চিররঞ্জন সরকার
আমাদের দেশে বহুল প্রচলিত ও জনপ্রিয় একটি শব্দ হচ্ছে ‘বাঁশ’। একে অপরের ক্ষতি করার ক্ষেত্রে অথবা উচিত শিক্ষা দিতে ‘বাঁশ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বাঁশ আমাদের দেশের কিছু কিছু মানুষের কাছে খুবই পছন্দের জিনিস। এটা একে অন্যকে দিতে আমরা খুবই দক্ষ। বাঁশ খাওয়া ও দেওয়া ছাড়াও আর কী কী ভালো কাজে এই বাঁশকে ব্যবহার করা যায়, তারই অনুসন্ধানে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি নীলফামারীর ডোমারে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম আঞ্চলিক বাঁশ গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের উদ্বোধন হয়েছে। প্রায় ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট চট্টগ্রাম এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনে দুই একর জমির ওপর কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়েছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শাহাব উদ্দিন এই কেন্দ্র উদ্বোধনকালে বলেন, ‘বাঁশ চাষের সম্প্রসারণ ও ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যে নীলফামারীতে বাঁশ গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি স্থাপন করা হয়েছে। এ কেন্দ্রে সহজ ও সাশ্রয়ী পদ্ধতিতে বাঁশ চাষ, বাঁশ ও বাঁশজাত পণ্যের মান বাড়ানো, বাঁশ সংরক্ষণ করে মূল্যবান ও আকর্ষণীয় পণ্য তৈরিকরণ এবং বাজারজাতকরণের বিষয়ে চাষিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এছাড়া এ কেন্দ্রে বাঁশঝাড় ব্যবস্থাপনা ও রাসায়নিক দ্রব্য প্রয়োগে বাঁশ, কাঠ, ছন ইত্যাদির ব্যবহারিক আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি বিষয়ক প্রশিক্ষণও দেওয়া হবে।’
জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে বাঁশ নিয়ে সরকারি এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আশা-জাগানিয়া। উল্লেখ্য, কাষ্ঠল চিরহরিত্ উদ্ভিদ বাঁশ আসলে ঘাস পরিবারের সদস্য। ঘাস পরিবারের এরা বৃহত্তম সদস্য। বাঁশগাছ সাধারণত একত্রে গুচ্ছ হিসেবে জন্মায়। এক-একটি গুচ্ছে ১০/৭০/৮০টি বাঁশগাছ একত্রে দেখা যায়। এসব গুচ্ছকে বাঁশ ঝাড় বলে।
বাঁশ নিয়ে রয়েছে আমাদের নানা বিভ্রান্তি। ‘সে তাকে বাঁশ দিয়েছে’, ‘আমি বাঁশ খেয়েছি’—এমন সব বাক্যের ভিড়ে বাঁশের আসল গুণ অনেক ক্ষেত্রেই হারিয়ে যায়। অথচ আমাদের দেশের পাহাড়ি অঞ্চলে বাঁশ সত্যি সত্যি খুবই সুস্বাদু একটি খাবার। পাহাড়িরা ইচ্ছে করেই বেশি বেশি বাঁশ খান। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, দৈহিক সুস্থতার জন্য বাঁশ খুবই উপকারী। বিভিন্ন রোগ থেকে খুব সহজেই মুক্তি দিতে বাঁশের কার্যকারিতা অপরিসীম। বাঁশের কোঁড়ল দেহে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে হূদেরাগের ঝুঁকি কমায়; এটি উচ্চ রক্তচাপ কমায় ও ক্যানসারের ঝুঁকিও কমায়; কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে বাঁশের জুড়ি নেই; তাছাড়া হাঁপানি, ডায়াবেটিস, তীব্র জ্বর, মৃগী রোগে মূর্ছা যাওয়া ইত্যাদি নিরাময়েও যথেষ্ট অবদান রাখে বাঁশ। তাই চীনারা বাঁশের কোঁড়লকে ‘স্বাস্থ্যকর খাবারের রাজা’ বলে থাকেন।
শুধু ব্যবহার নয়, বাংলাদেশে কিন্তু বাঁশ উত্পাদনেও বেশ ওপরের দিকে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) গ্লোবাল ব্যাম্বো রিসোর্সেস ২০১৯ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রজাতিবৈচিত্র্য ও উত্পাদনগত দিক বিবেচনায় ৩৩ প্রজাতির বাঁশ নিয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে সারা বিশ্বে অষ্টম স্থানে রয়েছে। ৫০০ প্রজাতির বাঁশ নিয়ে বিশ্বে প্রথম অবস্থানে রয়েছে চীন। ব্রাজিল ২৩২ প্রজাতি নিয়ে রয়েছে দ্বিতীয় অবস্থানে।
বাঁশ দীর্ঘজীবী তৃণজাতীয় উদ্ভিদ। দীর্ঘদেহী বাঁশ নানা প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও নিজের অস্তিত্ব অটুট রাখতে ও বেড়ে উঠতে পারে। বহু ঝড়ঝাপটা বাঁশ সইতে পারে। বাঁশ, বাঁশঝাড়, বাঁশ ডলা, বাঁশ দেওয়া, বাঁশবন, বাঁশরি, বাঁশি-বাঁশসম্পর্কিত নানা নাম, নানাশব্দ আমরা প্রতিনিয়ত শুনে থাকি অরণ্যে নয়, জনারণ্যে, সভায়, মাঠে-ময়দানে। বাঁশ বড়ো সৃজনশীল! ক্রীড়ানৈপুণ্য, রন্ধনশৈলী, যাতায়াত, আবাস, চাষাবাদ, ব্যবসায়, রাজনৈতিক গল্প—কোথায় বাঁশ নেই? কথায় বাঁশ, কাজে বাঁশ। কতভাবেই তো দেওয়া হয়।
এককালে লিখতে গেলেই তো দরকার হতো বাঁশের কঞ্চি দিয়ে কালিতে ডোবানো কলম। স্কুল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পতাকার স্ট্যান্ড বানানো হয় বাঁশ দিয়ে। গ্রামাঞ্চলে বাঁশের গুরুত্ব অপরিসীম। বাঁশি চাই? ঐ তো বাঁশিওয়ালা, হাতে বাঁশের বাঁশি। কৈশোরে মনের সুখে নাটাই হাতে মাঞ্জা দেওয়া সুতোয় বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি রঙিন ঘুড়ি উড়িয়েছি। আবহমানকাল থেকে কুটিরশিল্প-লোকশিল্পে বাঁশের তৈরি হস্তশিল্প আমাদের গ্রামবাংলার ঐতিহ্য। পার্বত্য চট্টগ্রামে দুর্গম বনাঞ্চলের বাঁশই কর্ণফুলী কাগজ কলের মুখ্য কাঁচামাল। তাঁতশিল্প তো বাঁশ ব্যতীত উপায়হীন। বিচিত্র সম্ভার নিয়ে বৈশাখী মেলায়, হাটে-মাঠে-বাটে—কুলা, ডুলা, ঝাঁঝরি, চালুনিসহ বিভিন্ন কৃষ্টি ও ঐতিহ্যবাহী জিনিস কাছে গিয়ে হাতে নিয়ে দেখুন—বাঁশের কী বাহারি ব্যবহার! বাঁশের তৈরি নিত্যব্যবহার্য বিভিন্ন হস্তশিল্প বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। উত্তরা ইপিজেডে তৈরি হচ্ছে বাঁশের কফিন, যা রপ্তানি হচ্ছে ইউরোপে। রপ্তানি হচ্ছে বাঁশের বাঁশি। কাগজ তৈরি হচ্ছে বাঁশ দিয়ে। বাঁশের তৈরি পণ্য পরিবেশবান্ধব হিসেবে বিশ্ব জুড়ে স্বীকৃতি পেয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ মোকাবিলা ও ভূমিক্ষয় রোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বাঁশঝাড়। এমনকি নির্মাণকলায় লৌহদ্রব্যের বদলে বংশদণ্ড ব্যবহারেও আমরা সৃজনশীল ও সাহসী ভূমিকা পালন করেছি।
আমাদের জীবনে বাঁশের ভূমিকা কোথায় নেই? সেই সুদূর আরণ্যক জীবন থেকে গ্রামীণ জনপদে আত্মরক্ষার্থে কি ঝগড়াঝাঁটি কি মারামারিতে বাঁশের লাঠিই শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। গরুর গাড়ি, ঠেলা গাড়ি ও নৌকার মাচা ছিল বাঁশের। নৌকোর তো দাঁড় বা লগি, বইঠা, মাস্তুল, পাটাতন, ছই—সবই বাঁশ দিয়ে তৈরি করা যায়। অনাদিকাল থেকে হিংস্র জন্তু-জানোয়ারের হাত থেকে রেহাই পেতে ভূমি থেকে নিরাপদ উঁচুতে বুনো পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর উপযোগী করে গৃহকৌশল নির্মাণের আদিবাসী মাচাং-টংঘর তৈরি হয় বাঁশ দিয়েই। সমতলেও ঘরবাড়িগুলি বাঁশ ও বাঁশের খুঁটিতে। বাঁশের বাখারি দিয়ে চাল, বেড়ায় তার বাঁশ। কৃষিকাজে রোদ-বৃষ্টিতে চাষির মাথার মাথাল, মাথা থেকে একসঙ্গে পিঠ বরাবর দেহ ঢেকে দেওয়া প্রচ্ছাদন, খেতের বেড়া, মই, বলদের ঘাড়ে জোয়াল, হাতের পাঁচন, পুঁইয়ের মাচা প্রভৃতি—কোনটি বাঁশের নয়। ভাবা যায়, তিতুমীর বাঁশ দিয়ে তৈরি করেছিলেন তাঁর বিখ্যাত দুঃসাহসিক দুর্গ—বাঁশের কেল্লা।
আমাদের শিল্প-সাহিত্যে কান পাতলেই বাঁশির সুর শোনা যাবে। সে কৃষ্ণের বাঁশিই হোক আর প্রেমের বাঁশিই বলি। যখন আজও শুনি—‘বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ঐ’—তখন একাকার হয়ে ওঠা সেই পড়া-শোনা-দেখার কথা মনে পড়ে। সেই বেণুবন আজও একদম শূন্য নয়। মনে পড়ছে কাজী নজরুল ইসলামের বহু প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী সেই উচ্চারণ—‘মম এক হাতে মোর বাঁকা বাঁশের বাঁশরী’। সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে তো বাঁকা করতেই হয়। আর ‘বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়’—এটা যে শুধু কথার কথা নয়।
তবে আমাদের দেশে বাঁশের দৃশ্যমান ব্যবহারের চেয়ে অদৃশ্য ব্যবহার বেশি। কখনো ঐ বাঁশ চাঁচাছোলা, কখনো-বা আছোলা! নানা ধরনের সমস্যা ও সংকটে আকণ্ঠ নিমজ্জিত নাগরিকেরা তীব্র প্রতিযোগিতামূলক সমাজে টিকে থাকতে অহরহ কেউ বাঁশ খাচ্ছে, কারো বাঁশ যাচ্ছে, কেউ বাঁশ দিচ্ছে। এই জাতীয় দেওয়া-নেওয়ায় এই অমূল্য সম্পদ বাঁশের মূল্য বৃদ্ধি না পেলেও বাঁশ শব্দটির ব্যবহারিক গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পেয়েই যাচ্ছে। বলা যায়, সময়ের বিবর্তনে বাঙালি সংস্কৃতিতে বাঁশের ব্যবহারেও অনেক পরিবর্তন এসেছে।
বাংলাদেশে বহু প্রজাতির বাঁশ পাওয়া যায়, যেমন—মূলি, মিতিয়া, ছড়ি, আইক্কা, বাইজা, বররা, মাকাল, তল্লা ইত্যাদি। এই নামগুলো বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের মতো করে দেওয়া। মোটা, চিকন, লম্বা, পুরুত্ব ও ভেতরের ফাঁপা অংশ মিলিয়ে বাঁশের বিভিন্ন নাম ও প্রজাতি ঠিক করা হয়। ব্যবহারের ক্ষেত্রে ও স্বাস্থ্যগত বিচারে স্বাস্থ্যবান, স্বাস্থ্যহীন, রুগ্ণ, শিশু, জীবিত ও মৃত সকল বাঁশই মানুষের জন্য উপকারী। জীবিত ও মৃত, উভয় বাঁশের দেহ দিয়েই মানবজাতি নিজের মতো করে উপকার সেরে নেয়। মানবজীবনের সর্বাবস্থায় যে বাঁশ এত উপকারী, সে বাঁশ এখনো বাংলাদেশের অর্থকড়ি সম্পদের মধ্যে গণ্য হয়নি, এটা বাঁশের প্রতি একটি রাষ্ট্রীয় অবহেলা ছাড়া আর কিছু নয়।
কিছু দিন আগে নির্মাণশিল্পে ‘রডের বদলে বাঁশ’ ব্যবহার নিয়ে দেশব্যাপী হইচই হয়! কিন্তু দুঃখের বিষয় মিডিয়াগুলো বিষয়টিকে নেতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখেছে। শুধু রঙ্গরস করেছে। উদ্ভাবনী ও সম্ভাবনাময় দৃষ্টি নিয়ে বাঁশশিল্পের বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে একটিবারও কথা বলেনি। আসলে বাঁশ জিনিসটা যে অতি প্রয়োজনীয়, সেটা আমরা বুঝেছি শুধু কাউকে বাঁশ দিয়ে নয়, বরং এর বৈপ্লবিক ব্যবহারে।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাঁশ গবেষণা কেন্দ্র উদ্বোধনের মাধ্যমে আমাদের সদাশয় সরকার যে আমাদের জাতীয় জীবনে বাঁশের গুরুত্বকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন, এজন্য আমাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। এই বাঁশ প্রকল্প হাতে নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আসুন, আমরা বাঁশকে সম্মানিত করি এবং নিজেরাও সম্মানিত হই। বাঁশের অদৃশ্য ব্যবহার কমিয়ে ফেলি!
n লেখক :রম্যরচয়িতা
