১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ গভীর রাতে বোমা বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে যশোর টাউন হল ময়দান। উদীচীর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনের অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় নিহত হন ১০ জন। আহত হন আড়াই শতাধিক। সেদিনের ট্র্যাজেডিতে নিহতদের পরিবারের সদস্য আর আহতরা ২১ বছর ধরে এক বুক যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন। তবু ঘাতকেরা চিহ্নিত হয়নি। আইনের মারপ্যাঁচে থমকে আছে বিচারের প্রক্রিয়া।
উদীচী ট্র্যাজেডিতে নিহত হন নূর ইসলাম, নাজমুল হুদা তপন, সন্ধ্যা রাণী ঘোষ, ইলিয়াস মুন্সী, শাহ আলম বাবুল, বাবুল সূত্রধর, শাহ আলম, বুলু, রতন রায় ও রামকৃষ্ণ। আহত ও নিহতদের পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘশ্বাস বাড়ছে। উদীচী ট্র্যাজেডিতে আহত সুকান্ত দাস বলেন, ‘ঘটনা ঘটেছিল আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। পরবর্তী সময়ে সেই আওয়ামী লীগ আরো তিনবার ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু ২১ বছরেও হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি। আমরা স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তির কথা বলি। সেই স্বাধীনতার সপক্ষের সরকার ক্ষমতায় থাকতেও যখন বিচার হয় না, তখন খুব কষ্ট লাগে। ’
উদীচী ট্র্যাজেডিতে দুই পা হারান বাউল হরেন (৭০)। এর মধ্যে দুই ছেলেকে হারিয়েছেন তিনি। আক্ষেপ করে বললেন, ‘মানবেতর জীবন যাপন করছি। এখন আর কেউ খোঁজ রাখে না। অনেক কষ্টে বেঁচে আছি। ২১ বছরেও বিচার হলো না। মরার আগে অন্তত ঘাতকদের বিচার দেখে যেতে চাই।’ সুকান্ত দাস কিংবা হরেন বাউল নন, তাদের মতো আরো অনেকেই সেদিনের স্মৃতি বুকে নিয়ে অনেক কষ্টে দিন পার করছেন। ঘাতকদের বিচার না হওয়ায় হতাশ সবাই।
আদালত সূত্রে জানা যায়, সিআইডির ত্রুটিপূর্ণ চার্জশিটের কারণে ২০০৬ সালের ৩০ মে আদালত থেকে খালাস পেয়ে যায় এ মামলার সব আসামি। সরকার ঐ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করলে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত হয়। কিন্তু এরপর মামলাটির আপিল শুনানি আর হয়নি। আটকে আছে আইনের বেড়াজালে। বিচারের এই দীর্ঘ বিড়ম্বনায় ক্ষুব্ধ যশোরের মানুষ দ্রুত এ মামলার কার্যক্রম চালুর দাবি জানিয়েছেন।
যশোর পাবলিক প্রসিকিউটর এম ইদ্রিস আলী বলেন, বর্তমানে মামলাটি উচ্চ আদালতে আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। আপিল শুনানি নিষ্পত্তি না হলে নিম্ন আদালতে বিচারকাজ শুরু করা যাবে না। আশা করি অচিরেই শুনানি সম্পন্ন হবে।
‘যশোর হত্যাকাণ্ড দিবস’ হিসেবে পালন
এদিকে নানা আয়োজনে গতকাল শুক্রবার যশোরে কলঙ্কিত উদীচী ট্র্যাজেডি দিবস পালিত হয়েছে। টাউন হল ময়দানের রওশন আলী মঞ্চে উদীচী দিবসটিকে ‘যশোর হত্যাকাণ্ড দিবস’ হিসেবে পালন করে। বিকেলে আলোচনা সভা থেকে উদীচী হত্যা মামলা পিবিআইয়ের মাধ্যমে পুনঃতদন্তের দাবি জানানো হয়। এছাড়া মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
জেলা উদীচীর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহবুবুর রহমান মজনুর সভাপতিত্বে এতে বক্তব্য রাখেন উদীচীর সংগঠক অ্যাডভোকেট কাজী আব্দুস শহীদ লাল, প্রবীর সর্দার, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন, জেলা সিপিবির সভাপতি আবুল হোসেন, জাসদের সাধারণ সম্পাদক অশোক রায় প্রমুখ। সন্ধ্যায় টাউন হল ময়দানের শহিদ বেদিতে সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও মশাল প্রজ্বালন এবং প্রতিবাদী গানের আয়োজন করা হয়।
