সুফী জোনাবালী খালের নীরব আর্তনাদ

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:১২

সম্প্রতি ইত্তেফাকে মাদারীপুরের টেকেরহাটের সুফী জোনাবালী খালের একটি ছবি ছাপা হইয়াছে। ছবিটি দেখিয়া জ্ঞানবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ মাত্রই শিহরিত হইবেন। কারণ ইহা খাল নাকি ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়—তাহা বুঝিবার কোনো উপায় নাই। সব ধরনের ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্যের ঠাঁই হইয়াছে এই খালে। জমিয়া থাকা পানি আর নিক্ষিপ্ত বর্জ্য হইতে সৃষ্ট উত্কট দুর্গন্ধে খালের দুই পাশের বাসিন্দাদের জীবন দুর্বিষহ হইয়া পড়িয়াছে। সেইসাথে দেখা দিয়াছে জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ঝুঁকি। অথচ মাদারীপুরের রাজৈর  পৌরসভার মধ্য দিয়া প্রবাহিত খালটি কোনো পরিত্যক্ত বা মৃত খাল নহে। তাহাকে জোরপূর্বক মৃত্যুর মুখে ঠেলিয়া দেওয়া হইয়াছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ১০ বছর আগে টেকেরহাট মিল্কভিটার নিকট কুমার নদ হইতে খালের উত্সমুখ বন্ধ করিয়া টেকেরহাট-রাজৈর উপজেলার সদর বাইপাস সড়ক নির্মাণ করা হয়। তখন হইতে স্রোতস্বিনী খালটির এই মরণদশা। যথারীতি খালের জায়গা দখল করিয়া পাকা বা আধাপাকা স্থাপনা গড়িয়া উঠিয়াছে। সর্বোপরি, মারাত্মক হুমকির মুখে পড়িয়াছে ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ খালটির দুই পাশের প্রায় ৫০ হাজার একর জমিতে বোরো ধানসহ সেচকেন্দ্রিক কৃষি উত্পাদন। তবে এহ বাহ্য। খাল হইল মিঠাপানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উত্স। এই উত্সগুলি মরিয়া গেলে দীর্ঘমেয়াদে শুধু যে পরিবেশগত ভারসাম্য বিপন্ন হইবে তাহাই নহে, সংকটাপন্ন হইয়া পড়িবে সংলগ্ন জনপদের মানবজীবনও।

কেবল পানির অভাবেই যে বহু সভ্যতা বিলীন হইয়া গিয়াছে—তাহা সুবিদিত। তবে ইতিহাস হইতে আমরা যে শিক্ষা গ্রহণ করি নাই—জোনাবালী খালই তাহার একমাত্র উদাহরণ নহে। গত অর্ধশতকে কেবল রাজধানী ঢাকাতেই উধাও হইয়া গিয়াছে কমপক্ষে ২৪টি খাল। বেপরোয়া দখল-দূষণের মধ্যেও যে কয়টি খাল এখনো কোনোমতে টিকিয়া আছে, তাহাদের অবস্থাও জোনাবালী খালের চাইতে উত্তম নহে। দখল কাহারা করে, কীভাবে করে—তাহা দেশবাসী যেমন জানেন, তেমনই ইহার আদ্যোপান্ত প্রশাসনেরও নখদর্পণে। মাঝেমধ্যেই ঢাকঢোল পিটাইয়া খাল উদ্ধারের তোড়জোড় হয় বটে, কিন্তু পরিস্থিতি বদলায় না বলিলেই চলে। শুধু খাল নহে—নদ-নদী, পুকুর-দিঘি ও জলাশয়সহ মিঠাপানির প্রায় সবকয়টি উত্সই এখন তীব্র ঝুঁকির মুখে। বৈধ-অবৈধ দখল নিঃসন্দেহে এই ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তবে একমাত্র চ্যালেঞ্জ অবশ্যই নয়। যত দিন যাইতেছে, দখলের ভয়াবহতাকেও ছাপাইয়া উঠিতেছে দূষণের আগ্রাসন। গৃহস্থালি বর্জ্যের পাশাপাশি কলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য গ্রাস করিয়া লইতেছে একের পর এক নদ-নদী ও খাল। ভিন্ন নহে পুকুর-দিঘি ও লেকসহ মিঠাপানির অপরাপর উত্সগুলির অবস্থাও। অথচ দেশে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ ও নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের অভাব নাই। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলি আন্তরিকভাবে উদ্যোগী হইলে অবশ্যই পরিস্থিতি বদলাইত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক ক্ষেত্রে বরং বিপরীত চিত্রই লক্ষ করা যায়।

যথেষ্ট হইয়াছে—এই কথা বলিবার সময় আসিয়াছে। প্রশ্ন হইল, কে বলিবে? ইহার উত্তরে বলিতে হয়, স্ব স্ব এলাকার খাল ও নদী বাঁচাইতে সর্বাগ্রে স্থানীয় জনগণকেই উদ্যোগী হইতে হইবে। তাহারা সোচ্চার হইলে অন্যদেরও যে পাশে পাইবেন তাহাতে সন্দেহ নাই।