বিশুদ্ধ পানি নাগরিকদের কাছে পৌঁছে দিতে চাই

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৮:০৮

আন্না মারিয়া লাদোস, মোস্তফা আজিম কাসেম খান আহমেদ ইমতিয়াজ

তিনজন মিলে তৈরি করেছেন প্রতিষ্ঠানটি। সেই তিনজনের আলাদা আলাদা গল্প এখানে তুলে ধরা হলো। যা একত্রিত হয়ে তৈরি হয়েছে ফ্লো-ওয়াটার সল্যুশন

 

মোস্তফা আজিম কাসেম খান : বিশুদ্ধ পানি নাগরিক অধিকার। আমাদের উদ্দেশ্য হলো বিশুদ্ধ পানি বাংলাদেশের নাগরিকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আমরা কয়েক ধরনের সল্যুশন দিই। যেমন—একটা আবাসিক বাসার জন্য সেন্ট্রাল প্রি-ট্রিটমেন্ট আমরা করতে পারি। গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী বাসায় খাওয়ার পানির জন্য পাইপলাইন করে দিই। এসব দায়িত্ব মূলত ওয়াসার হলেও আমার মনে হয় ওয়াসার অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ আছে। যেমন—ওয়াসার পানির পাইপলাইন ও স্যুয়ারেজ পাইপলাইন পাশাপাশিই থাকে। তাই সেখানে যথাসময়ে যদি পাইপগুলো পরিবর্তন করা না হয়, তাহলে স্যুয়ারেজ লাইন থেকে পানি দূষিত হতেই পারে। এমনকি চট্টগ্রামের হালিশহরেও এ ধরনের সমস্যা হয়েছে। সেখানেও আমরা আমাদের পিউরিফিকেশন পদ্ধতি ব্যবহার করেছি। এছাড়া আমাদের পরীক্ষণের ব্যবস্থাও রয়েছে। এর মাধ্যমে সল্যুশন ব্যবহারের আগে ও পরের পানির অবস্থা অনায়াসে নিশ্চিত করতে পারি। সর্বোপরি বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। আমাদের ফোকাসটা আসলে শিল্প-কলকারখানার দিকেই বেশি। আর বিভিন্ন পয়েন্টে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা নিয়ে আমার জানামতে ‘ড্রিংক-ওয়েল’ নামে একটি কোম্পানি ইতোমধ্যেই ওয়াসার সঙ্গে কাজ করছে। ওটাকে সম্ভবত ‘ওয়াটার এটিএম’ বলে। এটা অবশ্যই একটা ভালো উদ্যোগ। যদি এটা নিয়ে আমাদের কাজ করার সুযোগ থাকে, তাহলে অবশ্যই আমরা আগ্রহী। তবে এটা আমাদের মূল ব্যবসার জায়গা নয়।

এবার আসি লোনা পানি প্রসঙ্গে। আমাদের যে পিউরিফিকেশন ট্রিটমেন্ট পদ্ধতি, সেখানে একটা নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত পিউরিফাই করতে পারি এবং করছি। ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে সাতক্ষীরাতেও আমরা এনজিওর মাধ্যমে ছয়টি প্রকল্পের কাজ করেছি। সেখানেও আমরা প্রযুক্তির সহায়তা নিয়েছি। সেখানকার সমস্যা হলো স্যালাইন ওয়াটার। আমরা রিভার ওজমোসিস প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সেখানে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করেছি।

আমি যেভাবে দেখি বা ভাবি সবাই হয়তো সেভাবে ভাববে না। আমার মনে হয়, আমাদের দ্রুত জনসংখ্যা বৃৃদ্ধিই বিশৃঙ্খলার প্রধান কারণ। শুধু জনসংখ্যার দিক দিয়ে নয়, আমাদের জিডিপির দিকে তাকালেও দেখবেন সেটা সাড়ে ৭ শতাংশ, যা এভাবেই থাকবে। এ ধরনের ফাস্ট গ্রোথ এলাকাতে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ অবশ্যই থাকবে। আপনি যদি ঢাকাকে দিল্লি, মুম্বাই বা যেখানে এখানকার মতোই জনসংখ্যা আছে, সেখানকার সঙ্গে তুলনা করেন তাহলে দেখবেন, সেখানের চ্যালেঞ্জগুলোও একই ধরনের। তাই বলব না যে, আমরা ব্যতিক্রম কোনো চ্যালেঞ্জের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। তবে আমাদের চ্যালেঞ্জ আছে যাতায়াত ব্যবস্থাপনায়, আছে নিরাপদ পানিতে। লক্ষ্য করলে দেখবেন, ঢাকায় প্রতিনিয়ত মানুষ আসছে, কিন্তু সেভাবে অবকাঠামো তৈরি করাটা খুব বেশি চ্যালেঞ্জিং, যা কোনো বিদেশি সরকারের পক্ষেও সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।

 

আন্না মারিয়া লাদোস : আমার জন্ম কানাডায়, বিয়ে করি বাংলাদেশে, ২০১৬ সালে। আমি আর আমার বর দুজনেই মিলে ঠিক করি বাংলাদেশে ওয়াটার ফ্লো নিয়ে কিছু একটা করার। সঙ্গে আছে আমাদের আরেক বন্ধু ইমতিয়াজ। কানাডাতে সাত বছর হলো ফ্লো ওয়াটারের যাত্রা শুরু হয়েছে। আর কোনো দেশে তখনো ওরকম কোনো আইডিয়া নিয়ে কাজ শুরু হয়নি। কানাডা থেকে পরে আমরা আমেরিকান কোম্পানি, চাইনিজ কোম্পানি ইত্যাদি কোম্পানির মাধ্যমে আমাদের ফ্লো ওয়াটার মিশন সম্প্রসারিত করি। কারণ এখন ওপেন মার্কেটিং-এর সময়। আইএফসি, ওয়াটার হেল এই কোম্পানিগুলোর সঙ্গেও আমাদের কথাবার্তা আগাচ্ছে। বাংলাদেশে এই মিশনের জন্য আমাদের লক্ষ এনজিওগুলো। কারণ এনজিওগুলো পানি পরিষ্কারকরণ, সংরক্ষণ ইত্যাদির ব্যাপারে গ্রামপর্যায়ে কাজ করে থাকে বাংলাদেশে। এই কাজগুলো খুব ব্যয়বহুল, আর মানুষকে সচেতন করাও কঠিন একটা ব্যাপার। ফ্যাক্টরি, বৃহত্ ইন্ডাস্ট্রি, নগর এলাকায় কাজ করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে সে ক্ষেত্রে। আমাদের দ্বিতীয় লক্ষ্য হচ্ছে ইন্ডাস্ট্রি। পানি নিয়ে আমার কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাছাড়া পানি নিয়ে কাজ করার ওপর ইতিমধ্যে আত্মবিশ্বাসটাও তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে পানি নিয়ে এরকম কাজ করার পেছনে কয়েকটি কারণ আছে। এখানে ক্লিন ওয়াটার একটা ফ্যাক্ট। আর গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটি হলো বাংলাদেশের পানিতে আর্সেনিক সমস্যা। টেক্সটাইল কোম্পানিগুলো পানি যেভাবে দূষণ করছে, সে কারণে আমার মনে হলো—এই দেশে পানির ওপর টাকা লগ্নি করা যেতে পারে। প্রথমত গুলশান এলাকা থেকে আমাদের কাজ শুরু। বিশেষত যেখানে যেখানে পানির পাইপে লিক আছে। অনেকের আমাদের কাছে অনুরোধও ছিল এখানে কাজ করা নিয়ে। তারপর যেমন চট্টগ্রামে আমাদের অফিস রয়েছে। কিন্তু যোগাযোগের বাধাগুলো এখনো আমরা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারিনি ঠিকমতো। ডিস্ট্রিবিউশন-সিস্টেম যেটা আছে, সেটা আমাদের বিজনেসের জন্য অনেক বেশি ব্যয়বহুল। চট্টগ্রামে আমাদের অফিস কাজ করে যাচ্ছে ১০ বছর যাবত্ একটানা। তাদের যোগাযোগব্যবস্থা অনেক ভালো। আমি খুশি। বাংলাদেশে ওয়াটার নিয়ে কাজ করা অনেক প্রতিষ্ঠান থাকলেও আমাদের ফ্লো ওয়াটারের বিশেষত্ব হলো—এটা একটা আন্তর্জাতিক মানের বৃহত্ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পার্টনারশিপে কাজ করে চলেছে। আমরা আসলে ওয়াটার কোম্পানি না, আমরা ইঞ্জিনিয়ারিং সাপোর্ট কোম্পানি। আমরা ওয়াটার নয়, বিক্রি করি টেকনোলজি। ড্রিংকিং ওয়াটার এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল সলিউশনগুলো আমরা দিচ্ছি। ওয়াইড রেঞ্জ টেকনিক্যাল সলিউশনে কাজ করার অনেক সুযোগ রয়েছে এখানে। এটা মূলত ভিন্ন ধরনের সমাধান। ডাচ ডেভেলপমেন্টের সঙ্গে যৌথভাবে আমরা একটা সেমিনার করেছি—প্রাইভেট ও পাবলিক ইকোনোমিক জোনের ওপর আমরা জোর দিয়েছি। কারণ পানি-সংক্রান্ত বড় একটা অবকাঠামো দরকার বাংলাদেশে। ওয়েসেস অব দ্য ট্রিটমেন্ট, সুইচ টিট্রমেন্ট, লার্জ স্কিল ওয়াটার টিট্রমেন্ট—এই দেশের মানুষদের আমরা এই সুবিধাগুলো দিতে চাই। সে জন্য লাগবে মিটার কিউব চার্জ। পাওয়ারে যেমন একটা টেরেস থাকে। ওই জায়গাতেই একটা ওয়াটার টেরেস থাকবে। সেখানে মিটার কিউব বসানো থাকবে।  সে অনুযায়ী আমরা বিল নেব। দশ কোটি টাকা দিয়ে একটা পাওয়ার প্লান্ট বসানোর বদলে গ্রাহক আমাদের কাছ থেকে নেবে ভলিউম। সেভাবে চার্জ পরিশোধ করবে।

আহমেদ ইমতিয়াজ : আমরা কেন অন্য কোম্পানি থেকে ভিন্ন, সে জায়গা থেকে যদি বলি—আমরা কিন্তু হঠাত্ করে শুরু করিনি। আমরা পুরো কমিউিনিটি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে একদম গ্রামপর্যায় থেকে কাজ শুরু করেছি। ফ্লো ওয়াটার আসার পেছনে কারণ হলো—ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান। আমরা যে জায়গাটাকে ফোকাস করতাম, সেটা হলো—রুরাল কমিউনিটিতে কীভাবে পুরো কমিউনিটির জন্য খাবার পানি সরবরাহ করা যায়। কীভাবে আমরা ইক্যুপমেন্ট সেলসের দিকে যেতে পারি। আমরা ওয়াটার প্ল্যান বানিয়ে দিতে পারব, ঠিক আছে, কিন্তু যাদের এরকম ওয়াটার ট্রিটমেন্ট দরকার—তাদেরকে আমরা কীভাবে সেবাটা দিতে পারি। ওখান থেকে আমরা রিয়েল এস্টেটে দেখালাম, তারা আইডিয়াটা পছন্দ করল। আমাদের কাছে অনুরোধও আসা শুরু হলো। তারপর আমরা মার্কেটিং করা শুরু করি। বিদেশে একটা কনসেপ্ট আছে, আপনি কল থেকে সরাসরি পানি খেতে পারবেন। আমাদের দেশে পাঁচ তারকা হোটেলগুলোতে এরকম সুবিধা আছে। আমরা দেখলাম আমাদের দেশে এত আধুনিক অ্যাপার্টমেন্টের বিল্ডিং হচ্ছে—আমরা কেন এটাকে একটা ফিচার হিসেবে দেখছি না! ওখান থেকে এই গ্রিন বিল্ডিং ধারণাটাও এল। ওখানে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান বিক্রি হওয়া শুরু হলো। আমরা ফোকাস করা শুরু করলাম পানিতে কীভাবে অকটিমাম ব্যবহার করা সম্ভব। তারপর পানিকে কীভাবে রিসাইক্লিং করা যায় সেটা নিয়েও আমরা ভাবছি। আমাদের রান্নঘরের পানি, গোসলখানার পানি—এগুলোকে আমরা রিসাইক্লিং করে বাথরুম ফ্ল্যাশে ব্যবহার করতে পারি। বৃষ্টির পানিকে রিসাইকেল করা যেতে পারে। আমরা প্রকৃতি থেকে পানি পাই বলে পানির মূল্য বুঝি না। যেমন কেপটাউনে পানির এতই ক্রাইসিস যে, ওরা ডিসেলাইনেশন প্ল্যান করে সমুদ্রের পানি খাওয়ার চিন্তা করছে। বোতল পানি বা পিউরিফাই পানির কথা একসময় কেউ চিন্তা করেনি আগে। এখন তার বিশাল মার্কেট। পানি যে একটা ট্রিটমেন্টের জিনিস—এই জিনিসটা মানুষের মধ্যে পৌঁছাতে পারাতে ফ্লো ওয়াটারের সার্থকতা। ওয়াসাও পানি নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু যে পাইপ দিয়ে পানি আসে, সেই পাইপে আসতে আসতে জার্মের কারণে সে পানি আর ভালো থাকে না। আর আমাদের পানি রিজার্ভার নট ফুড গ্রেড। পানিবান্ধব নয়। হাউজহোল্ডের জন্য ফুল ফ্লেজেড সিক্স স্টেজ পিউিরিফিকেশনের দরকার হয় না। গোসলের পানির কোয়ালিটি না হলেও চলে। কিন্তু খাবার পানির জন্য আমরা সেন্ট্রালি একটা ট্রিটমেন্ট বসিয়ে দিতে পারি। ওখান থেকে বিপণন হতে পারে। এবং তা করার জন্য সরকারের বড় রকম একটা সহযোগিতার প্রয়োজন আছে।

 

আন্না মারিয়া লাদোস : কো ফাউন্ডার ও চেয়ারম্যান

মোস্তফা আজিম কাসেম খান :ব্যবস্থাপনা পরিচালক

আহমেদ ইমতিয়াজ :পরিচালক