খলিলুর রহমান
পরিবেশ বলতে আমরা আমাদের আশপাশের অবস্থাকে বুঝি। আরেকটু সুন্দরভাবে বললে ‘পরিবেশ’ অর্থ পানি, বায়ু, মাটি ও ভৌতসম্পদ এবং তাদের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক। এর সঙ্গে মানুষ, অন্যান্য প্রাণী, উদ্ভিদ ও অণুজীবের বিদ্যমান পারস্পরিক সম্পর্ককে বুঝায়। মানুষ যেখানে বেড়ে উঠে সেটাই তার পরিবেশ। বেঁচে থাকার জন্য বাসযোগ্য পরিবেশের কোনো বিকল্প নেই।
অনেকেই অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিত্সাকে মৌলিক অধিকার বলে থাকলেও এগুলো হচ্ছে জীবনধারণের মৌলিক উপকরণ। মৌলিক অধিকার নয়। বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিয়ে বলা হয়েছে। সংবিধানে এ অধ্যায়ের শুরুতেই ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, মৌলিক অধিকারের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো আইন করা যাবে না। আর যদি করা হয়, তবে তা বাতিল হয়ে যাবে। সংবিধানে নাগরিকদের জন্য রয়েছে ১২টি মৌলিক অধিকার। এগুলো হলো—আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং আইনের আশ্রয়লাভ (অনু. ২৭), বৈষম্য করা যাবে না এবং সমান সুযোগ (অনু. ২৮), সরকারি নিয়োগ লাভে সুযোগের সমতা (অনু. ২৯), বিদেশি খেতাব প্রভৃতি গ্রহণ নিষিদ্ধকরণ (অনু. ৩০), আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার (অনু. ৩১), জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার রক্ষণ (অনু. ৩২), গ্রেফতার-আটক সম্পর্কে রক্ষাকবচ (অনু. ৩৩), জবরদস্তি শ্রম নিষিদ্ধকরণ (অনু. ৩৪), বিচার ও দণ্ড সম্পর্কে রক্ষণ (অনু. ৩৫), চলাফেরার স্বাধীনতা (অনু. ৩৬), সমাবেশের স্বাধীনতা (অনু. ৩৭), সংগঠনের স্বাধীনতা (অনু. ৩৮), চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা (অনু. ৩৯), পেশা ও বৃত্তির স্বাধীনতা (অনু. ৪০), ধর্মীয় স্বাধীনতা (অনু. ৪১), সম্পত্তির অধিকার (অনু. ৪২), গৃহ ও যোগাযোগের রক্ষণ (অনু. ৪৩), মৌলিক অধিকার বলবত্করণের অধিকার (অনু. ৪৪)। সংবিধানে উল্লেখিত অধিকারগুলোই একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার।
বাসযোগ্য পরিবেশ সংবিধানে উল্লেখিত কোনো মৌলিক অধিকার না হলেও একজন নাগরিকের জন্য এটা অপরিহার্য। আমাদের দেশ দিনদিন উন্নত হচ্ছে। দেশের অর্থনীতির আকার বাড়ছে, বাড়ছে মাথাপিছু আয়ও। ২০২১ সালের মধ্যে আমরা মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হব। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন অবকাঠামো ও বাড়ছে কলকারখানা। এসবই আমাদের সম্ভাবনার দিক; কিন্তু এর পাশাপাশি আমাদের পরিবেশ ভয়াবহ রকমের দূষিত হচ্ছে। পরিবেশের মূল উপাদান বায়ু, পানি ও মাটি তাদের গুণাগুণ হারাচ্ছে। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন সংকট। যা মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে সরকার।
পানিদূষণেও ঢাকা শহর সবার চেয়ে এগিয়ে। আমরা জানি, পানির নিজস্ব কোনো রঙ নেই; কিন্তু কেউ যদি বুড়িগঙ্গার পানি দেখে তাহলে বলবে পানির রঙ ‘গাঢ় কালো’। বাস্তবতা হলো—কলকারখানার বর্জ্য ও বাসায়নিক পদার্থ বুড়িগঙ্গাকে বিষাক্ত করে ফেলেছে। এর দুর্গন্ধ মাত্রা ছাড়িয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, মত্স্য ও জলজ প্রাণীর জীবনধারণের জন্য পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন প্রতি লিটারে পাঁচ মিলিগ্রাম বা এর ওপরে থাকা প্রয়োজন। বুড়িগঙ্গার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (ডিও) পরিমাণ শূন্য দশমিক ৪০। এখানে প্রাণের অস্তিত্ব টিকে থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই। অন্যদিকে তুরাগ নদী অনেকটা মৃত পর্যায়। কারখানার বর্জ্য ও কেমিক্যাল পদার্থ নদীতে মিশে পানিকে বিষাক্ত করে ফেলেছে। যে নদী এক সময় মানুষের জীবিকার ক্ষেত্র ছিল তা এখন নর্দমায় রূপ নিয়েছে।
মানুষের জীবনের আর্থসামজিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে, বাড়ছে ক্রয়ক্ষমতা, বর্ধিত হচ্ছে মাথাপিছু আয়। উন্নয়ন যে কোনো দেশের জন্য অত্যাবশ্যক। তবে তা হতে হবে পরিকল্পিত ও টেকসই। উন্নয়ন যেমন একটি দেশকে এগিয়ে নেয়। একইভাবে স্বাস্থ্যসম্মত ও বাসযোগ্য পরিবেশও দেশের উন্নয়নকে আরো অগ্রগামী করে। প্রত্যেকটি উন্নত দেশেই উন্নয়ন থেকে পরিবেশকে বেশি প্রাধান্য দেয়। বাংলাদেশ সরকারকেও পরিবেশকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন কার্যক্রম চালাতে হবে। না হয় আমরা ২০৩০ সালে যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন করার পরিকল্পনা নিয়েছি তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। উন্নত অবকাঠামোর পাশাপাশি উন্নত পরিবেশও দরকার। অন্যান্য মৌলিক অধিকারের মতো বাসযোগ্য একটি পরিবেশও প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার।
n লেখক : শিক্ষার্থী, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
