পূর্বেই বিশ্ব অর্থনীতিতে খানিকটা অস্থিরতা নামিয়া আসিয়াছিল। ২০১৮-১৯ সাল ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য লইয়া টানাপোড়েন। এই দুই দেশই বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের অর্থনীতির সঙ্গেও এই দুই দেশ নিবিড়ভাবে জড়াইয়া আছে। ২০১৮ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাহার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি বাস্তবায়ন করিতে গিয়া বাণিজ্য ঘাটতি কমাইতে চেষ্টা করেন। ইহা করিতে তিনি চীনের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানির একটি বড়ো অংশে শুল্কারোপ করেন। জবাবে চীনও যুক্তরাষ্ট্রের বেশকিছু পণ্য আমদানিতে শুল্ক আরোপ করে। তখনই এই বাণিজ্যযুদ্ধের মন্দ বাতাস বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী কমবেশি বহিতে শুরু করিয়াছিল। এই বাণিজ্যযুদ্ধ চলিতে চলিতেই গত ডিসেম্বরে চীনের উহান প্রদেশে দুর্ভাগ্যজনক করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। প্রথমে আমেরিকা ভাবিয়াছিল, এই করোনা ভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব তাহাদের অর্থনীতিতে পড়িবে না এবং চীন বিশ্ববাজার হইতে আইসোলেটেড হইয়া পড়িলে তাহাদের অর্থনীতি স্ফীত হইয়া উঠিবে; কিন্তু ভাইরাস অবশেষে কোনো সীমানা মানে নাই। বিশ্বব্যাপী ইহা ছড়াইয়া পড়িলে বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় সকল দেশ ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হইতে শুরু করে। এখন বিশ্বের বহু বড়ো দেশের হাজার হাজার ফ্লাইট বন্ধ হইয়া গিয়াছে। পণ্য পরিবহন, সাপ্লাই চেইন স্থবির হইয়া যাইবার উপক্রম হইয়াছে, জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজার ব্যাপকভাবে পড়িয়া গিয়াছে, বিশ্বের প্রতিটি শেয়ারবাজারে বড়ো আকারের পতন দেখা দিয়াছে এবং বিশ্বের বড়ো বড়ো আন্তর্জাতিক কোম্পানির গাড়ি হইতে শুরু করিয়া সামান্য পেরেক উত্পাদন পর্যন্ত বন্ধের উপক্রম হইয়াছে। আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা জানাইয়াছেন, করোনা ভাইরাসের প্রভাবে ২ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতির সম্মুখীন হইবে বিশ্ব। এই মুহূর্তে দেখা যাইতেছে, চীন করোনা ভাইরাসের ঝড় অনেকটা সামলাইয়া উঠার পথে; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ইতালি, জার্মানি এবং ফ্রান্সের মতো বড়ো অর্থনীতির দেশগুলির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড রীতিমতো থমকাইয়া গিয়াছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিও আন্তর্জাতিক বাজারের বাহিরে নহে। কতদিন পর্যন্ত এই ভাইরাসের কারণে অর্থনৈতিক যোগাযোগ প্রায় বন্ধ হইবার পর্যায়ে থাকিবে তাহা আমাদের জানা নাই। ইহা সময়সাপেক্ষ বটে। যদি আরো কয়েক মাস ধরিয়া বিশ্ববাজার স্বাভাবিক না হয় তাহা হইলে বাংলাদেশের ইহার প্রভাব তীব্রভাবে পরিলক্ষিত হইতে পারে। দ্বিতীয়ত, যদি আমাদের এই দেশে করোনা ভাইরাসের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা দেয় তাহা হইলে আরো একটি মুশকিল মোকাবিলা করিতে হইবে। চীনে প্রায় তিন মাস হইতে চলিল করোনার উপদ্রব ঘটিয়াছে। ইউরোপেও এক মাসের বেশি। পরিস্থিতি তাহারা সামাল দিয়া ফেলিলে এবং বাংলাদেশে এই ভাইরাস বিলম্বে উপস্থিত হইলে উন্নত বিশ্ব বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমাদিগকে অধিককাল ধরিয়া পৃথক করিয়া রাখিতে পারে। সেই ক্ষেত্রে আমরা অপরাপর দেশ হইতে পিছাইয়া পড়িবার ঝুঁকিতে থাকিব। এমনিতেই আমাদের অর্থনীতি বেশকিছুকাল ধরিয়া অগ্রগতি মন্থর হইয়াছে। ডলারের মূল্য কিছুটা বাড়িয়াছে। সুতরাং আমাদের যতটা সম্ভব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল রাখিতে চেষ্টা করিতে হইবে। অভ্যন্তরীণ বাজার যতটা সম্ভব স্থিতিশীল রাখিতে চেষ্টা করিতে হইবে। এই ক্ষেত্রে সরকার, ব্যবসায়ী সম্প্রদায় এবং জনগণের মধ্যে একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন হইবে।
