উদ্বৃত্ত আমানতের শহরমুখী অভিযাত্রা

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২০, ২২:১৩

পানি যেমন নিচের দিকে গড়ায়, উদ্বৃত্ত পুঁজির ধর্ম হচ্ছে কর্মচঞ্চল শহরমুখী ধাবমান হওয়া। বর্ষার নতুন পানি এলে পুকুরের কই মাছ যেমন উজান বেয়ে তীরের দিকে ধাবিত হয়, গ্রামের উদ্বৃত্ত পুঁজিও তেমনি নানা প্রক্রিয়ায় শহরে চলে আসে। উদ্বৃত্ত পুঁজির এই শহরমুখী সঞ্চালনার কারণে গ্রামীণ জনপদে পুঁজিসংকট দেখা দেয়। ফলে বিঘ্নিত হয় উন্নয়ন প্রচেষ্টা। অথচ গ্রামীণ অর্থনীতিই হচ্ছে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের প্রাণকেন্দ্র। প্রয়োজনীয় সমর্থন এবং আর্থিক সাপোর্ট পেলে প্রতিটি গ্রামই এক একটি অত্যাধুনিক উত্পাদনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। গ্রামে পর্যাপ্তসংখ্যক ছোটো-বড়ো উত্পাদনকেন্দ্র গড়ে উঠলে সাধারণ দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের বিস্তর সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এতে গ্রামের মানুষের শহরমুখী অভিবাসন প্রক্রিয়া এমনিতেই কমে আসতে পারে। গ্রামের উদ্বৃত্ত পুঁজির শহরমুখিনতার কারণে গ্রামীণ দারিদ্র্য যে হারে কমে আসার কথা তা হচ্ছে না। বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর সাড়ে ৭ কোটি মানুষের জন্য তিন বেলা আহারের সংকুলান করা সম্ভব হচ্ছিল না। আর এখন দেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। তারপরও সবার জন্য কমবেশি খাদ্যের সংস্থান করা সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশের বিস্ময়কর অর্থনৈতিক উন্নতির পেছনে গ্রামীণ জনপদের অবদান কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। এমন কি বর্তমানে প্রতি বছর যে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স আসছে সেখানেও গ্রামীণ জনপদের মানুষের অবদানই সবচেয়ে বেশি। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদ অনেকটাই শহরের রূপ ধারণ করেছে; কিন্তু গ্রামাঞ্চলে এখনো শিল্পকারখানা পর্যাপ্ত সংখ্যায় গড়ে ওঠেনি। কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় শিল্পকারখানা গড়ে না ওঠার কারণে গ্রামীণ জনপদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হয় অত্যন্ত ধীর গতিতে।

কিন্তু প্রশ্ন দেখা দিয়েছে অন্যত্র। যে কোনো উন্নয়ন কর্মসম্পাদন, বিশেষ করে শিল্পকারখানা স্থাপন করতে হলে নিজস্ব পুঁজির দরকার হয়। গ্রামের মানুষ কি সেই চাহিদাকৃত পুঁজির যোগান দিতে পারবে? গ্রামের মানুষের উদ্বৃত্ত পুঁজি নেই—এটা ঠিক নয়; কিন্তু সেই উদ্বৃত্ত পুঁজি গ্রামের মানুষের হাতে থাকছে না। উদ্বৃত্ত পুঁজি নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শহরে চলে আসছে। প্রতিবছর প্রবাসী বাংলাদেশি, যাদের বেশির ভাগই গ্রাম থেকে উত্সারিত তাদের প্রেরিত রেমিট্যান্সের অর্থও নানা ভাবে শহরে চলে যাচ্ছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রেরিত রেমিট্যান্সের অর্থ স্থানীয় বেনিফিশিয়ারিগণ উত্পাদনশীল কাজে ব্যয় না করে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভোগবিলাস এবং অনুত্পাদনশীল সম্পদ যেমন—বাড়ি নির্মাণ, ফ্লাট ক্রয় ইত্যাদি কাজে ব্যবহার করছেন। ফলে বিপুল পরিমাণ অর্থ শহরে চলে যাচ্ছে এবং অনুত্পাদনশীল কাজে ব্যবহূত হচ্ছে। এখন দেশের অধিকাংশ পল্লি এলাকায় ট্রেডিশনাল ব্যাংকের শাখাকে ব্যবসায়রত দেখা যায়; কিন্তু সেই সব ব্যাংকের শাখা পল্লি এলাকায় বিনিয়োগের পরিবর্তে সেখান থেকে উদ্বৃত্ত অর্থ শহরে নিয়ে আসার কাজে ব্যাপৃত রয়েছে। কীভাবে পল্লি এলাকা থেকে উদ্বৃত্ত পুঁজি, যা পল্লি শিল্পায়নের জন্য একান্তই জরুরি শহরে চলে আসছে তার একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে এজেন্ট ব্যাংকিং বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে শিডিউল ব্যাংকগুলো গ্রামাঞ্চলে শাখা স্থাপন না করেও আর্থিক লেনদেন করতে পারছে। তারা গ্রামীণ এলাকায় সাধারণ মানুষের জন্য ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিচ্ছে। ২০১৪ সালে প্রথমবারের মতো দেশে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি প্রদান করা হয়। আর্থিক খাতে অন্তর্ভুক্তিমূলক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এটা শুরু করা হয়। এ পর্যন্ত ৬০টি ব্যাংকের মধ্যে ২২টি ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি লাভ করেছে। যদিও ১৯টি ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তাদের অভিজ্ঞতা বেশ ভালো। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ফলে পল্লি এলাকার সাধারণ মানুষ ট্রেডিশনাল ব্যাংকিং সেবা পাচ্ছেন; কিন্তু আমরা কি একবারও ভেবে দেখেছি, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের নামে শিডিউল ব্যাংকগুলো কীভাবে পল্লি এলাকার উদ্বৃত্ত পুঁজি শহরে নিয়ে যাচ্ছে? গত বছর অর্থাত্ ২০১৯ সালে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রমে নিয়োজিত ব্যাংকগুলো পল্লি এলাকায় মোট ৫২ লাখ ৬৮ হাজার ৮৯৬টি অ্যাকাউন্ট খুলেছে। তার আগের বছর তারা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খুলেছিল ২৪ লাখ ৫৬ হাজার ৯৮২টি। অর্থাত্ এক বছরের ব্যবধানে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে ১১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গত বছর রেমিট্যান্স বিতরণ করা হয়েছে ১৫ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা। ২০১৯ সালে দেশের গ্রামাঞ্চলে এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যবসায়রত শিডিউল ব্যাংকগুলো তাদের এজেন্টদের মাধ্যমে মোট ৭ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ করেছে। এর মধ্যে তারা পল্লি এলাকায় বিনিয়োগ করেছে মাত্র ৪৪৬ কোটি টাকা। অর্থাত্ তারা সংগৃহীত আমানতের ৯৪ শতাংশই শহরে নিয়ে এসেছে। এখনো দেশের বেশির ভাগ মানুষ ব্যাংকিং সেবার বাইরে রয়ে গেছে। যদিও বাংলাদেশে ব্যাংকের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি বলে কেউ কেউ মনে করেন। বাংলাদেশে প্রচলিত ব্যাংকিংব্যবস্থা অনেকটাই মিশ্র প্রকৃতির। বিশ্বে দুই ধরনের ব্যাংকব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করা যায়। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ব্রাঞ্চ ব্যাংকিং, যা যুক্তরাজ্যে প্রচলিত রয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকিংব্যবস্থা হচ্ছে ইউনিট পদ্ধতির। সেখানে সামান্য কয়েকটি শাখা নিয়ে এক একটি ব্যাংক স্থাপিত হয়।

সরকার গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করে চলেছেন। শহরের অত্যাধুনিক সুবিধাসমূহকে গ্রামীণ জনগণের জন্য সহজলভ্য করতে চাচ্ছেন। এ জন্য গ্রামীণ কৃষিনির্ভরতা কাটিয়ে শিল্পায়নের দিকে ধাবিত হতে হবে। আর শিল্পের জন্য ব্যক্তিগত পুঁজির কোনো বিকল্প নেই। কাজেই গ্রামের মানুষের উদ্বৃত্ত পুঁজি বা অর্থ গ্রামেই রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।

n লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক