প্রপোজাল

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২০, ১৯:০১

/ বিশ্বজিত্ দাস

 

বাবা পর্ব

পুরো বিকালটাই সীমাদের বাসার সামনে ঘুরঘুর করল রাশেদ। চায়ের দোকানে চা খেল। সিগারেট ধরাল। অনেক অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে সীমার কথা ভাবল। সীমা এখন কী করছে! একবারও কি বারান্দায় এসে দাঁড়াতে পারত না।

একবার ভাবল, যাই— সরাসরি ওদের বাসায় যেয়ে হাজির হই।

নিশ্চয়ই ওর বাবা বা মা দরজা খুলবে।

কী বলবে তখন?

মনে মনে রিহার্সেল করল রাশেদ।

আংকেল, সীমা আছে? নোট নিতে এসেছিলাম।

আন্টি, সীমা কি বাসায় আছে? এদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম। ভাবলাম দেখা করে যাই।

শেষ পর্যন্ত অবশ্য কোনো কিছুই করল না রাশেদ।

পরদিন আবার গেলো। তারপর দিন আবার। এভাবে পুরো সপ্তাহ কেটে গেলো। সীমার দেখা পেলো না।

অবশেষে দিন পনেরো পর ভার্সিটিতে এলো সীমা।

আমি তো তোমার বাসা পর্যন্ত চলে গিয়েছিলাম। আবেগে বলেই ফেলল রাশেদ।

কই জানি না তো। বাসায় কেউ তো কিছু বলেনি। সীমা অবাক হয়ে বলল।

না মানে। তোমার বাসার সামনে দিয়েই যাচ্ছিলাম...।

ও। আমাকে অবশ্য পেতে না।

কেন?

আমি তো কক্সবাজার গিয়েছিলাম। লাজুকভাবে বলল সীমা।

চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকাল।

তুই দেখি কিছুই জানিস না। অবশ্য আমরাও জানতাম না। পাশ থেকে বলল রেখা। ওদের ক্লাসমেট।

মানে?

সীমার তো বিয়ে হয়েছে দিন দশেক আগে। স্বামীর সাথে কক্সবাজার গিয়েছিল। বুঝলি বোকারাম।

 

ছেলে পর্ব

বোকার মতো ফুল হাতে অনেকক্ষণ ধরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে শুভ।

কেয়াকে দেবে।

আর একটু পরেই ওদের স্কুল ছুটি হবে।

কেয়াকে ও দেখেছিল বিজ্ঞান মেলাতে। একটা প্রজেক্ট উপস্থাপন করছিল। ওকে দেখেই তো ভালো লেগে গেলো শুভর।

একবার না, দু’বার না, বারবার ছুটে গেলো ও। ভালো করে প্রজেক্ট বোঝার উছিলায়। কেয়া অবশ্য রাগ করেনি। হাসিমুখেই বারবার বুঝিয়ে দিয়েছিল ওকে।

সেদিনই ঠিক করেছিল—কেয়ার সঙ্গে বন্ধুত্ব করবেই।

বিষয়টি অত সহজ ছিল না। কেয়া যেখানে পড়ে সেই স্কুলের ঠিকানা যোগাড় করতে হয়েছিল। কখন ছুটি হয় সেই খবর নিয়েছিল। বেশ কয়েকদিন স্কুল ছুটির পর দূর থেকে কেয়াকে ফলো করেছিল।

অবশেষে আজ রাস্তার মোড়ে ফুলের তোড়া নিয়ে দাঁড়িয়েছে শুভ।

আজ সে কেয়াকে প্রপোজ করবেই।

হঠাত্ একটা মোটরসাইকেল সামনে এসে দাঁড়াল।

সেটাতে আরোহী দুজন তরুণ। একজন পেছন থেকে নেমে এলো।

কী বাবু? ফুল হাতে কী করো? কারে দিবা?

আমি, মানে... জিহবা দিয়ে শুকনো ঠোঁট ভেজালো শুভ।

কেয়ারে ফুল দিবা। আহারে! কয়দিন ধইরা কেয়ার পিছু পিছু ঘুরতাছ, ভাবছ কেউ কিচ্ছু জানে না। কেউ বুঝবার পারব না।

মুখ দিয়ে চু চু শব্দ করল ছেলেটা।

আমি... আমি...।

কেয়া শুধু আমার, বুঝছো?

মাথা নাড়ল শুভ। বুঝেনি।

সাথে সাথে ওর গালে চটাস করে চড় এসে পড়ল।

এই রাস্তায় আর আইসো না বাবু, বুঝছো?

আচ্ছা।

মাথা নাড়ল শুভ।

তুমি বয়সে তো অনেক ছোট। স্কুলের মেয়েদের দিকে নজর দিতাছ ক্যান! তোমার পাত্রী তো কেবল জন্মাইতেছে। একটু ওয়েট করো। বুঝছো?

বলতে বলতে ছেলেটি শুভর গালে আরেকবার চড় মারল।

 

নাতি পর্ব

সদ্যজাত কন্যাশিশুকে মাত্রই দোলনায় এনে রাখল নার্স।

ক্যামন আছো সোনা। পাশের দোলনা থেকে ছেলে শিশুটি জানতে চাইল।

সাথে সাথে কান্না থেমে গেলো মেয়েটির।

তুমি কে?

আমি তোমার বন্ধু হতে চাই। তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।

ও মা, কী নির্লজ্জ রে বাবা! প্রথম দেখাতেই বন্ধু হতে চাইছ।

যুগ পাল্টে যাচ্ছে। এখন অনেক কিছুই অনেক আগে থেকে শুরু করতে হয়।

তাই বলে আমি মাত্র জন্মালাম, এখনি বন্ধুত্ব?

তুমি ইচ্ছে করলে ‘না’ বলতে পারো। কিন্তু জেনে রাখো, নার্স কিন্তু আমাকে বেশ পছন্দ করেছে। আমাকে দেখেই বলেছে, বাবুটা খুব কিউট হয়েছে।

তাই বলে নার্স! বয়স ব্যবধানটা বেশি হয়ে যাচ্ছে।

মোটেও না। আম্মুর পেটে থাকতে শুনেছি, রূপবান নামের একটি সিনেমাতে বারো দিনের শিশুর সাথে বারো বছরের মেয়ের প্রেমকাহিনি ছিল।

যাও তুমি নার্সের কাছে। কপটভাবে বলল মেয়েটি।

আমি তো তোমাকে দেখেই ফিদা হয়ে গেছি।

ওমা! এখন কী হবে!

মানে?

তুমি আমাকে জন্মদিনের পোশাকে দেখে ফেলেছ। ছিঃ ছিঃ।

ছেলে শিশুটি কিছু বলতে যাবে তার আগেই নার্স বলল, এই বাচ্চা দুটো তখন থেকে ক্যা ক্যা করছে। যাই, ওদেরকে যার যার মায়ের কাছে দিয়ে আসি।

 

নাতির নাতি পর্ব

ঘুম থেকে জেগে উঠলেন প্রসূতি মা।

শুনছো?

পাশের বিছানাতে হবু বাবা ঘুমিয়েছিলেন।

বেশ কয়েকবার ডাকাডাকির পর ঘুম থেকে উঠলেন তিনি।

কী হয়েছে? ওয়াশরুমে যাবে?

না। পেটের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠল।

বাচ্চা নড়লে এমন হয়।

সে তো জানি। কিন্তু এটা তেমন মনে হলো না।

কী মনে হলো?

মোবাইল যেমন ভাইব্রেট করে, ঠিক তেমনই যেন ভাইব্রেট করল।

ও আচ্ছা। হাসলেন স্বামী।

হাসছো কেন?

আমাদের তো মেয়ে। পাশের কেবিনে শুভ সাহেবের নাত বউয়ের ছেলে বাচ্চা হবে বলে শুনলাম। আমার মনে হয় ঐ বাবুটা মায়ের পেট থেকেই তোমার মেয়েকে প্রপোজ করেছে। সবাই ঘুমিয়েছিলাম তো। তাই সুযোগ বুঝে প্রপোজালটা দিয়েছে। বুঝেছো?    g