প্রফেসর ডা. রকিবুল আনোয়ার
রেক্টাম বা মলাশয় এবং কোলন অথবা বৃহদন্ত্রের উপসর্গ ক্যানসারটির উত্পত্তি মলাশয় অথবা বৃহদন্ত্রের কোন অবস্থান হতে হয়েছে, পরিপূর্ণভাবে তার ওপর নির্ভরশীল। মলাশয়ের ক্যানসার সাধারণত পায়ুপথে রক্তক্ষরণ এবং মলত্যাগের অভ্যাসের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। মলত্যাগের বেগ এলে রোগী তড়িঘড়ি করে টয়লেটে যায় ও শ্লেষ্মাযুক্ত রক্ত মলদ্বার দিয়ে বেরিয়ে আসে। প্রথম দিকে যেহেতু উপসর্গ তত মারাত্মক নয় রোগী নিজ থেকেই অনেক সময় চিন্তা করে যে, হয়তো বা আমাশয় আক্রান্ত হয়েছে অথবা হয়তো বা তার পাইলস হতে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। আমাদের দেশে পাইলস অথবা পেট খারাপ বা আমাশয় আক্রান্ত হওয়া বেশ সাধারণ ব্যাপার। ভেজাল, নষ্ট হওয়া খাবার দাওয়াতে অথবা রেস্তোরাঁয় খেয়ে পেট খারাপ বা মলত্যাগের অভ্যাসের পরিবর্তনকে সহজভাবে গ্রহণ করা আমাদের রোগীদের জন্য স্বাভাবিক। সেকারণে পায়ুপথে রক্তক্ষরণ মলত্যাগের অভ্যাসের পরিবর্তন, কোষ্ঠকাঠিন্য অথবা পাতলা পায়খানা উপসর্গগুলো যে ক্যানসারেরও উপসর্গ সেটা অনুধাবন করতে রোগীর অনেক দেরি হয়ে যেতে পারে যদিও এর মধ্যে ক্যানসারটি বড়ো হয়ে মলাশয়/বৃহদন্ত্রের অকুস্থলের চারিপাশে এবং পরবর্তী সময়ে ফুসফুস ও যকৃতে ছড়িয়ে যায়। পেটে ব্যথা হয়, মল আটকে গিয়ে সম্পূর্ণ কোষ্ঠকাঠিন্য ও পেট ফুলে ওঠে।
রেক্টাম বা মলাশয় এবং কোলন অথবা বৃহদন্ত্রের ক্যানসারের জন্য ল্যাপারোস্কপি পদ্ধতিতে অপারেশনের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পেট না কেটে ও মলদ্বার অপসারণ না করে ক্যানসারটি সম্পূর্ণরূপে ব্যবচ্ছেদ করে আরোগ্য লাভ করা সম্ভব হয়। আগেকার দিনে সচরাচর পায়ুপথ বা মলদ্বার ফেলে দিয়ে পেটের ডান বা বাঁয়ের যে কোনো একপাশে কৃত্রিম মলদ্বার বানিয়ে সেখানে ব্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হতো। মল উক্ত ব্যাগে জমা হতো এবং রোগীকে সময় মতো মাঝে-মধ্যে ব্যাগ পরিষ্কার করে নিতে হতো। এই স্থায়ী ব্যাগ লাগানো অনেক রোগীর কাছে অগ্রহণযোগ্য সামাজিকভাবে অমর্যাদাপূর্ণ অরুচিসম্মত হিসেবে গণ্য করে এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতে যেভাবেই হোক রোগী স্থায়ী ব্যাগ পরিহার করার চেষ্টা করে। মলাশয় এবং কোলন ক্যানসার সম্পর্কে সচেতনতার অভাব ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে সর্বজনীন অজ্ঞতার কারণে বাংলাদেশে ক্যানসার রোগীর পরিপূর্ণ আরোগ্য হবার হার তুলনামূলকভাবে অনেক কম, উপসর্গ জটিলতা ও ভোগান্তি বেশি এবং ক্যানসারের ব্যয়বহুলতা সর্বাধিক। সচেতনতার অভাব, অজ্ঞতা ভোগান্তি অহংবোধ, চিকিত্সক সমাজের প্রতি আমজনতার বিশ্বাসের অভাবে এবং ক্যানসারের ব্যয়বহুলতা রোগীকে প্রকৃত চিকিত্সা অনুসন্ধান হতে বিরত রাখে। মলাশয় অথবা মলদ্বারের সাধারণ অসুখ যেগুলো ক্যানসারের মতো মারাত্মক নয় যেমন ফিশার পাইলস ইত্যাদির উপসর্গ এবং ক্যানসারের উপসর্গ একই রকম হতে পারে এবং যেহেতু ঐ অসুখগুলো সাধারণত অচিরেই জীবন হুমকির সৃষ্টি করে না রোগী উপসর্গের গুরুত্ব অনুধাবন না করেই কোনো ব্যবস্থা গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করেন, এমনকি শল্য চিকিত্সকের (সার্জন) পরামর্শের পরিপ্রেক্ষিতে এটাও বলতে শোনা যায় যে, রোগী জানে যে রক্তক্ষরণ বা অন্যান্য উপসর্গ পাইলস হতে উদ্বুদ্ধ। প্রকৃতপক্ষে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকই পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে উপসর্গের কারণ নির্ণয় করতে সক্ষম হন। রোগীর ইতিহাস, শারীরিক পরীক্ষা এবং কলনস্কপি ও বায়োপ্সি করে রোগ নির্ণয়ের পর সিটি এবং এমআরআই দ্বারা স্টেজিং করার পরেই চিকিত্সা প্রণালি নির্ধারণ করে চিকিত্সা শুরু করা হয়।
আধুনিক পদ্ধতিতে ল্যাপারোস্কপি বা রোবটের মাধ্যমে অপারেশন করে আশপাশের গ্লান্ড যেখানে ক্যানস্যার ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকে সেই গ্লান্ডসহ ক্যানসারটিকে সম্পূর্ণ অপসারণ করা। প্রায় নব্বই ভাগেরও বেশি ক্ষেত্রে পেট না কেটে ও মলদ্বার অপসারণ না করে ক্যানসারটি সম্পূর্ণরূপে বাদ দেওয়া সম্ভব হয়। অপারেশনের পূর্বে অথবা পরে কেমোথেরাপি অথবা/এবং রেডিওথেরাপির প্রয়োজন আছে কিংবা নেই সেটা নির্ভর করে ক্যানসার স্টেজিংয়ের ওপর। যদিও ইংল্যান্ড, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকায় নব্বইয়ের দশক হতে ল্যাপারোস্কপিক পদ্ধতিতে মলাশয় এবং বৃহদন্ত্রের ক্যানসারের অপারেশন চালু হয়েছে এবং আমি নিজে সে সময় হতেই ল্যাপারোস্কপিক পদ্ধতিতে মলাশয় এবং বৃহদন্ত্রের অপারেশন করে আসছি, বাংলাদেশে কেবল সম্প্রতি এ পদ্ধতিতে অপারেশনের প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে। ল্যাপারোস্কপির মাধ্যমে অপারেশনের পর মলদ্বার অক্ষত থাকে, রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে, ক্যানসার থেকে আরোগ্য পাবার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায় এবং আগে আগে স্বাভাবিক কাজকর্মে ফিরে যেতে পারে। এই প্রযুক্তিতে বেশ কিছু একবার প্রয়োগযোগ্য শল্যযন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়ে থাকে, যে কারণে তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল এবং অপারেশনে খরচ কিছুটা বেশি হয়। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে আমি এই জটিল অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সফল অপারেশন করেছি।
খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান এবং জীবনধারা রেক্টাম বা মলাশয় এবং কোলন অথবা বৃহদন্ত্রের ক্যানসার সৃষ্টিতে প্রভাবিত করে। ধূমপান পরিহার, প্রচুর শাকসবজি ও পানিপান, নিয়মিত হাঁটাচলা ও ব্যায়াম রেক্টাম বা কোলন ক্যানসার প্রতিরোধ করে। যাদের কাছে পরিবারে রেক্টাম এবং কোলন ক্যানসারের ইতিহাস আছে তাদের ৪০ বছর পার হবার পর কলনস্কপি করার প্রয়োজন আছে এবং যে কোনো বয়সে উপসর্গ থাকলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মোতাবেক পরীক্ষানিরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনিস্বীকার্য।
n লেখক :ল্যাপারোস্কপিক কলোরেক্টাল ও জেনারেল সার্জন, দ্য রয়্যাল লন্ডন হাসপাতাল
