ভাওয়াল রাজের সন্ধানে

আপডেট : ০১ মার্চ ২০২০, ১৭:৩৭

ভাওয়াল এস্টেটের রাজবাড়ি দেখে প্রথমে হতাশ হয়েছি খানিকটা। আয়তনে এটি এক সময়ে ছিল দেশের সবচেয়ে বড় রাজবাড়ি। এস্টেটে কয়েকটি দালান মিলিয়ে সাড়ে তিনশ’রও বেশি কক্ষ ছিল এককালে, অথচ এখন বেদখল আর নষ্ট হতে হতে অবশিষ্ট আছে হাতেগোনা অল্প কিছু কক্ষ। সেগুলো সরকারি কাজে ব্যবহার হচ্ছে এখন। তবে ভাওয়াল এস্টেটের মন্দিরটি এখনও দারুণ আছে

মুহসিনা মিঠা

 

সপ্তাহে ৬ দিন টানা ক্লাস করে ক্লান্ত আমি তাই শুক্রবারগুলোতে হুটহাট দৌড় দেওয়ার চেষ্টা করতাম কাছে কোথাও। তেমনি এক শুক্রবার গিয়েছিলাম গাজীপুরের ভাওয়াল এস্টেটে।

ভাওয়াল এস্টেটের কুমার রমেন্দ্র নারায়ণ ও তাকে নিয়ে চলা সুদীর্ঘ ১৬ বছরের চাঞ্চল্যকর মামলার কথা আমরা সবাই কমবেশি অনেক পড়েছি, শুনেছি। তার সেই কাহিনির ওপর উত্তম কুমারের বিখ্যাত ‘সন্ন্যাসী রাজা’ এবং হালের জনপ্রিয় সৃজিত মুখার্জির ‘এক যে ছিল রাজা’ সিনেমাটিও দেখেছেন অনেকে। তবু ভাওয়াল রাজের কাহিনি সংক্ষেপে একবার বলে নিচ্ছি।

ভাওয়াল এস্টেটের জমিদার রাজেন্দ্র নারায়ণ রায়ের ছিল তিন ছেলে। রমেন্দ্র, রণেন্দ্র আর রবীন্দ্র। তিন ভাই মিলে বাবার বিশাল জমিদারি তদারকি করতেন। তবে মেজো ছেলে রমেন্দ্র নারায়ণ শিকার ও নারী সংসর্গে সময় কাটাতে বেশি পছন্দ করতেন। এভাবে ভালোই চলছিল সবকিছু, এর মাঝে ১৯০৯ সালে তিনি জানতে পারেন তার সিফিলিস হয়েছে এবং এর চিকিত্সা করার জন্য তিনি দার্জিলিংয়ে যান। সেখানেই মে মাসের ৭ তারিখে ২৫ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। সেসময়ে দার্জিলিং এই তাকে দাহ করে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান পালন করা হয়।

রমেন্দ্র নারায়ণের বিধবা স্ত্রী বিভাবতী দেবী তখন ভাই সত্যেন ব্যানার্জির সঙ্গে ঢাকায় চলে যান। কয়েক বছরের ব্যবধানে ভাওয়াল এস্টেটের মালিক অন্য দুই ভাইয়েরও মৃত্যু ঘটে। সেই সময়ের ঔপনিবেশিক শাসকদের আইন অনুযায়ী বিধবা স্ত্রীরা সেই জমিদারির মালিকানা গ্রহণ করে। মূল ঘটনার সূত্রপাত হয় এরপর থেকে।

তিন বিধবা স্ত্রী জমির মালিকানা লাভের কয়েক বছর পর শোনা যেতে থাকে যে, রমেন্দ্র নারায়ণকে নাকি জীবিত দেখা গেছে। রমেন্দ্র নারায়ণের বোন জ্যোতির্ময়ী এ কথা শোনার পর এই ব্যাপারে খোঁজ করতে শুরু করেন।

১৯২০-২১ সালের দিকে ঢাকার বাকল্যান্ড বাঁধের কাছে সর্বাঙ্গে ছাই মাখা এক সন্ন্যাসীর আবির্ভাব ঘটে। সুঠাম দেহের অধিকারী হওয়ায় তিনি এলাকার সবার নজর কাড়েন। ভাওয়াল এস্টেটের প্রজাদের কেউ কেউ তাকে দেখে গুজব রটায় যায় যে, রামেন্দ্র নারায়ণ ফিরে এসেছেন। পরে স্থানীয় ব্যক্তিরা এই সন্ন্যাসীকে হাতিতে করে জয়দেবপুরে ভাওয়াল এস্টেটে পাঠিয়ে দেন ১৯২১ সালের ১২ এপ্রিল।

পরের কয়েক দিনে বোন জ্যোতির্ময়ী ও অন্যান্য আত্মীয়রা তাকে দেখে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, এই ব্যক্তিই রমেন্দ্র নারায়ণ। এই অবস্থায় ১৯৩০ সালের ২৪ এপ্রিল ভাওয়াল সন্ন্যাসী ও তার বোনের আইনজীবীরা ভাওয়াল এস্টেটের সম্পত্তির অধিকার চেয়ে রমেন্দ্র নারায়ণের বিধবা স্ত্রী ও অন্যান্য মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করেন। জেলা জজ অ্যালান হেন্ডারসন বিচারপতি পান্নাবল বসুকে এই মামলার বিচারে নিয়োগ করেন। বিচার শুরু হয় ১৯৩৩ সালের ৩০ নভেম্বর।

চাঞ্চল্যকর এই মামলায় একপক্ষে ছিলেন ভাওয়াল এস্টেটের তিন বিধবা স্ত্রী, অন্যদিকে রমেন্দ্র নারায়ণের বোন এবং আত্মীয়রা। বিবাদীপক্ষের আইনজীবীরা প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, এই সন্ন্যাসী নিরক্ষর এবং নিরক্ষর একজন সন্ন্যাসী কোনো অবস্থাতেই ব্রাহ্মণ বর্ণের হতে পারে না। কিন্তু বাদীপক্ষের আইনজীবীরা প্রমাণ করে দেখান যে, কুমার রমেন্দ্র নারায়ণও প্রায় নিরক্ষর ছিলেন।

রাজার বোন জ্যোতির্ময়ী দেবী দাবি করেন, সন্ন্যাসীর চলনে ও গড়নে তাদের বংশের ছাপ রয়েছে। অপরদিকে স্ত্রী বিভাবতী দেবী তার স্বামীর চেহারা কিম্বা চলনে সন্ন্যাসীর সঙ্গে কোনো মিল নেই বলে সাক্ষ্য দেন। আদালতে সন্ন্যাসী রাজপরিবারে ঘটে যাওয়া কিছু গোপন কাহিনি বলেন, কিন্তু জমিদারবাড়ির কাহিনি কোনো দাসী মারফত বাইরের যে কেউই জেনে থাকতে পারে এই বলে তার স্ত্রীর উকিল তা নাকচ করে দেয়।

যেহেতু সিফিলিসে আক্রান্ত রাজার স্মৃতি অনেকখানি লোপ পেয়েছিল, শারীরিক চিহ্ন ছাড়া আর কোনোকিছু ছিল না, যা দিয়ে তাকে রাজা রমেন্দ্র নারায়ণ প্রমাণ করা সম্ভব হতো। রাজার বোন, স্ত্রী, রাজার ঘনিষ্ঠ নর্তকি সবার কাছ থেকে তথ্য নিয়ে অবশেষে ফরেনসিক ডাক্তাররা সন্ন্যাসী ও রাজার মাঝে মোট ২১টি শনাক্তকরণ চিহ্ন খুঁজে পান এবং নিশ্চিত হন তিনিই হারিয়ে যাওয়া ভাওয়াল রাজ।

অবশেষে রোমাঞ্চকর এই মামলার রায় হয় ১৯৩৬ সালের ২৪ আগস্ট। ৫ বছর ধরে চলা এই মামলার রায় জানতে আদালত পাড়ায় বিশাল জনসমাগম হয়। মামলার রায় দেওয়ার পরেই পান্নাবল বসু বিচারকের পদ থেকে অবসর নেন। পরে মামলার রায় প্রত্যাখ্যান করে স্ত্রী বিভাবতী বসু লন্ডন প্রিভি কাউন্সিলে মামলা করেন। প্রায় ১০ বছর পর ১৯৪৬ সালে প্রিভি কাউন্সিলেও সন্ন্যাসীই যে হারিয়ে যাওয়া ভাওয়াল রাজ এই পক্ষে রায় দেয়। দুই দফায় চলা ১৬ বছরের মামলায় অবশেষে বোন জ্যোতির্ময়ী ও সন্ন্যাসী রাজার পক্ষ জয়লাভ করে।

ফরেনসিক মেডিসিনের ইতিহাসে রাজা রমেন্দ্র নারায়ণের এই মামলাটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। লন্ডন প্রিভি কাউন্সিলে রায় হওয়ার পর পৃথিবীজুড়ে বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে এই মামলাটি।

ভাওয়াল এস্টেটের রাজবাড়ি দেখে প্রথমে হতাশ হয়েছি খানিকটা। আয়তনে এটি এক সময়ে ছিল দেশের সবচেয়ে বড় রাজবাড়ি। এস্টেটে কয়েকটি দালান মিলিয়ে সাড়ে তিনশ’রও বেশি কক্ষ ছিল এককালে, অথচ এখন বেদখল আর নষ্ট হতে হতে অবশিষ্ট আছে হাতেগোনা অল্প কিছু কক্ষ। সেগুলো সরকারি কাজে ব্যবহার হচ্ছে এখন। তবে ভাওয়াল এস্টেটের মন্দিরটি এখনও দারুণ আছে। এটা একবার দেখেই মন ভালো হয়ে যায়।