দীর্ঘ ৬৮ বছরের অন্ধকার জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার পর দুই বছর আগে জমির মালিকানা সংক্রান্ত মাঠ খতিয়ান ও নকশা পেলেও জমি ক্রয়-বিক্রয় করতে পারছে না বিলুপ্ত ছিটমহল বাসিন্দারা। আরএস খতিয়ান না পাওয়ায় জমির ভাগ-বণ্টনসহ জরুরি প্রয়োজনে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ার বাসিন্দারা এমন সমস্যায় রয়েছেন বলে জানা গেছে।
এছাড়া ভোগদখলকৃত জমি অন্যের নামে রেকর্ডসহ জমি নিয়ে নানা বিরোধ নিষ্পত্তি হয়নি এখনও। ফলে প্রতিনিয়ত জমি সংক্রান্ত জটিলতায় পড়তে হচ্ছে ছিটমহল বাসিন্দাদের। গত বছরের ২৭ মার্চ গেজেট সম্পন্ন হলেও এ সমস্যার সমাধান কবে হবে তা নিয়ে অজানা শঙ্কায় রয়েছেন তারা।
জানা গেছে, বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ার আয়তন ১ হাজার ৬৪৩ দশমিক ৪৪ একর। ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মুজিব-ইন্দিরা স্থলসীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন হওয়ায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরের ভারতের ১১১টি ছিটমহল এবং ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ৫১ টি ছিটমহল দুই-দেশের ভূখণ্ডে যুক্ত হয়। উভয় দেশের নাগরিক হওয়ার সুযোগ পান অবরুদ্ধ ছিটমহলের বাসিন্দারা।
গত ২০১৫ সালের ১ আগস্ট বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল চুক্তির বাস্তবায়নের মাধ্যমে জমির মালিকানা পাওয়ার কাজ শুরু হয়। দীর্ঘ দু’বছর ধরে জরিপ ও অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষে ২০১৭ সালের ৯ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে জমির মালিকানা স্বত্বের কাগজ বুঝিয়ে দেওয়া হয় বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ার বাসিন্দাদের। তবে গেজেট প্রকাশ ও আরএস খতিয়ান না পাওয়ায় জমি ক্রয়-বিক্রয় করতে পারছেন না দাসিয়ারছড়ার বাসিন্দারা।
বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দা নুর আলম, আব্দুল করিম, আফসার আলী জানান, বিগত চার বছরে সরকারি ও বেসরকারিভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরের ১১১ টি বিলুপ্ত ছিটমহলে সংঘটিত হয় নানা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড। বিদ্যুৎ সংযোগ, কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন, রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা স্থাপন ও জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানসহ চোখে পড়ার মত উন্নয়ন হলেও জমির মালিকানার হালনাগাদ কাগজপত্র না পাওয়ায় তাদের জমির সংক্রান্ত মূল সমস্যা এখনো কাটেনি। বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ার বেশিরভাগ মানুষ জমি ও জমির উৎপাদিত ফসলের ওপর নির্ভরশীল। তাই জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি জরুরি প্রয়োজনে জমিই তাদের একমাত্র সম্বল। ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা, চাকরি, ছেলে-মেয়েদের বিয়ে-শাদী,পরিবারের কোন সদস্যের আকস্মিক অসুস্থতায় জমি বিক্রি করা ছাড়া অর্থ সংস্থানের অন্যকোন উপায় নেই তাদের।
কিন্তু জমির কাগজ পত্র না থাকায় এসব জরুরি প্রয়োজনে জমি বিক্রি করতে না পেরে চরম সমস্যায় রয়েছেন তারা।
আরো পড়ুন: তারেকসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা গ্রহণের আদেশ ২২ মার্চ
ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির দাসিয়ারছড়া ইউনিটের সাবেক সভাপতি আলতাফ হোসেন বলেন, ‘আরএস খতিয়ান না পাওয়ায় ও গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় দাসিয়ারছড়াবাসী জমি কেনা-বেচা করা থেকে এখনো বঞ্চিত। জমি কেনা-বেচা করতে না পারায় ছেলে-মেয়েদের বিয়ে, পড়াশোনার খরচ, বৃদ্ধ বাবা-মার চিকিৎসাসহ নানামুখী সমস্যায় রয়েছি আমরা।’
সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ অংশের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা অভিযোগ করে বলেন, ‘তার নিজের ভোগদখল করা জমি একটি চক্র নিজের নামে অজান্তে রেকর্ড করায় এখন এই জমি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে।’ তার দাবি, দাসিয়ারছড়ায় তারমতো অর্ধশত ভূমির মালিক এ ধরণের জটিলতায় পড়েছেন।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোছা. মাছুমা আরেফিন জানান, দাসিয়ারছড়ার মৌজার ৩২৭৫ টি আরএস খতিয়ানের গেজেট কপি হাতে পেয়েছি। পার্শ্ববর্তী মৌজার কর নির্ধারণ করে অতিসত্তর ভূমি রেজিস্ট্রি কার্যক্রম শুরু করা হবে। এতে করে দাসিয়ারছড়াবাসীর সকল প্রতিবন্ধকতা অতি সত্তর নিরসন হবে বলে আমার বিশ্বাস।
ইত্তেফাক/এএএম
