খাদ্য উত্পাদন ও পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা
নুরুল মোহাইমীন মিল্টন, কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) সংবাদদাতা
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে কমছে আবাদি কৃষিজমির পরিমাণ। উপজেলার কৃষিজমি ভরাট করে লাগামহীনভাবে গড়ে উঠছে পাকা স্থাপনা। কয়েক বছর আগেও যে জমিতে আউশ, আমন, সাইলসহ রবি মৌসুমে বিভিন্ন জাতের চাষাবাদ হতো, সে জমিতে এখন গড়ে উঠেছে আবাসিক ও বাণিজ্যিক বহুতল ভবন। বিশেষত রাস্তার ধারে আবাদি কৃষিজমি ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণের হিড়িক পড়েছে। এতে ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার হুমকি আর পরিবেশ বিপর্যয়েরও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
উপজেলা কৃষি সমপ্রসারণ বিভাগের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আব্দুন নবী জানান, কমলগঞ্জে প্রতি বছর দশমিক ২৫ শতাংশ বা ৪৫ হেক্টর পরিমাণ কৃষিজমি হ্রাস পাচ্ছে। অর্থাত্ বছরে ৪৫ হেক্টর কৃষিজমি চলে যাচ্ছে অকৃষি খাতে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা গোপাল দেব বলেন, মৌলভীবাজারের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রবাসীদের আয়ের একটি বড়ো অংশ বাসাবাড়ি, দালান, অট্টালিকা নির্মাণে ব্যয় করা হচ্ছে। এসবের ৭৫ ভাগই রাস্তার ধারের আবাদি কৃষিজমিতে তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রতি বছর দেশে এক শতাংশ হারে কৃষিজমি হ্রাস পাচ্ছে। তবে ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন তথা লাগামহীনভাবে কৃষিজমি ধ্বংসের যে প্রবণতা তাতে পরিমাণ আরো অধিক হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মৌলভীবাজারে আবাদি কৃষিজমির মধ্যে দুই ফসলি এমন কী তিন ফসলি জমিও রয়েছে। এই জেলার কৃষি ভাণ্ডার হিসেবে খ্যাত কমলগঞ্জে এক সময়ে প্রচুর সংখ্যক খাদ্যশস্য উত্পাদন হতো। কিন্তু কৃষিজমি রূপান্তরিত হওয়ায় খাদ্যশস্যের ঐ জায়গাসমূহে স্থান পাচ্ছে ইটের ঘর।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, কমলগঞ্জে মোট কৃষিজমির পরিমাণ ৩৭ হাজার ৩৫২ হেক্টর। এর মধ্যে ফসলি জমির পরিমাণ ৩২ হাজার ৭২৮ হেক্টর। আবাদি জমির মধ্যে স্থায়ী বন ৮ হাজার ২১৭ হেক্টর, চা-বাগান ৯ হাজার ৮৩৩ হেক্টর, এক ফসলি জমির পরিমাণ ৫ হাজার ১৬১ হেক্টর, দুই ফসলি জমির পরিমাণ ৯ হাজার ৫০১ হেক্টর, তিন ফসলি জমির পরিমাণ ২ হাজার ৮৫৫ হেক্টর, আবাদযোগ্য পতিত জমি ২৬ হেক্টর, আবাদকৃত বসতভিটে ২২৫ হেক্টর ও স্থায়ী ফলবাগান ১ হাজার ৫৩৪ হেক্টর।
শমসেরনগর থেকে পতনউষার সড়কের ধারে কৃষিজমি ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণের সঙ্গে জড়িত একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সড়কের ধারে নিজস্ব জমিতে প্রতিষ্ঠান স্থাপন ছাড়া সুবিধাজনক বিকল্প স্থান ছিল না। তাছাড়া এসব বিষয়ে অনুমতি নেওয়ার বিষয়েও কেউ বলেনি, নিজেরও জানা ছিল না।
কমলগঞ্জ পৌরসভার মেয়র জুয়েল আহমদ বলেন, কৃষিজমি ভরাট করলেও কেউ কোনো অনুমতি নেয়নি। তবে ইমারত স্থাপনের ক্ষেত্রে অনুমতি নেওয়া উচিত। কমলগঞ্জ উপজেলা থেকে মৌলভীবাজার সড়ক, আমপুর সড়ক, পতনউষার সড়ক, মাধবপুর ও মুন্সীবাজার সড়কসহ গ্রামীণ রাস্তার পাশেও কৃষিজমি ভরাট করে বাড়িঘর ও নানা স্থাপনা তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয় সমাজকর্মী তোয়াবুর রহমান, লেখক-গবেষক আহমদ সিরাজ বলেন,অপরিকল্পিতভাবে কৃষিজমি ভরাট করে বসতবাড়ি, কলকারখানা, আবাসন ও রাস্তাঘাটসহ নানা রকম স্থাপনা যত্রতত্র গড়ে উঠছে। তাদের মতে, কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই কৃষিজমিতে গৃহনির্মাণে নীতিমালার অভাবে যার যেভাবে ইচ্ছা অট্টালিকা গড়ে তুলছে।
এ ব্যাপারে কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আলম বলেন, আসলে কৃষিজমি সুরক্ষা আইন যথাযথভাবে কার্যকর না হওয়ার কারণে অপরিকল্পিতভাবে কৃষিজমি ভরাট ও স্থাপনা তৈরি হচ্ছে। তবে এসব বিষয়ে জনসচেতনতার প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
