সারায়েভোর মাইনফিল্ডে

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২০, ১৯:২২

বঙ্গদেশের এক কল্পিত বাস টার্মিনালের কথা ভাবা যাক। ধরা যাক ব্যাগ-বোঁচকা নিয়ে সে টার্মিনালে ঢোকার মুখেই পথের দু পাশে চোখে পড়ে গেল ঝুলে থাকা নানা মৌসুমি ফল, এই যেমন—পেয়ারা, আম, জাম কিংবা লিচু। ফলগুলো আবার এমনই স্থানে যে হাত বাড়ালেই টপাটপ পেড়ে নেওয়া যায়। তা এমন যদি হয় দৃশ্যখানা তবে বঙ্গবাসী হিসেবে আমাদের চোয়াল একটু হলেও কি ঝুলে পড়বে না? এমন হাটখোলা স্থানে এমন মধুরতম ফলগুলো যদি হা করে চেয়ে থাকে তবে কেই বা কতক্ষণ লোভ সামলে গাছের ডালের বৃন্তে ফলগুলোকে আরো কিছুটা সময় জিরোতে দেবে, তাও আবার এমন জনবহুল দেশে? সে জন্যই বলছি এমন দেশের মানুষ হিসেবে যদি কোনো এক শহরে গিয়ে দেখি বাস টার্মিনালের ঢোকার পথের দু পাশের মাচায় ঝুলে আছে পেকে থাকা টসটসে সবুজাভ আঙুরের থোকা, তবে বঙ্গবাসী হিসেবে বিষম না খেয়ে উপায় আছে কি? হয়তো নেই, আর তাই মন্টিনেগ্রোর বুদভা শহরের বাস টার্মিনালে সাত সকালে বাস ধরবার জন্যে পৌঁছে নিজের চোখকে কয়েকবার কচলে নিলাম। সেই কাকডাকা ভোরে উঠেছিলাম। কোনোক্রমে প্রাতঃকৃত্য সেরেই দৌড় লাগিয়েছিলাম বাস টার্মিনালে। কারণ সকালের যানটি পাকড়াও না করতে পারলে প্যালা আছে বেশ। আমার গন্তব্য বসনিয়ার রাজধানী শহর সারায়েভোতে, বুদভা থেকে গুটিকয়েক যাত্রী এ পথে যাতায়াত করে। তাই বাসের বদলে এ পথে চলে ব্যক্তি মালিকানাধীন কিছু মাইক্রোবাস। তা সে সকালে একটি, আর শেষ বিকেলে আরেকটি। কিন্তু মুশকিলের কথা হলো পাহাড়ি দুর্গম পথ বিধায় এ পথে সময় লাগে প্রায় ঘণ্টা আটেকের মতো। তাই বিকেলের যান ধরলে সারারাতই হয়তো এই বিপদসংকুল পথে নিজের দমখানা আটকে চলতে হবে। ততটুকু সইবার মতো বুকের বল আমার নেই, তাই সে ঝুঁকি না নিয়ে আমি এই সাত সকালেই শশব্যস্ত হয়ে হাজির এই টার্মিনালে। তবে সদ্য ঘুম ভেঙে এসেছি কিনা, তাই নিজের চোখের ওপরও খুব যে ভরসা করতে পারছি তেমন নয়। চেতন আর অচেতনের মাঝকার এই দ্বিধা সমাপন করবার জন্যে আমি আমার বোঁচকা একধারে রেখে একটি হ্রস্ব ঝাঁপ দিয়ে মাথার ওপরের মাচা থেকে কয়েকটি আঙুর পেড়ে খাবার চেষ্টা করি। এতক্ষণে আমি বুঝে যাই কিছুটা অম্লমধুর স্বাদের এ ফল সত্যিই আঙুর, ভুল কিছু দেখে ভড়কে যাইনি তবে!

সারায়েভোতে যাবার জন্যে যে পথ আমি বেছে নিয়েছি সে পথে এ অঞ্চলের গাঁ-গঞ্জের কিছু নরনারী ব্যতীত আমার ন্যায় ভিনদেশির তেমন একটা আনাগোনা নেই। দশ কি বারো জন বসার মতো এই যানে সবাই উঠে যাবার পর তাই আমি নিজেকে ঘাসের মাঝে হঠাত্ জেগে ওঠা একটি ভিন্নগোত্রীয় আগাছার মতো মনে করি। ভাগ্যিস কিছুটা আগেভাগেই উঠে পড়েছিলাম, কারণ সবাই নিজের স্থান বেছে নেবার পর দেখা গেল চালকের হিসেবে কিঞ্চিত গোলমালবশত যাত্রী উঠে গেছে একজন অতিরিক্ত। যিনি উঠেছেন, তিনিও নাছোড়বান্দা। পয়সা দিয়ে টিকিট কেটে যেহেতু উঠেছেন তাই আসন তার চাইই। চালক ভদ্রলোকের প্রায় মিনিট দশেক সময় লেগে গেল ভদ্রমহিলাকে বুঝিয়ে শান্ত করে বাগে আনতে। বেচারি এবার মুখের লাগাম কিছুটা সামলে নিলেন বটে, কিন্তু বাকিটা পথ গজগজ করেই চললেন, গালাগালের সে মেল-ট্রেন থামল ঘণ্টাখানেক পর আরেক যাত্রী নেমে গেলে সে স্থানটি এই দাপুটে ভদ্রমহিলা দখল করার পর।

এ জীবনে যত সকল পথে ভ্রমণ করেছি তার মধ্যে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর বোধকরি ছিল আজকের এই পথটি। যতদূর শুনেছি এ পথের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল সেই অস্ট্রো হাঙ্গেরিয়ান রাজত্বের কালে, তারপর নানা অংশের সম্প্রসারণ হয়েছে বিগত যুগোস্লাভিয়া সময়ে। তবে অনুমান করি সে নির্মাণকাজ সহজ ছিল না মোটেও। কারণ পুরো পথটিই যে তৈরি হয়েছে পাহাড়ের ত্বক কেটে। আর তাই তো আমাদের যানটি অল্প সময়ের ব্যবধানেই বারে বারে ঢুকে যাচ্ছে প্রাচীন সব টানেলে। সেসব টানেল কিন্তু আবার দীর্ঘ নয়। ইঁদুর যেভাবে তার খোঁড়া নাতিদীর্ঘ গর্ত ছেড়ে বেরিয়ে এসে খাবার মুখে পুরেই আবার সেঁধিয়ে যায় অন্য কোনো গর্তে, ঠিক সেভাবেই আমাদের এই পুরনো যানটিও একটির পর একটি টানেলের কোটর পেরিয়ে আমাদের চোখের পর্দায় তৈরি করে আলোছায়ার আবহ।

পথে এক নিস্তব্ধ জনহীন স্থানে অল্প সময়ের জন্যে চালক গাড়িটিকে দাঁড় করায় দানাপানি কিছু ঠেসবার জন্যে। আমি সে সুযোগে পা দুটোকে কিছুটা আলগা করার সুযোগ পেয়ে পার্শ্ববর্তী এক খাদের কিনারায় গিয়ে দাঁড়াই। এখানে অনতিদূরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে ঢেউ খেলে এগিয়ে চলা সবুজ কিছু পাহাড়, তবে চকিতে ভেসে আসা এক টুকরো মেঘ ফিনফিনে এক শুভ্র মশারির মতো কিছুটা যেন ঢেকে দেয় সেই পাহাড়ের অসমতল পার্শ্বদেশকে। আমি কিছুটা ঝুঁকে বহু নিচে বয়ে চলা এক পাহাড়ি খরস্রোতা নদীর দেখা পাই। মন্টিনেগ্রো ছেড়ে আসার সময়ে সেই উপকূলবর্তী শহরে পেয়েছিলাম গ্রীষ্মের আমেজ, তাই যাত্রাপথে গায়ে ভারী কিছু চাপাবার প্রয়োজন বোধ করিনি। কিন্তু এ বেলায় এই টিপিটিপ বৃষ্টিমুখর পার্বত্য অঞ্চলের কোনো এক নাম না জানা পাহাড়ের সম্মুখে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারি কিছুটা ভুল করে ফেলেছি, সমতল থেকে বেশ কয়েক হাজার ফুট ওপরে উঠে আসার ফলে উষ্ণতার পরিমাণও যে বেশ হ্রাস পাবে সেটাই তো স্বাভাবিক। অথচ সে সম্ভাবনা মাথায় না রেখে আমি কিনা ফিনফিনে এক শার্ট গায়ে দিয়ে চলে এসেছি প্রায় মেঘের সমান্তরাল এক স্থানে।

মন্টিনেগ্রো-বসনিয়া সীমান্তে আমাদের গাড়ি থামে। সীমান্ত মানে তেমন আহামরি কিছু নয়, এই জনাকয়েক নিরাপত্তারক্ষীর এক চৌকি। আমি ‘ওয়েল কাম টু বসনিয়া’—এমন একটি বিলবোর্ডের ঠিক পেছনেই ‘ওয়েলকাম টু রিপাবলিক অব সার্বস্কা’—এমন আরেকটি বিলবোর্ড দেখতে পাই। যারা এর পেছনের কাহিনি জানেন না কিংবা যুদ্ধপরবর্তী বসনিয়ার গঠন নিয়ে খুব একটা খবর রাখেন না তারা পরপর এমন ভিন্ন দুটি বোর্ড দেখে কিছুটা দ্বিধায় পড়তে পারেন। কারণ তারা নিমজ্জিত হতে পারেন এই ভেবে যে, কোন দেশে এলাম তবে? বসনিয়ায় নাকি সার্বস্কায়? বস্তুত এই রিপাবলিক অব সার্বস্কা হলো বসনিয়ার তিনটি প্রজাতন্ত্রের একটি, আর এ প্রজাতন্ত্রের মানুষ ওই বসনিয়ার চেয়ে তাদের সার্বস্কা পরিচয়টিকেই বেশি করে তুলে ধরতে পছন্দ করেন। আমি এমন একটি দুর্লভ দৃশ্যের ছবি তোলার জন্যে হাতে ক্যামেরা নিতেই আমাদের চালক ‘হারে রে রে রে’ করে ছুটে এসে আমাকে বললেন, ‘ও কাজটি করে আমাদের সব্বাইকে ঝামেলায় ফেলো না বাপু। কর্তারা দেখে ফেললে তোমাকে ফালতু জেরায় ফেলতে পারে’। আমি অগত্যা বাধ্য ছেলের মতো ক্যামেরা বোঁচকায় ঢুকিয়ে সঙ্গে আনা জার্মান ‘লিবনিত্য’ ব্র্যান্ডের বিস্কুট কটকট করে চিবাই।

বসনিয়া অংশে প্রবেশের পরই বুঝতে পেরেছিলাম এ অঞ্চলে পথঘাটের অবস্থা কিছুটা শোচনীয়। বহুকাল ধরে যে পথের সংস্কার করা হচ্ছে না, সেটি বারে বারে আমাদের গাড়িটির লাফিয়ে ওঠা দেখে আঁচ করতে পারি। এর মধ্যেই আবার একবার পথের ধারঘেঁষে চলতে গিয়ে গাড়ির বাঁ চাকা প্রায় ফসকে যাবার মতো অবস্থা হলো, আমি কিছুটা চমকে উঠে বাঁ পাশের অতলান্ত খাদের দিকে তাকাই, সেটি দেখে চালক মিটিমিটি হেসে আমাকে অভয় দিয়ে বলে, ‘ডোন্ট অরি’। কিন্তু এমন সংকীর্ণ পার্বত্য পথে, যে পথ আবার কিনা হাজারো খানাখন্দে ভরা, সেখানে শত প্রবোধের পরও নিজের মনকে শক্ত রাখা যথেষ্ট কঠিন। যদিও মনের সেই চাঞ্চল্য খুব একটা দীর্ঘস্থায়ী হয় না, তার আগেই দু পাশের নিসর্গ অপূর্ব সব রূপকল্প নিয়ে হাজির হয়ে যায়। আমি দেখতে পাই দু পাশের পাহাড়ের ঢালে জীর্ণ যেই কুটিরগুলো টিকে আছে তার এখানে-ওখানে বাসা বেঁধেছে মেঘের দল, আজ আর্দ্রতায় ভরা মেঘলা দিন বলেই হয়তো সেই মেঘমালা আকাশের কাছ থেকে সরে এসে ঠাঁই নিয়েছে স্থলভাগের সন্নিকটে। হঠাত্ সেই মেঘের মাঝ থেকে উদয় হয় একপাল শ্বেত বুনো ছাগলের দল, আর দলের পেছনে মলিন আলোয়ান গায়ে এক রাখাল বৃদ্ধ। বৃদ্ধ আমাদের গাড়ি দেখে হাত নাড়ে, আর তার ছাগলের পাল হুট করে সড়কে উঠে পড়ে আমাদের যাত্রায় যেন কোনো ব্যাঘাত না ঘটায় সেজন্যে হাতের লাঠিটিকে দু-একটি ছাগলের পিঠে কষিয়ে পালটির চারণক্ষেত্র সীমাবদ্ধ করে দেয়। এমন সময়েই পাশের এক পাইন বনের মাঝে কাঁকালে ধামা নিয়ে কানঢাকা রুমালে মুখাবৃত এক বৃদ্ধা হারিয়ে যায়। কীসের সন্ধানে বৃদ্ধার এই হারিয়ে যাওয়া জানি না সেটি, হয়তো বেরির সন্ধানে কিংবা হয়তো বুনোকুলের সন্ধানে, কে জানে!

সেই যে সকালের খ্যাচখেচে মহিলা, তিনি নেমে গেলেন ‘দোবর পলিয়ে’ নামক এক ক্ষুদ্র গঞ্জে। শুধু তিনিই নন, বুদভা থেকেই সহযাত্রী হয়ে আসা আরেকটি সার্ব মেয়েও এ শহরে নেমে যায়। নেমে যাবার সময়ে স্বর্ণকেশী এ মেয়েটির দিকে আমি দৃষ্টি নিক্ষেপ করি। পাহাড়ি শৈত্যে যেখানে আমার প্রায় জমে যাবার উপক্রম, সেখানে এই মেয়েটির প্রায় উদোম পৃষ্ঠদেশ আর অনাবৃত ঊরু ফায়ার প্লেসে জ্বেলে রাখা আগুনের মতোই আমার মধ্যে একধরনের আরামপ্রদ উত্তাপের পরশ বুলায়।

আমার জানা ছিল আমাদের এই গাড়িটি আমাকে নামিয়ে দেবে সারায়েভোর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে, আমার হোটেল সেখান থেকে খুব একটা দূরে নয়। এ শহরের মানচিত্রের সঙ্গে আমি মোটামুটি পরিচিত, তাই চালক আমাকে সম্পূর্ণ অজানা এক বাস টার্মিনালে নামিয়ে দিলে আমি কিছুটা বিস্মিত হই। নাকি এ গণ্ডির বাইরে আর তার যাবার এখতিয়ার নেই। যে স্থানে আমাকে তিনি নামিয়ে দিলেন সেটি সার্ব নিয়ন্ত্রিত পূর্ব সারায়েভো। এখান থেকে আমার হোটেলে যেতে হলে ট্যাক্সি ছাড়া উপায় নেই।

রাস্কো নামক এক বুড়ো ট্যাক্সি চালককে বলাতে সে জানায় হোটেলে পৌঁছে দিতে রাজি আছে তবে গাড়িতে ট্যাক্সি সাইন ব্যবহার করতে পারবে না। এ এলাকার ট্যাক্সি ও এলাকায় প্রবেশের নিয়ম নেই। আমি সে শর্তেই রাজি হয়ে রাস্কোর ট্যাক্সিতে চেপে বসি। রাস্কো অল্পবিস্তর ইংরেজি জানে, তা দিয়েই আমাদের দুজনের কথা চলে। এই ট্যাক্সিটি রাস্কোর নিজের মালিকানাধীন, বছর কয়েক আগে সারায়েভো শহরে নিজের কয়েক পুরুষের বাড়িটি এক আরব পার্টির কাছে বিক্রি করে এই গাড়িটি আর পূর্ব সারায়েভোতে একটি ফ্ল্যাট সে কেনে। সেখানেই এখন বুড়োবুড়ি মিলে থাকে, আর ছেলেমেয়েরা থাকে কাছেই আরেকটি ফ্ল্যাটে, ছুটির দিনে এসে মা-বাবাকে সঙ্গ দেয়। মোটের ওপর রাস্কোর একটি সুখী পরিবার। তবে সুখের মধ্যেও লেগে আছে কিছুটা অতীতের বিমর্ষতা। আমার হোটেলের কথা তুলে ও বলে, ‘ও এলাকায় পারতপক্ষে আমি যাত্রী নিয়ে যেতে চাই না। কেন জান? কারণ ও পাড়াতেই ছিল আমার বাড়িটা, আমার জন্ম বেড়ে ওঠা ও-বাড়িতেই। কিন্তু যুদ্ধের পর আর ও-বাড়িতে উঠতে পারিনি, আমার মতো সার্বদের সরে যেতে হয়েছিল সারায়েভোর পূর্ব প্রান্তের সার্বপ্রধান একটি শহরে। কিন্তু এখনো ও-পাড়ায় গেলে আমার বড়ো কষ্ট হয়, আমি সেই ফেলে আসা বাড়ির দিকে বারে বারে ফিরে তাকাই।’ আমি বিগত যুদ্ধে রাস্কোর অবস্থান জানতে চাই, সেও কি যোগ দিয়েছিল সার্ব গেরিলা বাহিনীতে? হ্যাঁ রাস্কো  যোগ দিয়েছিল, তবে কেন দিয়েছিল সেটি আজ এই দুই দশক পর এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে তার চোখের সামনে দোলে। হয়তো সময়ের প্রয়োজনে, আবার হয়তো অন্ধ প্ররোচনায়। তবে যুদ্ধে যোগদান নিয়ে সে কিছুটা হলেও বিব্রত এবং অনুশোচনাময়। যে কথাটি আমি বসনিয়ার আরো অনেকের কাছেই শুনেছি সেই একই কথার পুনরাবৃত্তি শুনি রাস্কোর মুখে, ‘টিটোর মৃত্যুর পরই সবকিছু কেমন যেন দ্রুত বদলে গেল। লেগে গেল যুদ্ধের আগুন, আর আমরাও অবিমৃষ্যকারীর মতো সে আগুনে ঝাঁপ দিলাম। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সত্যিই কি এতটা ঘৃণা পুষে ছিল? আমার তো মনে হয় না। এখনো আমি সারায়েভোর টার্মিনালে গেলে আমার অন্তত দশ জন মুসলিম বন্ধু ছুটে এসে বলে, চল রাস্কো একসাথে বসে এক কাপ কফি খাই। এই যে বন্ধুত্ব, এই যে ভাতৃত্ব এমনটাই ছিল আমাদের মাঝে। কিন্তু হঠাত্ করেই রাজনীতিবিদদের কলকাঠিতে কি থেকে যেন কি হয়ে গেল।’

রাস্কোর বাড়িটি এক আরব পার্টির কাছে বিক্রির কথা বলেছিলাম। এ প্রসঙ্গে দুটো কথা বলে রাখি। সারায়েভো শহরে আজকাল প্রচুর মধ্যপ্রাচ্যীয় পর্যটকদের আনাগোনা। দুবাই বা আবুধাবি থেকে সরাসরি ফ্লাইটে সারায়েভো পৌঁছাতে সময় লাগে চার ঘণ্টার মতো। ইউরোপের বাদবাকি অংশের চেয়ে তুলনামূলক রক্ষণশীল পরিবেশ, গ্রীষ্মের সময়টাতে আরামপ্রদ আবহাওয়া, আবার শীতের সময়ের নানা স্কি রিসোর্টের সমাহার—এসব কারণেই সারায়েভো আজকাল আরবদের কাছে এক কাঙ্ক্ষিত পর্যটন গন্তব্য। শুধু তা-ই নয়, আমি শুনলাম তাদের অনেকে নাকি এখানে ব্যাপকভাবে বসতবাড়িও কিনছেন। যদিও বিদেশিরা নিজেদের নামে বসনিয়ায় নাকি এভাবে জায়গা জমি কিনতে পারেন না। এক্ষেত্রে তাদেরকে সহায়তা করে স্থানীয় কিছু বসনিয়ান। এরা আরবদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নিজেদের নামে জমি-বসত কিনে আরবদের কাছে হস্তান্তর করে, সেভাবে কাগজে-কলমে বাড়িটি সেই স্থানীয় ব্যক্তির নামে থাকলেও মূল ভোগদখল করেন অর্থদাতা আরব পরিবারটি। ব্যাপারটি বেআইনি হলেও সারায়েভো শহরে এটি এখন একটি ওপেন সিক্রেট।