বিদ্যাভুবনের আলোকমুখী শিক্ষাপদ্ধতি

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৮:০৬

আমরা ক্ষুদ্র পরিসরে নেত্রকোনা জেলার নিভৃত পল্লি কাচিয়াকান্দা গ্রামে শুরু করেছি নিজের দিকে ফিরে তাকাতে শেখানোর ভিন্নধারার একটি শিক্ষাকার্যক্রম। যাকে আমরা বলছি, আত্মসচেতন শিক্ষাকার্যক্রম। এই শিক্ষাকার্যক্রম সম্বন্ধে কিছু বলার আগে এর পেছনের গল্পটা শেয়ার করা প্রয়োজন বলে মনে করছি।

দীর্ঘ এক লেখালেখির পরিকল্পনা নিয়ে আমি ঢাকা ছাড়ি ২০০৩ সালে। লেখাটির জন্য আমার প্রয়োজন ছিল নিরবিচ্ছিন্ন একাগ্রতা এবং নীরবতা। প্রথমে সে কাজের উপযুক্ত পরিবেশ হিসেবে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করি গারো পাহাড়ে। সেখানে তেমন সুবিধা করতে না পেরে আমার মায়ের সহায়তায় ২০০৪ সালে আমি সুস্থির হই পতিত পৈতৃক ভিটা কাচিয়াকান্দায়। শিশুকাল থেকেই নিজ শেকড় থেকে আমি বিচ্ছিন্ন ছিলাম। লেখালেখির ওই সময়টাতে বলতে গেলে আমি সমাজবিচ্ছিন্ন ছিলাম; কিন্তু আমাকে ঘিরে ছিল আমার গ্রামের নিষ্পাপ শিশুরা। আমি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পেয়েছি গ্রামের হতদরিদ্র মানুষদের জীবনপ্রণালী—বিশেষ করে স্বপ্ন-সম্ভাবনাহীন অসহায় পরিবারের শিশুদের। আমার চারপাশের সব মানুষদের মধ্যে যে কমন বিষয়টি আমার অনুভূতিকে নাড়া দিয়েছিল সেটা হচ্ছে তাদের অসহায়ত্ব। যেটা আমি ভেতর থেকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারিনি। অপার সম্ভাবনার আধার মানুষ কেন অসহায়ত্ববোধে পীড়িত হবে? ওদের অসহায়ত্ববোধ আমাকেও পীড়িত করেছে দীর্ঘদিন, যতদিন না আমি অনুধাবন করতে পেরেছি বংশপরম্পরায় অসচেতনতায় বুঁদ হয়ে থাকাই এই দুর্দশার মূল কারণ। অসচেতনতা থেকে সৃষ্ট অসহায়ত্ববোধ যেমন মানুষকে স্বপ্নহীন করে দেয় তেমনি মানুষ হিসেবে মানুষের সত্যিকারের মূল্য বা মর্যাদাবোধকেও নষ্ট করে দেয়।

প্রায় পাঁচ বছরেরও অধিক সময় ধরে লেখা আমার দর্শন-উপন্যাস ‘নুহূলের মনোচিত্র’-এর অন্যতম তাড়না আত্ম-অনুসন্ধান, আত্ম-অনুসন্ধানের মাধ্যমে জীবনের অপরিমেয় সম্ভাবনা এবং অন্তর্নিহিত সত্যকে খুঁজে পাওয়ার প্রচেষ্টা।

আমার নিজগ্রামে এই বাস্তবচিত্র পর্যবেক্ষণ করার পর আমি আবার নিজের মুখোমুখি হই এবং নতুন আত্ম-উপলব্ধি ঘটে—নিষ্প্রাণ কাগজে জীবনবোধ রচনা করার চেয়ে আমার চারপাশের নিষ্পাপ শিশুদের মনের সাদা পাতায় সত্যিকারের জীবনবোধ জাগ্রত করা, মর্যাদাবান মানুষ হিসেবে দাঁড়ানোর স্বপ্ন রচনা করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আর নিজের দিকে ফিরে তাকাতে শেখানোই এই কাজের মূল লক্ষ্য। আমি স্থায়ীভাবে থেকে গেলাম আমার পৈতৃক গ্রাম কাচিয়াকান্দায়। শুরু হলো আমার গ্রামের শিশুদের নিয়ে আত্মসচেতনতামূলক অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকার্যক্রম।

২০০৯ সাল থেকে ২০১৫—এই ছয় বছর অনেক চড়াই-উতরাই, অনিশ্চয়তা, তিক্ত অভিজ্ঞতার কণ্টকময় পথ পেরিয়ে অবশেষে ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বিদ্যাভুবন। আমার পুঁজি ছিল আত্মসচেতন শিক্ষা নিয়ে কিছু ভাবনা, স্বপ্নপিপাসু কিছু শিশু-কিশোর এবং পৈতৃক জমিজমা। স্কুল প্রতিষ্ঠা করার জন্য শুরু থেকেই পাশে দাঁড়ান দুই জন স্থপতি বন্ধু—স্থপতি নাইম আহমেদ কিবরিয়া এবং স্থপতি খালিদ আহমেদ খান। অকৃপণভাবে আর্থিক এবং আরো আনুষঙ্গিক সহায়তা ছাড়াও স্কুল পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির দায়িত্ব নেন স্থপতি খালিদ আহমেদ খান এবং স্কুল নির্মাণ-নকশার দায়িত্ব নেন স্থপতি নাইম আহমেদ কিবরিয়া। পরবর্তীসময়ে আরো বেশ কয়েকজন শুভাকাঙ্ক্ষী এই উদ্যোগের পাশে এসে দাঁড়ান। সকলের সম্মিলিত সহায়তায়ই চলছে বিদ্যাভুবন। দেশীয়, সহজলভ্য এবং পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার করে প্রথমভাগে নির্মিত হয় তিনটি স্কুলগৃহ, যার নির্মাণশৈলীতে বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ ঐতিহ্যের সন্ধান মেলে। নির্মল প্রাকৃতিক পরিবেশ বেষ্টিত এ অঞ্চলের জলবায়ু এবং সংস্কৃতির সাথে স্কুলটি যেন একাত্মতা প্রকাশ করছে।

কাচিয়াকান্দা ছাড়াও আরো ছয়টি গ্রামের শ’খানেক পরিবার থেকে শিশুরা পড়তে আসে বিদ্যাভুবনে। ভোরের সূর্য ওঠার পর থেকেই পাখির কিচিরমিচির শব্দে গুটিগুটি পায়ে শিশুরা আসতে থাকে স্কুলপ্রাঙ্গণে। পবিত্র প্রার্থনাগৃহের মতো বাইরে জুতা রেখে কচি পায়ের পদচারণায় মুখরিত হতে থাকে শ্রেণিকক্ষের কাঠের মেঝেগুলো। শ্রেণিশিক্ষকরা প্রতিটা শিশুর হাত-পায়ের নখ থেকে শুরু করে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং ফিটনেস খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন। শিশুরা নির্দিষ্ট নিয়ম-ছন্দ অনুসরণ করে ক্রমান্বয়ে প্রাণায়াম, যোগ ব্যায়াম, আত্ম-প্রত্যয়ন, মেডিটেশন এবং অন্যান্য নির্ধারিত কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে। আত্ম-জাগরণ নামে এই ক্লাসটি দিয়েই শুরু হয় বিদ্যাভুবনের নিয়মিত স্কুলকার্যক্রম।

আত্মসচেতনতা আত্ম বা নিজের প্রতি সচেতনতা। এই আত্ম বা নিজ বলতে শুধু এই দেহ-সর্বস্ব আমি নই; দেহ বা নিজ শরীরের প্রতি সচেতনতাসহ, নিজের মনের প্রতি সচেতনতা, নিজ সংস্কৃতির প্রতি সচেতনতা, নিজ অস্তিত্বের কারণ এই পরিবেশের প্রতি সচেতনতা এবং নিজের অদেখা ভেতরের সত্য তথা অন্তর-আত্মার প্রতি সচেতনতা। এই পাঁচটি ক্ষেত্রের সচেতনতার সমন্বয়ই আত্মসচেতনতা। বিদ্যাভুবনে শিক্ষার্থীদের আত্মসচেতন শিক্ষাকার্যক্রমে বাংলাদেশ সরকারের নির্ধারিত পাঠ্যসূচি অনুসরণের পাশাপাশি উপরোক্ত এই পাঁচটি দিকের সচেতনতার শিক্ষা আমরা সমান গুরুত্বসহকারে দেওয়ার চেষ্টা করি।

পাঠ্যবইয়ের শিক্ষাকে বাস্তবমুখী এবং শিক্ষার্থীদের আরো সৃজনশীল করার জন্য আমরা থিয়েট্রিক্যাল ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করি। আত্মসচেতন কার্যক্রমে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাগ্রহণ পদ্ধতিটিকে আমরা বলছি সিসিএলএস (Creative & Communication Learning System)। এই পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনাকে সত্যিকার অর্থে সৃজনশীলভাবে বাস্তবতার সাথে সংযোগ ঘটানোর প্রয়াস পায়। এতে শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাসের ভিত মজবুত হওয়ার সাথে সাথে জ্ঞানের মূল রস আস্বাদনও সহজ হয়।

একজন সচেতন মানুষের জ্ঞানার্জনের জন্য আত্মজ্ঞান, পুঁথিগত জ্ঞান এবং বাস্তবিক জ্ঞান—এই তিনটি ধারার সমন্বয় হওয়া উচিত। আত্মসচেতন শিক্ষাকার্যক্রমে আমরা চেষ্টা করছি এই তিনটি ধারার জ্ঞানার্জনের প্রক্রিয়ার সমন্বয় ঘটাতে। বিদ্যাভুবনে আমরা বাস্তুবিদ্যা নামে একটি স্বতন্ত্র বিভাগ চালু করেছি, যেখানে শিক্ষার্থীরা আত্মজ্ঞান এবং পুঁথিগত জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি হাতে কলমে পরিবেশ উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কাজ করে থাকে। শিক্ষার্থীরা স্কুলে প্রতিদিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ পরিবেশ উন্নয়নমূলক বিভিন্ন মডেল প্রজেক্টে কাজ করে। স্কুল থেকে অর্জিত জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে স্কুল নির্ধারিত পারিবারিক প্রকল্পে কাজ করার পাশাপাশি প্রতিমাসে একবার পরিবেশ উন্নয়নমূলক সামাজিক অভিযানেও অংশগ্রহণ করে। আমরা চেষ্টা করছি শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিশুকাল থেকেই এভাবে পরিবেশ ও সমাজসচেতনতার উন্নয়ন এবং দায়িত্বশীলতার প্রসার ঘটাতে। 

বিদ্যাভুবনে শিক্ষার্থীরা নিজেদের সংস্কৃতির প্রতি সচেতনতাসহ নিজের ভেতরে লুকায়িত সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশেরও সুযোগ পায়। সপ্তাহে একদিন প্রতি বৃহস্পতিবার শিক্ষার্থীরা সব ধরনের বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনা থেকে মুক্ত থাকে। ওই দিন ছবি আঁকা, সৃজনশীল লেখালেখি, গান, আবৃত্তি, চারুকারু ইত্যাদির ক্লাসসহ নিজেদের সৃজনশীল কাজ-কর্মগুলো উপস্থাপনের সুযোগ পায়। দিন শেষে নিজেরাই তাদের কাজের মূল্যায়ন এবং শিল্প-সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে।

আমি মনে করি, একটি বিদ্যালয়ের শুধু শিক্ষাদানপদ্ধতি আদর্শ মানের হলেই যে তার সকল শিক্ষার্থী আদর্শ মান অর্জন করতে পারবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই যদি তিনটি আদর্শের সুসমন্বয় না ঘটে। এ তিনটি আদর্শ হলো—আদর্শ শিক্ষাপদ্ধতি, আদর্শ শিক্ষক এবং আদর্শ অভিভাবক। আদর্শ শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং আদর্শ শিক্ষক বিদ্যালয়ের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে, কিন্তু আদর্শ অভিভাবক বা আদর্শ পরিবার? আত্মসচেতন শিক্ষাকার্যক্রম শুধু বিদ্যালয় আঙিনায় আবদ্ধ নয়, একজন আদর্শ আত্মসচেতন শিক্ষার্থী তৈরিতে প্রতি মাসে এক বা একাধিকবার পরিবার পরিদর্শন এবং অভিভাবক সমাবেশের মাধ্যমে আদর্শ পরিবারের কাঠামো নির্মাণেও বিদ্যাভুবন কাজ করে যাচ্ছে।

মাত্র তিন বছরে আত্মসচেতন শিক্ষাকার্যক্রমের মাধ্যমে যে ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে তা আমাদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে।

পুরো কমিউনিটিতে শিশুদের সবচেয়ে বড় যে প্রতিফলন ঘটছে তা হলো, তাদের নৈতিকতা এবং আচার-ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। স্বাস্থ্যসচেতনতা তথা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায়ও দৃষ্টান্তমূলক পরিবর্তন ঘটেছে। শিশুদের সাংস্কৃতিক এবং সৃজনশীলতার চর্চার উল্লেখযোগ্য সুযোগ এবং সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিদ্যাভুবন প্রবর্তিত ‘আদর্শ পরিবারের কাঠামো নির্মাণ’ কার্যক্রমের ওপর প্রতিটা শিশুর পরিবারে আশাপ্রদ পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। 

২০১৬ সালে বিদ্যাভুবন স্কুল স্থাপত্য নির্মাণশৈলীর জন্য আইএবি (Institute of Architect Bangladesh) পুরস্কারে ভূষিত হয়। ২০১৬ এবং ২০১৮ সালে ঢাকা লিট ফেস্টিভ্যালে বিদ্যাভুবনের শিশুদের উপস্থাপনা দেশি-বিদেশি দর্শকদের সামনে ব্যাপক সুনাম অর্জন করে।

টরেন্টো অধিবাসী চলচ্চিত্র নির্মাতা নাদিম ইকবাল নির্মিত আত্মসচেতন শিক্ষাকার্যক্রমের ওপর ডকুমেন্টারি ফিল্ম ‘বিদ্যাভুবন’ ইতিমধ্যে দেশ-বিদেশের দর্শক এবং বোদ্ধা সমালোচকদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছে।

আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে মহামতি সক্রেটিস নিজেকে জানার যে শিক্ষা অর্থাত্ আত্মসচেতন হওয়ার যে শিক্ষার দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন তা আজো বিভিন্নভাবে বিভিন্ন ভাবধারার মধ্য দিয়ে চর্চিত হচ্ছে। ক্ষুদ্র পরিসরে এক নিভৃত পল্লিতে যে দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা আত্মসচেতন শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামো নির্মাণের চেষ্টা করছি, আমার জানামতে, অন্তত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থায় আত্মসচেতনতাকে এভাবে পৃথিবীর কোথাও এখনো পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

আত্মসচেতন শিক্ষাপদ্ধতিকে একটি মডেল হিসেবে দাঁড় করানোই আমাদের মূল লক্ষ্য। আমরা বিশ্বাস করি, নতুন প্রজন্মের সংকট নিরসনে এবং আলোকমুখী জাতি নির্মাণে এ শিক্ষাপদ্ধতিটি একসময় কার্যকরী ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে।

 

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, বিদ্যাভুবন