কৃষিবিপ্লব হোক গ্রামীণ উন্নয়নের মূলমন্ত্র

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২০, ২১:৫৪

আবদুল্লাহ মাহমুদ

 

যে কোনো দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য গ্রামীণ উন্নয়ন অপরিহার্য। আর গ্রামীণ অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ ও অবকাঠামো উন্নয়নের আবশ্যিক পূর্বশর্ত হলো কৃষি স্বনির্ভরতা। যে দেশের গ্রামীণ জনপদে কৃষিজ দিক থেকে যতো বেশি স্বাবলম্বী, সে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও কাঠামো তত বেশি সুন্দর ও শক্তিশালী। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্র কৃষি উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। কেননা কৃষির উন্নয়ন মূলত কৃষকের উন্নয়ন ও দেশের অগ্রগতির মূল হাতিয়ার। আমাদের দেশের অর্থনীতির বৃহত্ অংশ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তাই গ্রামীণ কৃষিনির্ভর জনপদকে অবহেলা বা অনীহা করে সার্বিকভাবে দেশের উন্নয়ন কামনা কোনোভাবেই সম্ভব না। বর্তমানে আমরা উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তর হয়েছি। এখান থেকে উন্নত দেশে উন্নিত হতে হলে আমাদের গ্রামীণ উন্নয়ন অপরিহার্য, আর গ্রামীণ উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে কৃষিবিপ্লবের বিকল্প নেই। তাই কৃষি বিপ্লবের জন্য গ্রামাঞ্চলের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থা উন্নতির জন্য সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়া আবশ্যিক। বাংলাদেশকে একটি স্বাবলম্বী ও উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যে সংবিধানে গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষিবিপ্লব রাষ্ট্র পরিচালনা একটি মূলনীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত। এ বিষয়ে সংবিধানে উল্লেখ করা হয়েছে, শহর ও গ্রামাঞ্চলে মানুষের জীবনযাত্রার মানের বৈষম্য দূর করার নিমিত্তে গ্রামীণ উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে কৃষিবিপ্লবের বিকাশ, গ্রামাঞ্চলে শিক্ষা, বৈদ্যুতিককরণ ব্যবস্থার উন্নতি, যোগাযোগ ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের মাধ্যমে শহর ও গ্রামাঞ্চলের মধ্যে রহিত জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন সাধনের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে আমাদের দেশে গ্রাম ও শহরের মধ্যে প্রকট তফাত ছিল। গ্রামে সভ্যতার আলো তখন ছিল ধরাছোঁয়ার বাইরে। সে সময় কৃষিকাজ সম্পন্ন হতো নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে। অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, ভঙ্গুর অবকাঠামো, উন্নত বীজের অভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় কৃষকদের অপারগতার ফলে দেশে কৃষিবিপ্লব ছিল দুঃস্বপ্নের ন্যায়। তত্কালীন সময়ে দেশে খাদ্যের চাহিদা ছিল ১ কোটি ২০ টন। তার বিপরীতে খাদ্য উত্পাদন হতো ১ কোটি টন। সে সময়ে খাদ্য উত্পাদনে যে পরিমাণ ভূমি ব্যবহূত হতো, বর্তমানে সেই অনুপাতে ভূমির পরিমাণ ২০ শতাংশ কমে গেলেও খাদ্য উত্পাদন বেড়ে সাড়ে ৩ কোটি টনের কাছাকাছি পৌঁছেছে।

বাংলাদেশের সার্বিক অগ্রগতিতে কৃষির ভূমিকা যেহেতু অনেক, সেহেতু কৃষিবিপ্লবের বিকল্প নেই। চাষের উপযোগী প্রত্যকে ইঞ্চি ভূমিতে উন্নত বীজ, সার ব্যবহারের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নিবিড় চাষাবাদ সঙ্গে সঙ্গে তরুণ প্রজন্মকে কৃষিপেশাতে আকৃষ্ট করে বৃহত্ পরিসরে কৃষিজ কাজ সম্পূর্ণ করার পদ্ধতিকে ‘কৃষিবিপ্লব’ বলা হয়। বর্তমানে কোনো পরিবারই তাদের সন্তানকে কৃষিপেশায় নিযুক্ত করতে চায় না। যার ফলে সামাজিক মূল্যহীনতা ও দৃষ্টিভঙ্গি কৃষি থেকে তরুণ প্রজন্মের মেধাবীদেরকে পৃথক করছে। কৃষিবিপ্লবের বিকাশ সাধনে নতুন প্রজন্মকে এ পেশায় যুক্ত করার বিকল্প নাই। আমাদের কৃষি এখনো পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ; কিন্তু কৃষিবিপ্লবের মূল উদ্দেশ্য, কৃষির বৃহত্তর আকারে সম্প্রসারণ। আধুনিক বিশ্বের বিশাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে কৃষিকে আধুনিকায়ন করা। গবেষণা করে পরিবেশের উপযুক্ত, সহনশীল ও উন্নত বীজ উত্পাদন করতে হবে, যেন কৃষক কোনোভাবেই ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন না হয়। এর পাশাপাশি বীজ ও কীটনাশকের লাগামহীন বাজারব্যবস্থাকে রুখে সরকারি আয়ত্তে নিয়ে সুষমবণ্টন করাও প্রয়োজন। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সমস্যাগুলো যথার্থ বিশ্লেষণের মাধ্যমে মোকাবিলা করা প্রয়োজন।

আমরা সাধারণত কৃষিকাজ বলতে জমিতে ফসল ফলানোকে বুঝি; কিন্তু কৃষি সম্পর্কে সীমাবদ্ধ জ্ঞানকে সংশোধন করতে হবে। কৃষিজ কাজ বলতে, একই সঙ্গে চাষাবাদ, মত্স্যপালন, গবাদি পশুপালন, বনায়ন ও কৃষির সঙ্গে জড়িত বিষয়কে বোঝায়। সংবিধানের নির্দেশ মোতাবেক কৃষিবিপ্লবের উন্নয়ন সাধন করার নিমিত্তে সরকার প্রতি বছরই রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেট প্রণয়নকালে কৃষির প্রতি বিশেষ নজর দিয়েছে; কিন্তু দেখা গেছে, বরাদ্দকৃত অর্থের বড়ো অংশ জনপ্রতিনিধি ও সরকারি ব্যক্তিদের দ্বারা লুণ্ঠিত হয়। ফলে সে অর্থ কৃষকের ভাগ্যোন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখতে পারেনি। এ কারণেই আমাদের গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষিবিপ্লব একটি আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে।

দেশের কৃষিখাতকে সুরক্ষিত ও গ্রামীণ উন্নয়ন বাস্তবায়ন করতে হলে, দারিদ্র্য কৃষকদের উত্পাদন সহায়তা, ফসলের নায্যমূল্য নিশ্চিতকল্পে মূল্য সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করতে হবে, যেন কৃষকদের থেকে ফসল সংগ্রহ এবং ফসল রপ্তানি অতিদ্রুত সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়। এছাড়াও কৃষকদের স্বনির্ভর করার লক্ষ্যে সামাজিকভাবে দায়িত্ব নিতে হবে। কৃষিভিত্তিক শিক্ষা প্রদান করতে হবে। কৃষির পাশাপাশি কুটিরশিল্প স্থাপন ও অন্যান্য শিল্পের বিকাশ সাধন করা গেলে কৃষিনির্ভর জীবন থেকে বের হয়ে সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব হবে। তখন সাধারণ কৃষক খাদ্যের নিশ্চয়তা ও নির্ভরতায় চিন্তামুক্ত থাকতে পারবে। অন্যদিকে কৃষকদের ব্যক্তিগত ভাবে কৃষিসংক্রান্ত আধুনিক জ্ঞান অর্জন করতে হবে। যাতে প্রাকৃতিক বিপর্যয় হতে রক্ষা পাওয়া সহজ হয়। এসব সমস্যাকে দ্রুত সমাধান করা হলে অতিদ্রুত গ্রামীণ উন্নয়ন সম্ভব হবে। আর গ্রামীণ উন্নয়ন সম্ভব হলে, বাংলাদেশ উন্নত দেশে রূপান্তর হওয়া সময়ের দাবি।

n লেখক : শিক্ষার্থী, সম্মান চতুর্থ বর্ষ, বাংলা বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ