গৃহায়ন প্রকল্পে অব্যবস্থাপনা

আপডেট : ১১ মার্চ ২০২০, ২১:৪৪

বাংলাদেশ নিম্নমধ্যম আয়ের একটি দেশ। এইখানে জনসংখ্যার একটি বড়ো অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ২০ দশমিক ৫ এবং হতদারিদ্র্যের হার ১০ দশমিক ৫ শতাংশ। সংবিধান অনুসারে জনসংখ্যার এই বিপুল অংশের মৌলিক চাহিদার জোগান দেওয়ার দায়িত্ব মূলত রাষ্ট্রের। আর এই মৌলিক চাহিদার অন্যতম হইল বাসস্থান—মানুষের মাথা গোঁজার জায়গা। এই দায়িত্ব বাংলাদেশ রাষ্ট্র জন্মের পর হইতেই পালন করিয়া আসিতেছে। তখনকার সময়কার আবাসন ও সেটেলমেন্ট ডিরেক্টরেট কম আয়ের মানুষের পুনর্বাসিত করার প্রকল্প গ্রহণ করে এবং স্বাধীনতা যুগের সময় উদ্বাস্তুসহ মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য আবাসন প্রদান প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী দশকগুলোতে সরকার ও সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা দরিদ্র গৃহহীন মানুষের জন্য আবাসন প্রকল্প গ্রহণ করে। এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হওয়ার ফলে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা কমিতে থাকে। ২০১৮-১৯ অর্থবত্সরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গৃহহীন পরিবারের জন্য ১১ হাজার ৬০৪টি দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ বরাদ্দ দেয় সরকার। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিটা) ও গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) কর্মসূচির মাধ্যমে এসব ঘর নির্মাণে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। এই সকল ঘর নির্মাণ কার্যক্রম সমাপ্ত হইয়াছে গত বত্সরের জুনে। চলতি বছরের শুরুতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে পরিচালিত ইন্টার্নশিপের অংশ হিসাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগের একদল শিক্ষার্থী কয়েকটি উপেজলায় নির্মিত দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ পরিদর্শনে যান। তাহাদের প্রতিবেদনে গৃহহীনদের জন্য দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ বরাদ্দ এবং নির্মাণে বেশ কিছু অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র উঠিয়া আসিয়াছে।

যেইখানে প্রকৃত গৃহহীন মানুষদের প্রকল্পের আওতায় গৃহ নির্মাণ করিয়া দেওয়ার কথা, সেইখানে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি করিয়া অনেক স্বাবলম্বী মানুষকে গৃহ নির্মাণ করিয়া দেওয়া হইয়াছে বলিয়া অভিযোগ পাওয়া গিয়াছে। অনেক ক্ষেত্রে সুবিধাভোগীর নিকট হইতে ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত গ্রহণ করা হইয়াছে। অঙ্গুলি স্থানীয় প্রতিনিধি ও অসাধু কর্মকর্তাদের দিকে। আমরা জানি, দুর্নীতি আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। বিষয়টি গুরুত্বের সহিত দেখা দরকার। ইহা ছাড়া বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে নকশা পরিবর্তন ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হইয়াছে বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে। এই সকল ব্যত্যয়ও কাটাইয়া উঠিতে হইবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০২১ সালের মধ্যে সকল গৃহহীন মানুষকে মাথা গোঁজিবার ঠাঁই দেওয়ার পরিকল্পনা ব্যক্ত করিয়াছেন। ফলে ইহা একটি বিরাট কর্মযজ্ঞ হইবে। আমাদের প্রত্যাশা থাকিবে, সেই ক্ষেত্রে যেন স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়। পাশাপাশি ইহাও নিশ্চিত করিতে হইবে, যেন গৃহহীন অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা পরিবার, নদীভাঙনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে গৃহহীন পরিবার, বিধবা মহিলা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও পরিবারে উপার্জনক্ষম সদস্য নাই—এমন পরিবার বা অসহায় বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা অগ্রাধিকার পায়।