গাইবান্ধা-১: উন্নয়ন চান শামীম, গণতন্ত্র ফেরাতে মরিয়া মাজেদুর

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ২০:৪৫

একদিকে জাপা চেয়ারম্যান এরশাদের রাজনৈতিক উপদেষ্টা বর্তমান শামীম হায়দার পাটোয়ারি। আরেকদিকে জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মাজেদুর রহমান। দুইজনই নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন।

একজন উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে মহাজোটের লাঙ্গলে, অপরজন গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে ধানের শীষে ভোট চাইছেন। এই দুই প্রার্থীর প্রচারণায় আগামী ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের নির্বাচন ক্রমেই জমে উঠছে।

গোটা উপজেলা প্রতীক সম্বলিত পোস্টারে ছেয়ে গেছে। এখানে মোট ১১ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অন্য প্রার্থীরা হলেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী আফরুজা বারী (আপেল), গণতন্ত্রী পার্টির আবুল বাসার মো. শরীতুল্যাহ (কবতুর), স্বতন্ত্র প্রার্থী (এমপি লিটন হত্যা মামলার প্রধান আসামী) মো. আব্দুল কাদের খাঁন (মটরগাড়ি), স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. এমদাদুল হক (কুড়াল), ইসলামী আন্দোলনের আশরাফুল ইসলাম খন্দকার (হাতপাখা), বাংলাদেশ মুসলিম লীগের গোলাম আহসান হাবীব মাসুদ (হ্যারিকেন), গণফ্রন্ট এর শরিফুল ইসলাম (মাছ), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মো. হাফিজুর রহমান সর্দার (বটগাছ) ও বাম গণতান্ত্রিক জোট সমর্থিত বাসদের গোলাম রব্বানী শাহ (মই)। এরমধ্যে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী আফরুজা বারী গত ২৪ ফেব্রুয়ারি লাঙ্গলকে সমর্থন দিয়ে সরে দাঁড়িয়েছেন। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী (এমপি লিটন হত্যা মামলার প্রধান আসামি) সাবেক সেনা কর্মকর্তা  মো. আব্দুল কাদের খাঁন (মটরগাড়ি) রয়েছেন জেলহাজতে।

ফলে মাঠে এখন ৯ প্রার্থী। কিন্তু তাদের নাম ভোটারদের নির্বাচনী আলোচনায় শোনা যাচ্ছে না। তাই এই আসনে ঐক্যফন্ট সমর্থিত জামায়াত প্রার্থী ও মহাজোট সমর্থিত জাপার প্রার্থীর মধ্যেই মুল লড়াই হবে বলে শোনা যাচ্ছে। 

আওয়ামী লীগের একাধিক নেতাকর্মী জানান, ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগ থেকে শামসুল হক নির্বাচিত হয়েছিলেন। ওই নির্বাচনের পর থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত মুল জাতীয় নির্বাচনে শুধু একবার আওয়ামী লীগ প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছিলেন। অর্থাৎ ২০১৪ সালে (৫ জানুয়ারির নির্বাচন) আওয়ামী লীগের টিকিটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন মনজুরুল ইসলাম লিটন। এ ছাড়া সকল জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তৃতীয় স্থানে ছিল। এদিকে ১৯৭৩ সালের পর থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে এই আসনে জামায়াত দলীয় প্রার্থী মওলানা আবদুল আজিজ ওরফে ঘোড়ামারা আজিজ (বর্তমানে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক) সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

২০০৮ সালে নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির প্রার্থী ও সংসদ সদস্য লিটন হত্যার মুল পরিকল্পনাকারী সাবেক সেনা কর্মকর্তা আবদুল কাদের খান। এরআগে ১৯৯১ জাতীয় পার্টির হাফিজার রহমান প্রমানিক ও ১৯৯৬ সালে একই দলের ওয়াহেদুজ্জামান সরকার এমপি ছিলেন। অবশ্য এমপি মনজুরুল ইসলাম লিটন হত্যার পর প্রথমদফা গত বছরের ২২ মার্চের উপ-নির্বাচনে জাপা প্রার্থী ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীকে হারিয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থিত গোলাম মোস্তফা আহম্মেদ এমপি নির্বাচিত হন। পরে সড়ক দুর্ঘটনা গোলাম মোস্তফা মারা যাওয়ার পর গত ১৩ মার্চের উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী নিহত লিটনের বড় বোন আফরোজা বারীকে পরাজিত করে জাতীয় পার্টির প্রার্থী শামীম হায়দার পাটোয়ারি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে এই দুই উপ-নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট অংশ নেয়নি।  

নির্বাচন বিশ্লেষকরা মনে করেন, সুন্দরগঞ্জ উপজেলা জামায়াত অধ্যুষিত। ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার পর এখানে চার পুলিশ হত্যা এবং ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে পরে অসংখ্য নাশকতার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় প্রায় ৩২টি মামলায় বিএনপি-জামায়াতের কয়েক হাজার নেতাকর্মী আসামি হন। শতাধিক গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। এছাড়া নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা শুরু হলে পুলিশ তাদের ৪৪ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে। এসব কারণে তারা সভা-সমাবেশ বা শো ডাউন না করে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে এবং দেলোয়ার হোসেন সাঈদী ও খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য ধানেরশীষে ভোট প্রার্থনা করছেন। 

এসব কারণে বিএনপি-জামায়াত মনে করে, ভোটগ্রহণের দিন পরিবেশ ভাল থাকলে, মানুষ যদি নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে যেতে পারে এ আসনে মহাজোট প্রার্থীর পরাজয় হবে। 

আরো পড়ুন: ‘হোয়াইট হাউজে আমি বড় একা’, টুইটে ট্রাম্পের আক্ষেপ

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী নিহত এমপি লিটনের বড় বোন আফরোজা বারী গত ২৪ ডিসেম্বর মহাজোট প্রার্থীর লাঙ্গল প্রতীককে সমর্থন জানিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে মহাজোটের মধ্যে আর কোন দ্বন্দ নেই। তারা সবাই এখন লাঙ্গলের পক্ষে প্রচারনা চালাচ্ছেন। 

স্বতন্ত্র প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের এক নম্বর যুগ্ম আহবায়ক আফরোজা বারী বলেন, মহাজোটের প্রার্থী ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীকে বিজয়ী করতে তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। আগামী ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনে এ আসনে মহাজোট প্রার্থীকে বিজয়ী করতে আওয়ামী  লীগ নেতাকর্মী এখন ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছে। 

এদিকে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা মনে করছেন, এক সময় আসনটি জাতীয় পার্টির দখলে ছিল। কিন্তু বিগত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জাতীয় পার্টির হঠাৎ করে অংশ নেওয়া এবং জাপা চেয়ারম্যান এরশাদের একক সময় একেক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে স্থানীয়ভাবে দলের ইমেজ অনেকটা কমে যায়। জাপার ঘাটিতে পাঁচবছর ক্ষমতায় থেকে অনেকটা প্রভাব বিস্তার করে জামায়াত। তবে গত ১৩ মার্চের উপ-নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী শামীম হায়দার পাটোয়ারি আসনটি পুন:উদ্ধার করেন। এক বছরের কম সময় হলেও শামীম হায়দার পাটোয়ারি এই এলাকায় অনেক উন্নয়ন মূলক কাজ করে এলাকায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। পাশাপাশি তিনি উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে নেতাকর্মীদেরও কাছাকাছি পৌঁছেন।

শুধু তাই নয়, একাদশ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মহাজোটের সঙ্গে জাপা যুক্ত হয়ে শামীম হায়দার পাটোয়ারি মহাজোটের প্রার্থী তাই এই আসনে তিনি জয়ী হবেন বলে সাধারণ নেতাকর্মীরা মনে করছেন।

জানতে চাইলে জাপা প্রার্থী শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, আমি এলাকার উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছি। এখানে ১৮-৪০ বছর বয়সের ভোটার ৬০-৭০ ভাগ। তাদের সমর্থনে এগিয়ে আছি। এ ছাড়া ভোটগ্রহণের দিন পরিবেশ ভাল থাকলে, মানুষ যদি নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে যেতে পারলে আমি জয়ী হবো। 

জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মাহবুবর রহমান বলেন, পনেরটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই আসন। এখানে মোট ভোটার তিন লাখ ৩২ হাজার ৯৪৯ জন। এরমধ্যে পুরুষ এক লাখ ৬২ হাজার ৪৫৭ জন এবং নারী এক লাখ ৭০ হাজার ৪৯২ জন। 

ইত্তেফাক/জেডএইচ