উচ্চতর ডিগ্রিধারী শিক্ষক সংকটে ভুগিতেছে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি। বিশেষত নূতন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে এই সংকট তীব্র। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে নূতন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে এই সংকট সবচাইতে বেশি। আর বেসরকারি ৮-১০টি বিশ্ববিদ্যালয় ব্যতিরেকে অন্যগুলিতে রহিয়াছে ভয়াবহ সংকট। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক নূতন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর ডিগ্রিধারী শিক্ষকের সংকট বিরাজ করিতেছে। এসকল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধানত প্রভাষক ও জুনিয়র শিক্ষক দিয়া শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হইতেছে। মূলত উচ্চতর ডিগ্রিধারী শিক্ষক সংকটের কারণেই উচ্চশিক্ষার মান বাড়িতেছে না, জোরদার হইতেছে না গবেষণা কার্যক্রমও।
দেশের বেশিরভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসন ও চিকিত্সা সমস্যা আছে। শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতন স্কেল নাই, নাই গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামো। আবার বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্ভিস রুল নাই। এসকল কারণে উচ্চশিক্ষিত, দক্ষ, যোগ্য ও মেধাবী শিক্ষকরা সুযোগ পাইলেই অন্য প্রতিষ্ঠানে চলিয়া যাইতেছেন। তরুণ বয়সে বাহিরে গিয়া উচ্চতর ডিগ্রি নিয়া অনেকেই আবার দেশেও ফিরিতেছেন না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলি প্রয়োজনমতো উচ্চতর ডিগ্রিধারী শিক্ষক সরবরাহ করিতেও পারিতেছে না। ইহার প্রধান কারণ গবেষণা নাই, গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দও নাই। একইসঙ্গে বলিতে হইবে, উচ্চতর ডিগ্রিধারী শিক্ষক তৈরিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও বিশেষ মাথাব্যথা নাই। তাহার উপরে শিক্ষকদেরও গবেষণা, নূতন জ্ঞান আহরণ এবং লেখাপড়ায় আগ্রহ কমিয়া গিয়াছে। ফলে দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষকের অভাব দেখা দিতেছে। তবে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে গবেষণা কার্যক্রম বর্তমানে কিছুটা বাড়িয়াছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বরাদ্দও কিঞ্চিত্ বাড়িয়াছে। ২০৪১ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করিতে এখনই গবেষণাখাতে বরাদ্দ বাড়াইবার বিকল্প নাই। অন্যদিকে ইউজিসি বলিতেছে, যোগ্য, দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষকগণ বড় বড় শহরের বাহিরে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে পড়াইতে আগ্রহী নহে। ফলে ওই সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মান বজাইয়া রাখা সম্ভব হইতেছে না। কেবল সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নহে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই চিত্র আরও ভয়াবহ। এই পরিস্থিতি হইতে উত্তরণে ইউজিসি সুপারিশ করিয়াছে, প্রতিষ্ঠিত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অথবা সহযোগী অধ্যাপককে আকর্ষণীয় সুযোগসুবিধা দিয়া একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অপেক্ষাকৃত কম প্রতিষ্ঠিত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেষণে পাঠানো যাইতে পারে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষকবৃন্দ যেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান করিতে পারেন সেই ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা যাইতে পারে। সেইসঙ্গে, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের প্রয়োজনে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া যাইতে পারে।
উচ্চশিক্ষা নিয়া আমাদের অহংকার করিবার সুযোগ নাই, বরং দুশ্চিন্তার বিস্তর কারণ রহিয়াছে। বলা অত্যুক্তি হইবে না যে, আমাদের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলি বৈশ্বিক জ্ঞানকাণ্ড হইতে প্রায় পুরাপুরিই বিযুক্ত। ফলে, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মান নিম্নগামী। ইউজিসি’র সমীক্ষাগুলিও ইহার প্রমাণ দিতেছে। মানোন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপও তাহারা সুপারিশ করিয়াছে। সেইগুলি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। সর্বোপরি, গভীর অভিনিবেশ, অনুধ্যান, গবেষণা, বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদানের যে সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রত্যাশা করা হয়, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে তাহার বড্ড অভাব। উচ্চশিক্ষার মান বাড়াইতে সেই সংস্কৃতিও গড়িয়া তুলিতে হইবে।
