বাংলাদেশে করোনার তিন রোগী শনাক্ত

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২০, ০০:৩২

চীন থেকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস এবার বাংলাদেশে শনাক্ত হয়েছে। দেশে প্রথমবারের মতো তিন জনের দেহে ভাইরাসটির সংক্রমণ ধরা পড়েছে বলে জানিয়েছেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা। গতকাল রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান তিনি। আক্রান্তদের মধ্যে দুই জন পুরুষ, এক জন নারী— এ তিন জনই বাংলাদেশি। তাদের মধ্যে দুই জন ইতালির দুটি শহর থেকে সম্প্রতি দেশে ফিরেছেন। এদের মধ্যে এক জনের সংস্পর্শে আসায় পরিবারের আরেক সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের বয়স ২০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। আক্রান্ত তিন জনের মধ্যে দুই জনের বাড়ি নারায়ণগঞ্জে, এক জন মাদারীপুরের বাসিন্দা। তিন জন করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে জনস্বার্থে মুজিববর্ষের কর্মসূচি পুনর্বিন্যাসের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। 

জানা গেছে, করোনা ভাইরাসে তিন জনের আক্রান্তের বিষয়টি গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অবহিত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের একটি টিম এ সময় প্রধানমন্ত্রীকে বলেছে, এটা যাতে ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য বড়ো সমাবেশ এড়িয়ে চলা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখ্য চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ জানান, এখন থেকে বড়ো বড়ো সমাবেশ এড়িয়ে চলতে হবে। তবে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। চিকিত্সায় আক্রান্তরা সুস্থ হন। সারা বিশ্বে আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর হার মাত্র ২ ভাগ। তিনি বলেন, করোনা থেকে বাঁচতে সতর্ক থাকা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। করোনার কোনো ভ্যাকসিন নেই, ওষুধ নেই। তাই একে প্রতিরোধ করতে হবে, এছাড়া কোনো উপায় নেই। আর প্রতিরোধ করতে হলে যেখানে-সেখানে থুথু ফেলা যাবে না। সর্দি-কাশি হলে রুমাল ও টিস্যু ব্যবহার করতে হবে। আর অবশ্যই সাবান দিয়ে রুমাল ধুয়ে ফেলতে হবে। টিস্যু ব্যবহার করলে, ব্যবহারের পর তা ঢাকনাযুক্ত ডাস্টবিনে ফেলতে হবে, যেন টিস্যু থেকে জীবাণু না ছড়াতে পারে।

আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা জানান, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত তিন জনের অবস্থাই স্থিতিশীল। তিন জনকেই হাসপাতালে চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে। তারা ভালো আছেন। তবে আইসোলেশনে (পৃথক) থাকবেন। উল্লেখ্য, রাজধানীর উত্তরায় কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে চিকিত্সাধীন আছেন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত তিন জন। ঐ তিন জনের সংক্রমণের বিষয়ে শনিবার নিশ্চিত হওয়ার কথা জানিয়ে অধ্যাপক ডা. ফ্লোরা বলেন, ‘দুজন দেশে আসার পর তাদের উপসর্গ দেখা দেয়। আমাদের হটলাইনে ফোন দিলে আমরা তাদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠাই। সেখানে দুজনের রেজাল্ট পজেটিভ আসে। তাদের সংস্পর্শে থাকা চার জনকে পরীক্ষা করেছি। এক জন পজেটিভ। বাকিরা নেগেটিভ এসেছে।’

গত বছরের ডিসেম্বর মাসে চীনের হুবেই প্রদেশের উহানে উত্পত্তি হয় করোনা ভাইরাসের। পরে চীনের অন্যান্য প্রদেশ এবং বিশ্বের শতাধিক দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে ভারত, পাকিস্তানেও করোনায় আক্রান্ত রোগী পাওয়া যায়। কিন্তু বাংলাদেশে রোগী শনাক্ত হওয়ার ঘটনা এই প্রথম। অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘বাংলাদেশে করোনা ছড়িয়ে পড়ার মতো কোনো পরিস্থিতি হয়নি। স্কুল-কলেজ বন্ধ করে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি হয়নি।’ তবে করোনা প্রতিরোধে প্রয়োজন না হলে জনসমাগমে না যাওয়ার জন্য পরামর্শ দেন সেব্রিনা। তিনি বলেন, ‘করোনা প্রতিরোধে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া আছে। আইসোলেশন ইউনিট করা হয়েছে।’ সেব্রিনা বলেন, ‘আশঙ্কা করছি না আরো ছড়িয়ে পড়বে। প্রত্যেকের মাস্ক পরে ঘুরে বেড়ানোর কোনো দরকার নেই।’ ২১ জানুয়ারি থেকে বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও সীমান্ত এলাকাসমূহে স্ক্রিনিং করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৭০৫ জনকে স্ক্রিনিং করা হয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালে আইসোলেশন নিশ্চিত করতে হবে।

যেভাবে করোনা ভাইরাস ছড়ায়

করোনা ভাইরাস মূলত শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ ঘটায়। এর লক্ষণ শুরু হয় জ্বর দিয়ে। সঙ্গে থাকতে পারে সর্দি, শুকনো কাশি, মাথাব্যথা, গলাব্যথা ও শরীরব্যথা। সপ্তাহখানেকের মধ্যে দেখা দিতে পারে শ্বাসকষ্ট। উপসর্গগুলো হয় অনেকটা নিউমোনিয়ার মতো। রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ভালো হলে এ রোগ কিছুদিন পর এমনিতেই সেরে যেতে পারে। তবে ডায়াবেটিস, কিডনি, হূদ্যন্ত্র বা ফুসফুসের পুরোনো রোগীদের ক্ষেত্রে ডেকে আনতে পারে মৃত্যু। বিশেষজ্ঞরা জানান, করোনা ভাইরাস নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। প্রয়োজন যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করা। একই সঙ্গে তারা বলেন, কভিড-১৯ প্রতিরোধে জনগণের অংশগ্রহণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সবাই যদি সচেতন না হয়, তাহলে এটা প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে। যেহেতু এখনো করোনা ভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক তৈরি হয়নি, তাই আপাতত এই রোগ প্রতিরোধের একমাত্র উপায় হলো ব্যক্তিগত সচেতনতা। মূলত কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে করোনা ভাইরাস ছড়ানোর সম্ভাবনা বেশি। তাই হাঁচি বা কাশি দেওয়ার সময় টিস্যু বা কাপড় দিয়ে নাক ও মুখ ঢেকে রাখতে হবে। করোনা ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষের দেহে কীভাবে ছড়ায়, সে বিষয়ে এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেননি বিশেষজ্ঞরা। তবে সাধারণ কিছু সাবধানতা অবলম্বনের পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। এসব সতর্কতা অবলম্বন করলে করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা হলেও কমে আসবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

যেভাবে সতর্ক থাকবেন

১. গণপরিবহন এড়িয়ে চলা। বাস, ট্রেন কিংবা অন্য যে কোনো ধরনের পরিবহনের হাতল কিংবা আসনে করোনা ভাইরাস থাকতে পারে। সেজন্য যে কোনো পরিবহনে চলাফেরার ক্ষেত্রে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করা এবং সেখান থেকে নেমে ভালোভাবে হাত পরিষ্কার করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। ২. অফিসের ডেস্কে বসার আগে কম্পিউটার, কিবোর্ড ও মাউস পরিষ্কার করে নিন। ৩. যেসব জায়গায় মানুষ বেশি জড়ো হয়, সেসব স্থান এড়িয়ে চলা কিংবা বাড়তি সতর্কতার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে খেলাধুলার স্থান, সিনেমা হল থেকে শুরু করে ধর্মীয় স্থানও রয়েছে। বাংলাদেশের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে জুমার নামাজের সময় বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ৪. বাংলাদেশে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে থাকা কলম যদি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি ব্যবহার করেন, তাহলে পরবর্তী ব্যবহারকারীদেরও করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। সেজন্য নিজের কলম ব্যবহার করতে হবে। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি কমবে। এছাড়া টাকা উত্তোলনের জন্য যে এটিএম বুথ ব্যবহার করা হয়, সেখান থেকেও সংক্রমণ হতে পারে। কারণ বুথের বাটন অনেকে ব্যবহার করেন। ৫. অফিস বা বাসার লিফটের বাটন থেকেও রোগ সংক্রমণ হতে পারে। ৬. ব্যাংক নোট বা টাকা থেকে করোনাসহ নানা সংক্রামক রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার কথাও বলেন বিশেষজ্ঞরা। ৭. করমর্দন ও কোলাকুলির মাধ্যমেও করোনা ভাইরাস ছড়াতে পারে। তাই করমর্দন ও কোলাকুলি না করার জন্য পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, কভিড-১৯-এর কোনো চিকিত্সা নেই। তবে একে প্রতিরোধ করা সম্ভব। কভিড-১৯ প্রতিরোধে নিয়মিত সাবান-পানি দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধুতে হবে। অথবা হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হবে। অপরিষ্কার হাত দিয়ে নাক, মুখ, চোখ স্পর্শ করা যাবে না। ইতিমধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন এমন ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে।