মাদ হয়ে পড়েছেন। টাকা দরকার তাদের; তা যে কোনো উপায়েই হোক। ছুটে চলা। হন্যে হয়ে ছুটে চলা। টাকা ও খ্যাতির পেছনে ছুটে চলা। টাকা চাই, টাকা, আরো টাকা; আরো অনেক টাকা। বৈধ-অবৈধ ও বোধ-বিচার ছাড়া কীভাবে টাকা রোজগার করা যায়, টাকা রোজগার করতে হবে—এটাই যেন ওদের তপস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা সে যে কোনো উপায়েই হোক। এবং এটা বেশ নিঃসন্দেহ যে এ ব্যাপারে বেশ এগিয়ে রয়েছে শিক্ষিত শ্রেণিটিই।
টাকার প্রশ্নে কোনো ধরনের জাতপাত নেই—সব যেন একাকার। টাকা হলেই হলো। গোলাম, এ প্রথিবী টাকার গোলাম। পণ্ডিতপ্রবর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নীতিশাস্ত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে সেই কবে লিখেছিলেন—‘অর্থস্য পুরোষো দাসঃ।’ মানুষ পয়সার গোলাম। পয়সার জন্য মানুষ করতে পারে না এমন কর্মই নেই। চুরি, ডাকাতি, গলায় ছুরি, জুয়াচুরি, বাটপারি, জাল সাক্ষী, জাল দলিল, জাল মোকদ্দমা, মিথ্যা, প্রবঞ্চনা, প্রতারণা, প্রভৃতি এ দেশের লোকের অঙ্গের আভরণ হয়ে উঠেছে। যিনি যে পরিমাণে এসব বিষয়ে কৃতকার্য হতে পারেন, তিনি সেই পরিমাণে সাধু সমাজে বাহাদুর বলে গণনীয় ও প্রশংসনীয় হয়ে থাকেন।’
শিক্ষিত অর্থপিপাসু ব্যক্তিদের বর্ণনা দিতে গিয়ে সুপ্রসিদ্ধ ‘হুঁতোম প্যাঁচার নকশা’ গ্রন্থের এক জায়গায় কালীপ্রসন্ন সিংহ (১৮৪০-১৮৭০) লিখেছেন—‘পাঠকগণ! এই যে উর্দি ও তকমাওয়ালা বিদ্যালংকার, ন্যায়ালংকার, বিদ্যাভূষণ ও বিদ্যাবাচস্পতিদের দেখছেন, এরা বড়ো ফ্যালা যান না, এরা পয়সা পেলে করেন না হেন কর্মই নাই! সংস্কৃত ভাষা এই মহাপুরুষদের হাতে পড়েই ভেবে ভেবে মিলিয়ে যাচ্ছেন! পয়সা দিলে বানরওয়ালা নিজ বানরকে নাচায়, পোশাক পরায়, ছাগলের ওপর দাঁড় করায়; কিন্তু এরা পয়সা পেলে নিজে বানর পর্যন্ত সেজে নাচেন! যত ভয়ানক দুষ্কর্ম এই দলের থেকে বেরোবে, দায়মালী জেল তন্ন তন্ন কল্লেও তত পাবেন না ...।’ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগতে না লাগতেই এই হলো শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণির লোকদের প্রতি একজন চিন্তাশীল লেখকের ধারণা।
উপমহাদেশের প্রখ্যাত লেখক নীরদচন্দ্র চৌধুরী একবার তার পরিচিত এক ব্যক্তির সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় মগ্ন হন। তিনি (নীরদ চৌধুরী) তাকে বলেন যে টাকার পেছনে ছুটে আমার অতিপরিচিত ব্যক্তিদের মধ্যেই অন্তত ২৫ জন নিজেদের প্রতিভাকে বলি দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি একজনের নামও উল্লেখ করেন। তখন সঙ্গের ভদ্রলোকটি বললেন—আপনি যাই বলুন, মশাই—সে পয়সা করেছে।
এক কথা দুই কথার পর নীরদ চৌধুরী ভদ্রলোকটিকে জিগ্যেস না করে পারলেন না। নীরদ চৌধুরীর ভাষায়—
:কত পয়সা?
:অনেক পয়সা।
:১ কোটি টাকা?
: আরে, না না।
:৫০ লাখ?
:আরে, না না।
:১০ লাখ?
:তা-ও নয়।
:৫ লাখ?
: না, বোধ হয়।
তখন আমি (নীরদ চৌধুরী) না বলে পারলাম না, ‘দেখুন, ১ লাখ বা ৭৫ হাজার টাকা করে শহরতলিতে একটা বাড়ি তুলে অর্ধেক ভাড়া দিয়ে থাকাকে আমি টাকা করা বলি নে।’
খ্যাতনামা বাঙালি মননশীল লেখক ও বিশিষ্ট চিন্তাবিদ নীরদচন্দ্র চৌধুরী (১৮৯৭-১৯৯৭) আজ থেকে অন্তত ৭০ বছর আগে তার একটি বিখ্যাত বইয়ের নামকরণ করেছিলেন ‘আত্মঘাতী বাঙালি’। বইটি পাঠকদের কাছে খুবই সমাদৃত হয়। নীরদ চৌধুরীর লেখা সব বই-ই বলতে গেলে সমানভাবে বিখ্যাত। এই চিন্তাবিদ বাঙালি জাতির মেধা-প্রতিভা-মনন এবং একই সঙ্গে তার লোভ-লালসা ও অপরিপক্বতা-অপরিণামদর্শিতা নিয়ে যে মন্তব্যটি করেছেন, প্রধানত তা-ই আমাকে আজকের লেখাটি তৈরি করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। স্বাধীন দেশে একেকজন ‘বাঙালি’ যেভাবে বলতে গেলে অবাধে হাজার নয়, লাখ নয়, কোটিও নয়। কোটি, শতকোটি, শত শত কোটি, হাজার কোটি, হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে যাচ্ছেন তার কথা বাদই দিলাম। কিন্তু শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীরা? তারাও যে টাকার ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছেন! এত সস্তায় সামান্য কিছু সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে একেকজন কী না করে চলেছেন। আমি জানি না নীরদ চৌধুরী আজ বেঁচে থাকলে তাদের কর্মকাণ্ড ও মতিগতি দেখে কী মন্তব্য করতেন।
n লেখক :অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক
