কষ্টের শেষ নেই সমুদ্রগামী জেলেদের। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গভীর সাগরে মাছ ধরে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও সমুদ্রগামী জেলে পরিবারগুলোতে কোনো সচ্ছলতা নেই, নেই কোনো আনন্দ। এবার প্রথমবারের মতো জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম নিয়ে সাগরে তরি ভাসালেও বৃষ্টিসহ বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হতে হয়েছে তাদের। ফলে সাগর থেকে কাঙ্ক্ষিত মাছ আহরণ করতে পারেননি তারা। তার ওপর মহাজনদের ঋণের জালে বন্দি তারা। সমুদ্রগামী জেলেদের জন্য নেই কোনো ব্যাংক ঋণের সুবিধাও। এই সংকট সমুদ্রগামী জেলেদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। সম্প্রতি সরেজমিন খুলনার জেলেপল্লি ঘুরে এ সব তথ্য জানা যায়।
খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার মাহামুদকাঠি, হিতামপুর, কাটাখালী, হাবিবনগর, নোয়াকাঠি, রামনাথপুর ও কাঠিপাড়া গ্রামের ৪০০ পরিবার সমুদ্রে মত্স্য আহরণের সঙ্গে জড়িত। এসব জেলে ৪২ হাত দৈর্ঘ্য ও ১২ হাত প্রস্থের নৌকা নিয়ে ২২ অক্টোবর থেকে মাছ ধরার জন্য বঙ্গোপসাগরে পাড়ি জমান। সেখানকার দুবলার চরের আলোরকোল ও নারকেলবাড়ী এলাকার ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে গভীর সাগরে দীর্ঘ পাঁচ মাস মাছ শিকার করেন। এই পাঁচ মাসে জেলেদের জালে ধরা পড়ে ইলিশ, ছুরি, রূপচাঁদা, তেলে পারশে, কুটি পারশে, লইট্যা, চিংড়ি, ভোলাসহ বিভিন্ন ধরনের মাছ। এই মাছ শিকার শেষে মার্চ মাসের প্রথম দিকে আবার ঘরে ফিরতে শুরু করেন জেলেরা।
মাছ ধরার মৌসুম শুরু হলে এক শ্রেণির মহাজনের কাছ থেকে ১ লাখ টাকায় ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা সুদে দাদন (ঋণ) নিয়ে সাগরে নৌকা ভাসান জেলেরা। সাত-আট জন জেলের নৌকাপ্রতি খরচ হয় কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা থেকে ১২ লাখ টাকা। প্রতি বছর কোনো ধরনের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই এই জেলেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকা ভাসাতেন সাগরের বুকে। তবে চলতি মৌসুমে সাগরে যাওয়ার আগে ‘অ্যাওসেড’ নামের একটি বেসরকারি সংস্থা জেলেদের নিরাপত্তা সরঞ্জাম লাইফ জ্যাকেট, দিকনির্দেশক কম্পাস, মোবাইল ফোন, রেডিও, টর্চ লাইট ও জরুরি ওষুধ প্রদান করে। মাত্র এক বছর আগেও সাগরে ১ নম্বর বিপদ সংকেত দেখলেই জেলেদের নিরাপদ স্থানে ফিরে আসতে হতো। এবার ৩ নম্বর বিপদ সংকেতের মধ্যেও সাহসিকতার সঙ্গে সাগরে মাছ ধরেছেন তারা।
মাহমুদকাঠি গ্রামের অনীল চন্দ্র বিশ্বাস (৬৮) বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনে সাগরের চিত্র পালটে গেছে। চলতি মৌসুমে অতিবৃষ্টিসহ একের পর এক দুর্যোগ হয়েছে। আমাদের নিরাপত্তা সরঞ্জাম না থাকলে এবার পথে বসতে হতো। আগে ১ নম্বর সংকেত শুনলে নিরাপদ স্থানে ফিরতাম। এবার ৩ নম্বর বিপদ সংকেত পর্যন্ত মাছ ধরেছি। কিন্তু যাদের নিরাপত্তা সরঞ্জাম নেই সেসব জেলেদের লোকসানের শিকার হতে হবে।’
কাটাখালী জেলেপল্লির বিমল বিশ্বাস (৪৫) বলেন, পাইকগাছার জেলেপল্লির বাসিন্দারা ২২ অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত প্রায় পাঁচ মাস বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরে। মার্চ মাসের পর তারা চার মাস মাছ ধরে সুন্দরবন সংলগ্ন বিভিন্ন নদী-খালে। আর তিন মাস সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকে। এ সময় তাদের বেকার থাকতে হয়।
রামনাথপুর গ্রামের মাছ ধরার ট্রলার মালিক ও জেলে চরণ বিশ্বাস (৪৫) বলেন, একটি ট্রলারে মাঝিসহ আট জন জেলে থাকে। মাঝিসহ আট জন জেলেকে প্রতি মৌসুমে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ টাকা বেতন দিতে হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ টাকার মাছ ধরা পড়ে। এর মধ্যে জেলেদের বেতন ও অন্যান্য খরচসহ ১৫-১৬ লাখ টাকা খরচ হয়ে যায়। বাকি যে সামান্য টাকা থাকে তাই দিয়ে সারা বছর চলে আমার সংসার।
রামনাথপুর গ্রামের আরেক জেলে প্রশান্ত বিশ্বাস কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে ১৯৮৮ সালের ঝড়ের কবলে পড়ে তার বড়ো ভাই সন্তোষ বিশ্বাস, চাচাতো ভাই কার্তিক বিশ্বাস, কাকা নিরাপদ বিশ্বাস ও মামা মনোজ বিশ্বাস নিখোঁজ হয়ে যায়। তাদের আর খোঁজ মেলেনি। আপন জন হারানোর এই বুকভরা কষ্ট নিয়ে তাকেও সাগরে মাছ ধরতে যেতে হয়।
সমুদ্রগামী জেলেদের নিয়ে কাজ করা খুলনার বেসরকারি সংস্থা অ্যাওসেডের নির্বাহী পরিচালক শামীম আরেফীন বলেন, আগামীতে দেশের অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করবে সাগরভিত্তিক ‘ব্লু-ইকোনমি’। এ অর্থনীতির চালিকাশক্তি আমাদের জেলেরা। দেশের অর্থনীতির স্বার্থেই তাদের দক্ষ করে গড়ে তোলা প্রয়োজন। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে জেলেদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা, ব্যাংক ঋণ ও বিমা সুবিধার বিষয়টি নিয়েও ভাবা জরুরি। আমরা দুই-তিন বছর ধরে এসব জেলেকে নিয়ে কাজ করছি। তাদের নিরাপত্তা সরঞ্জাম প্রদান ও প্রশিক্ষিত করে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছি। এর সুফলও মিলেছে।
