গত বছরে ঢাকাসহ সারাদেশে ডেঙ্গু মহামারি আকার ধারণের ক্ষেত্রে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের গাফিলতি পেয়েছে বিচার বিভাগীয় অনুসন্ধান কমিটি। কমিটি বলছে, ঢাকাসহ সারাদেশে ডেঙ্গুর মহামারি প্রকোপের ক্ষেত্রে ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আংশিক গাফিলতি রয়েছে। তবে এককভাবে তাদেরকে দায়ী করা যায় না। এক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির একক কোনো গাফিলতিও খুঁজে পায়নি কমিটি।
কমিটি বলছে, মশা নিয়ন্ত্রণের কাজ সিটি করপোরেশনের হলেও এই সংস্থার একার পক্ষে এটা নিয়ন্ত্রণ করা বাস্তবিক পক্ষেই সম্ভব নয়। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই মশক নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এছাড়া দুই বছর পরপর মশার ওষুধ (কীটনাশক) ও কেমিক্যালের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াসহ ১০ দফা সুপারিশ করা হয়েছে ঐ প্রতিবেদনে।
গতকাল সোমবার এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন হাইকোর্টে দাখিল করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, নগরীর মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের কর্তৃপক্ষ হচ্ছে সিটি করপোরেশন। ঢাকা মশক নিবারণ দপ্তর নামে একটি দপ্তর থাকলেও মূলত মশা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে তা অকার্যকর। এ দপ্তরের কর্মচারীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের অধীনে কাজ করে। তবে উক্ত দপ্তরের নিয়ন্ত্রণ স্থানীয় সরকার বিভাগের ওপর ন্যস্ত। যদিও মশক নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে উক্ত দপ্তরের কারিগরি ধারণা নাই। নাই মশক নিয়ন্ত্রণের কোনো কার্যক্রমও।
২০১৯ সালে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোধে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ব্যর্থতার কারণ ও দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিতকরণে বিচার বিভাগীয় অনুসন্ধানের নির্দেশ দেয় বিচারপতি তারিক-উল হাকিম ও বিচারপতি মো. ইকবাল কবিরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। ঐ নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ মো. হেলাল চৌধুরীকে সভাপতি এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হাবিবুর রহমানকে সদস্য করে গঠিত হয় অনুসন্ধান কমিটি।
কমিটি সিটি করপোরেশন সরেজমিন পরিদর্শন এবং ২৭ জন বিশেষজ্ঞের মতামত গ্রহণ করে হাইকোর্টে এ প্রতিবেদন দেন।
‘এডিস মশা কীটনাশক প্রতিরোধী’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইসিডিডিআরবির প্রতিবেদন হতে দেখা যায় যে, গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে উড়ন্ত মশা দমনে তথা অ্যাডাল্টিসাইডিংয়ের জন্য একই ধরনের কীটনাশক তথা টেট্রামেথ্রিন, পারমেথ্রিন ও প্রালারথ্রিনের ট্রাই কম্বিনেশন ব্যবহারের ফলে ঢাকার এডিস মশা কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। ফলে পূর্ণবয়স্ক মশা নিধনে ওষুধ পরিবর্তনের পরামর্শ দেয় আইসিডিডিআরবি ও সিডিসি; কিন্তু ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এই বিষয়টি অনুধাবন ও বাস্তবায়ন করতে অনেক সময় নেয়। এছাড়া গত ১০/১২ বছরে মশক নিধনে ব্যবহূত কীটনাশকের কার্যকারিতাও পরীক্ষা করা হয়নি। ফলে এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের শিথিলতা এবং এক দশকেরও অধিক সময় ধরে প্রয়োগকৃত ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা না করায় দুই সিটি করপোরেশনের আংশিক গাফিলতি প্রতীয়মান হয়েছে।
নিজস্ব জরিপব্যবস্থা নেই
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো সিটি করপোরেশনকে এককভাবে দায়ী করার অবকাশ নাই। কারণ বিদ্যমান ব্যবস্থায় মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের নিজস্ব কোনো জরিপব্যবস্থা নেই। নেই কোনো কীটতত্ত্ববিদ, বিশেষজ্ঞ দল বা নিজস্ব ল্যাবরেটরি—যার মাধ্যমে সিটি করপোরেশন সহজেই মশক নিবারণ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ ও তাত্ক্ষণিক মশার জীবনচক্র সম্পর্কে ধারণা নিতে পারে। এসবের জন্য সিটি করপোরেশনকে পুরোপুরিভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওপর নির্ভর করতে হবে।
সমন্বিত উদ্যোগ দরকার
ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়াসহ অন্যান্য মশাবাহিত ও সংক্রামক ব্যাধি নিবারণের জন্য সিটি করপোরেশনের সঙ্গে রাজউক, রিহ্যাব, ঢাকা ওয়াসা, পুলিশ, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট কর্তৃপক্ষ, সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষ, বিআরটিএ, বিআরটিসি, বাংলাদেশ রেলওয়ে, পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তর, আবহাওয়া অধিদপ্তরসহ নগরবাসীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করে অনুসন্ধান কমিটি।
সরকারি হিসেবে ২০১৯ সালে ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং মৃত্যু হয় ১৭৯ জনের।
